শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২০

কাজী নজরুল ইসলাম: এক নির্ভীক সাংবাদিক




তিনি কবি, গীতিকার, সুরকার, ছোটগল্পকার, সঙ্গীত পরিচালক৷ নানা অভিধার মাঝে তাঁর সাংবাদিক পরিচয়টি অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়৷ মৃত্যুদিনে কাজী নজরুলের সাংবাদিকতা নিয়ে লিখছেন গোলাম রাশিদ 



১৯১৭৷ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে৷ ১৮ বছর বয়সি কিশোর নজরুল শিয়ারসোল রাজ স্কুল ছেড়ে ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে যোগ দিলেন৷ করাচি সেনানিবাস থেকেই তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন সমিতির সম্পাদক মুজাফফর আহমেদের মাধ্যমে৷ বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে ১৯২০-র মার্চ মাসে কলকাতায় পা রাখেন হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬)৷ রবীন্দ্রনাথের শহর তখন জানত না আর কয়েক বছরের মধ্যেই এই শহরের ৩/৪ সি তালতলা লেনে জন্ম হতে চলেছে এক 'বিদ্রোহী'র(প্রথম প্রকাশ জানুয়ারি,১৯২২)৷ 'খোদার আসন 'আরশ' ছেদিয়া,/ উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর!'---দীপ্ত ঘোষণা শুনে চমকে উঠেছিল বাঙালি৷ স্কুলের পড়াশোনা করেননি, লেটোর দলে গান করেছেন, করেছেন মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ ও মক্তবের শিক্ষকতা৷ তিনি এমন গনগনে আগুনঝরা কথামালা কোথায় পেলেন? সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে জানতে হবে ১৯২০-র মার্চ মাসে কলকাতায় এসে নজরুল কী করছিলেন সে সম্বন্ধে। সোভিয়েতে রুশ বিপ্লব সম্পন্ন, মন্টেগু-চেমসফোর্ড আইন, জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড, মহাত্মা গান্ধির নেতৃত্বে খিলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন ৷ পটভূমি প্রস্তুত৷ হাবিলদার কবি নজরুল পরিণত হলেন সাংবাদিকে৷ এটাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনা৷ কবি-প্রতিভা নিয়েই তিনি নিশ্চয় জন্মেছিলেন৷ কিন্তু তাতে শান দিয়ে ধারালো করার কাজটি নিঃসন্দেহে করেছিল এই সাংবাদিকতা পেশাটিই৷ যেদিন 'উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না', সেইদিন যিনি শান্ত হবেন, তিনি যদি সাংবাদিক হয়ে ওঠেন, তাতে আর আশ্চর্যের কী আছে৷ 



মূলধারার সংবাদপত্রে সাংবাদিকতা করে প্রথম শ্রেণির সাংবাদিক ও কবি হয়ে দেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ের জন্য জনগণকে সচেতন ও উদ্দীপিত করে তুলছেন, এমন গুণের যুগপৎ সমাবেশ শুধুমাত্র কাজী নজরুলের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ ভাবে ঘটেছে৷ নজরুলের কবিতা ও গানের কথা যেভাবে আলোচিত হয়, তাঁর সাংবাদিক সত্তা নিয়ে সেই আলোচনা হয় না৷  তাঁর কবিতায় বারবার বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছে, পুরনোকে ভেঙে নতুনের আগমনের গান শোনা গিয়েছে৷ এই চেতনা নজরুলের সাংবাদিক চেতনারই বহিঃপ্রকাশ৷ কলকাতায় এসে ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটের বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে তিনি থাকতে শুরু করেন৷ এই সময় নজরুল ও মুজাফফর আহমেদ একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের কথা ভাবেন৷ তাঁদের সঙ্গী হোন শের-ই বাংলা একে ফজলুল হক, যিনি পরবর্তীতে হয়ে উঠবেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী ৷  মূলত তাঁরই উৎসাহ ও আর্থিক সহযোগিতায় ১৯২০ সালের ১২ জুলাই 'নবযুগ' নামে একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হতে শুরু করে৷  সম্পাদক হিসেবে ফজলুল হকের নাম ছিল৷  তবে নজরুল এবং মোজাফফর আহমেদ ছিলেন এই পত্রিকার কাণ্ডারী৷ সান্ধ্য সংবাদপত্রটি নজরুলের লেখার গুণে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে৷ তিনি আগে কখনও সাংবাদিকতার কাজ করেননি৷ খবর বা নিবন্ধ সম্পাদনারও অভিজ্ঞতা ছিল না৷ কিন্তু তাঁর ভাষাগত দক্ষতা ছিল অতুলনীয়৷ লেখার মধ্যে প্রাঞ্জলতা ও আবেগ ছিল যা খুব সহজেই পাঠককে নাড়া দিত৷ গ্রামের মসজিদে আযান দিতেন, মক্তবে পড়েছিলেন কুরআন, হাদিস, ইসলামি দর্শন৷ চাচা কাজী বজলে করিম আরবি, ফারসি, উর্দু জানতেন৷ চাচার মতো বালক নজরুলও লেটোর দলে যোগ দেন৷ সেখানে তিনি পরিচিত হন হিন্দু শাস্ত্র-পুরাণ-সংস্কৃতের সঙ্গে৷ এই দুই ধারার মিশ্রণ যেমন তাঁর মননকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনই ভাষাকে করে তুলেছিল প্রাণশক্তিপূর্ণ, ঝরঝরে, সহজবোধ্য অথচ চমকপ্রদ৷ নজরুলের কড়া লেখার জন্য বেশ কয়েকবার 'নবযুগ' পত্রিকাকে সতর্ক করা হয়েছিল৷ কিন্তু তবুও তিনি তাঁর জ্বালাময়ী লেখা থামাননি৷ পত্রিকায় স্থানাভাবের জন্য নজরুল খুব ছোট করে খবরকে অল্প কথায় পাঠকের বোঝার মতো করে লিখতে পারতেন৷ জনপ্রিয় কবিতা বা গানের লাইন তুলে হেডিং করতেন৷ কাগজের সম্পাদকীয় নীতিমালা নিয়ে নজরুলের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের মতবিরোধ হলে তিনি কাজে ইস্তফা দেন এবং ১৯২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায় মালিকানা বিতর্কের কারণে৷ ১৯৪০ সালে ফের একে ফজলুল হকের পৃষ্ঠপোষকতায় নবপর্যায় নবযুগ প্রকাশ হলে সেখানে তিনি প্রধান সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন৷ লিখেছিলেন 'পাকিস্তান না ফাঁকিস্তান' এর মতো লেখা৷  ব্রিটিশ সরকারের জুলুম, এদেশের মানুষের অসচেতনতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে নজরুলের অগ্নি কলমসম লেখা নবযুগে প্রকাশিত হয়েছিল৷ গেছে দেশ দুঃখ নাই, আবার তোরা মানুষ হ!, ছুতমার্গ, জাগরণী, ডায়ারের স্মৃতিস্তম্ভ,  লোকমান্য তিলকের মৃত্যুতে বেদনাতুর কলিকাতার দৃশ্য, শ্যাম রাখি না কুল রাখি প্রভৃতি শিরোনামের লেখাগুলি পাঠ করলে তার আঁচ অনুভব করা যায়৷ 



নবযুগের পর নজরুল 'নওরোজ', 'সেবক', 'মোহাম্মদী' পত্রিকায় স্বল্পকালীন কাজ করেন৷ কোথাও বেশিদিন স্থায়ী হননি৷ অত্যন্ত স্বাধীনচেতা ও অন্যায়ের সঙ্গে আপোসহীন নজরুল ১৯২২ সালের আগস্টে নিজ সম্পাদনায় শুরু করেন অর্ধ সাপ্তাহিক 'ধূমকেতু'৷ এই পত্রিকাটি প্রকাশ হতেই চারদিকে সাড়া পড়ে যায়৷ রবীন্দ্রনাথ ধূমকেতুর পথচলার শুরুতে লিখেছিলেন, 'আয় চলে আয়রে ধূমকেতু,/ আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু/... জাগিয়ে দেরে চমক মেরে,/ আছে যারা অর্ধচেতন৷ '  বিদ্রুপাত্মক কবিতা, সাধারণ মানুষকে সচেতন করার জন্য নানা নজরুলীয়-নিবন্ধ প্রকাশিত হতে থাকে যা শৃঙ্খলিত ও অত্যাচারিত মানুষকে সংগ্রামের পথ দেখায়৷ ব্রিটিশদের পদতল থেকে নজরুলই সর্বপ্রথম পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তোলেন এই পত্রিকার পাতায়৷ তিনি লেখেন, ''...সর্বপ্রথম, ‘ধূমকেতু’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়।... ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা-রক্ষা, শাসনভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়ের হাতে। তাতে কোনো বিদেশির মোড়লি করবার অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না।"



স্বভাবতই ব্রিটিশ সরকার তাঁর এই পত্রিকার বিরুদ্ধেও খড়্গহস্ত হয়৷ কবির রচিত 'আনন্দময়ীর আগমনে' কবিতাটি ধূমকেতুতে প্রকাশিত হলে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে (এখন দেশে কথায় কথায় 'দেশদ্রোহী' তকমা দানের প্রবণতা ফিরে এসেছে) তাঁকে গ্রেফতার করা হয়৷ বিচারাধীন নজরুল দিয়েছিলেন 'রাজবন্দীর জবানবন্দী'৷ বিচারের পর তাঁর এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়৷ নির্ভীক, সাহসী সাংবাদিকতার জন্য এভাবেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন সময়ের সেরা প্রোটাগনিস্ট৷ ধূমকেতু পত্রিকাটি ১৯২৩ সালের মার্চ মাসে বন্ধ হয়ে যায়৷ এই পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা হিসেবে 'মোহররম সংখ্যা', 'আগমনী সংখ্যা', 'দেওয়ালী সংখ্যা', 'কংগ্রেস সংখ্যা' ইত্যাদি প্রকাশিত হয়েছিল৷ বর্তমানে বাঙালি শারদীয়া প্রকাশ করে, ঈদসংখ্যা হাতে গোণা৷ যিনি পুজোসংখ্যা করেন, তিনি ঈদ বা মুহাররমের কথা ভুলে যান৷ আর কোনও সম্পাদক ঈদসংখ্যা প্রকাশ করলে সেখানে আবার অনেকেই সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ খুঁজে পান৷ সাংবাদিক কাজী নজরুল ১০০ বছর আগেই 'মোহররম' ও 'দেওয়ালী'র আলো দেখিয়েছিলেন! 



১৯২৫ সালের ডিসেম্বরে কাজী নজরুলের পরিচালনায় ফের আরেকটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়৷ সাপ্তাহিক এই পত্রিকার নাম ছিল 'লাঙল'৷ কবি কংগ্রেসের সদস্য হন এই বছর৷ জাতীয় কংগ্রেসের একটি অংশ হিসেবে মজুর স্বরাজ দল তৈরিতে তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন৷ এই দলেরই মুখপত্র ছিল 'লাঙল'৷ একে বাংলাভাষার প্রথম শ্রেণিসচেতন পত্রিকা বলা হয়৷ পরে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় 'গণবাণী'৷ ১৯২৬-এর এপ্রিলে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়৷ এরই প্রেক্ষাপটে কবি গণবাণীতে লেখেন 'মন্দির ও মসজিদ', 'হিন্দু-মুসলমান'৷ নিবন্ধ দু'টি আজকের উগ্র জাতীয়তাবাদ ও রামমন্দির-রাজনীতির ভারতবর্ষে সমান উপযোগী৷ 'গণবাণী'র পর 'সওগাত' পত্রিকায় নজরুল কিছুদিন কাজ করেন৷ এরপর সাংবাদিকতা ছেড়ে গান-কবিতার জগতে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন৷ পরবর্তীতে চল্লিশের দশকে নবপর্যায় নবযুগে কাজ করার মাধ্যমে শেষ হয় তাঁর সাংবাদিক জীবন৷ ১৯২০ থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলা সাংবাদিকতায় তিনি যে নির্ভীকতার প্রমাণ দেন, লেখনীতে যে অসাধারণত্ব ফুটে ওঠে তার পরিচয় পাওয়া যায় 'যুগ-বাণী' (১৯২২),  'দুর্দিনের যাত্রী' (১৯২৬), 'রুদ্র-মঙ্গল' (১৯২৭) গ্রন্থগুলিতে৷ দৈনিক নবযুগে প্রকাশিত নিবন্ধগুলি 'যুগ-বাণী' বইতে ছাপা হয়৷ ধূমকেতুতে যে সকল সম্পাদকীয়, প্রবন্ধ লেখেন, তারই কিছু নিয়ে প্রকাশিত হয় 'দুর্দিনের যাত্রী'৷ ধূমকেতু ও গণবাণীতে প্রকাশিত কিছু লেখার সংকলন 'রুদ্র-মঙ্গল'৷ তিনটি বই-ই প্রকাশের পরপর ব্রিটিশদের চোখে বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচিত হয় এবং ব্রিটিশ রাজসরকার বইগুলির প্রচার ও মুদ্রণ বেআইনি ঘোষণা করে৷  এই জন্যই কাজী নজরুল বিদ্রোহী, চিরদুর্দম৷ তাঁর সাহস, নৈতিকতা,  দেশপ্রেম, আত্মমর্যাদা, সাহিত্যবোধ তাঁকে কিংবদন্তিসম সাংবাদিকে পরিণত করেছে৷  তাই তো 'রাজবন্দীর জবানবন্দী'তে তিনি লিখতে পেরেছেন, 'আমি সত্যপ্রকাশের যন্ত্র। সে যন্ত্রকে অপর কোনো নির্মম শক্তি অবরুদ্ধ করলেও করতে পারে, ধ্বংস করলেও করতে পারে; কিন্তু সে-যন্ত্র যিনি বাজান, সে-বীণায় যিনি রুদ্র-বাণী ফোটান, তাঁকে অবরুদ্ধ করবে কে? সে-বিধাতাকে বিনাশ করবে কে? আমি মরব, কিন্তু আমার বিধাতা অমর। আমি মরব, রাজাও মরবে, কেননা আমার মতন অনেক রাজবিদ্রোহী মরেছে, আবার এমনই অভিযোগ-আনয়নকারী বহু রাজাও মরেছে, কিন্তু কোনো কালে কোনো কারণেই সত্যের প্রকাশ নিরুদ্ধ হয়নি – তার বাণী মরেনি। সে আজও তেমনই করে নিজেকে প্রকাশ করেছে এবং চিরকাল ধরে করবে। আমার এই শাসন-নিরুদ্ধ বাণী আবার অন্যের কণ্ঠে ফুটে উঠবে।' 




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only