শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২০

ঘটনাবহুল মুহাররম মাস ও আশুরায় করণীয়




মুদাস্সির নিয়াজ

সর্বশক্তিমান আল্লাহ্তায়ালা যেদিন আসমান,জমিন সৃষ্টি করেন,সে দিন থেকেই মাস ও সন-তারিখ গণনা শুরু হয়। কথিত আছে ১০ মুহাররম তারিখেই আসমান,জমিন,নদি-নালা,পাহাড়-পর্বত,জান্নাত-জাহান্নান,লওহে মাহফুজ ইত্যাদি যাবতীয় সৃজন করেন সৃষ্টিকর্তা মহান রাব্বুল আলামিন। সেই হিসেবে আরবি হিজরি সনের প্রথম মাস হল মুহররম। আর এই মাসের ১০ তারিখ হল পবিত্র আশুরা। আল্লাহর বিধান মোতাবেক বছরের ৪টি মাস হল পবিত্র ও সম্মানিত। সেই তালিকায় মুহাররম মাসও রয়েছে। 

এমনকী হিন্দুদের পবিত্র গ্রন্থ বেদেও মুহাররম মাসের উল্লেখ রয়েছে। তবে সেখানে বলা হয়েছে ‘দাহাম’ মাসের কথা। তাওরাতে বলা হয়েছে ‘সুহরীয়’, জবুরে ‘মুহিত’, ইঞ্জিলে ‘মহরারা’, আর আরবিতে ‘মুহাররম’। ঘটনাবহুল এই মাসটিতে বহু ভালো ও আনন্দের ঘটনা ঘটেছিল। তাই মুহররম মাসকে আল্লাহর খাস রহমত, বরকত ও ফজিলতের মাস বলে অভিহিত করা হয়। প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী হযরত আদম আ.-কে এই দিনেই তৈরি করেন আল্লাহ্। আবার এই দিনেই তাঁকে ও তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ প্রথম মানবী মা হাওয়া আ.-কে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছিল। তাই এই মাসটিকে তাওবা কবুলের মাস হিসেবে গণ্য করা হয়। 

নবী হযরত ইউনূস আ.কে দৈত্যাকার সামুদ্রিক মাছ গিলে ফেললে তিনি ‘লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জ্বলেমিন’ দোয়ার বদৌলতে নাজাত পান। আশুরা অর্থাৎ মুহাররম মাসের ১০ তারিখেই মানবজাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম আ.-কে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করেছিল নমরুদ। কিন্তু  হযরত ইব্রাহীম আ.-এর ঐকান্তিক দোয়ায় আল্লহ্তায়ালা সেই অগ্নিস্ফূলিঙ্গকে শীতল বাতাসে পরিণত করে দেন। এই দিনেই  হযরত ইব্রাহীম-এর জন্ম হয়। আশুরাতেই হযরত মুসা আ.-এর সঙ্গে তুর পাহাড়ে আল্লাহর কথা হয় এবং আসমানি কিতাব ‘তাওরাত’ লাভ করেন তিনি। এই দিনেই যালেম সম্রাট ফেরাউনকে তার দলবলসহ নীলনদের পানিতে সলিল সমাধি হয় এবং হযরত মুসা আ. বিজয়ী হন। এই দিনেই প্রথম আসমান থেকে পানি বর্ষণে সিঞ্চিত হয় পৃথিবীপৃষ্ঠ। 

এ রকম বহু ইতিবাচক কালজয়ী ঘটনা সমৃদ্ধ পবিত্র আশুরার সর্বশেষ সংযোজন হল কারবালা প্রান্তরের হৃদয়বিদারক গণহত্যা। ৬১ হিজরির ১০ মুহাররম ইরাকের ফুয়াত নদীর উপকূলবর্তী কারবালা প্রান্তরে হযরত হুসাইন রা.-এর শাহাদাত বরণ আশুরার পূর্ববর্তী সব আনন্দনকে ম্লান করে দেয়। সেদিন বংশ পরম্পরায় শাসন ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা বা রাজতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের পুরোধা ইয়াজিদ ও তার বাহিনীর নৃশংসতা-বর্বরতা কারবালার প্রান্তরকে রক্তাক্ত করেছিল। যার বিরুদ্ধে শক্তহাতে রুখে দাঁড়ান হযরত হুসাইন রা. ও তাঁর সাথীরা। ইয়াজিদের অন্ধকার ভাবনা দূর করতে আলোর মশাল জ্বালান তিনি। তাই বলা হয়, ‘ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হর কারবালা কী বাদ’। যদিও কারবালার মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছিল মহানবী সা.-এর ওফাতের অর্ধ শতাধি পর।

আখেরী নবী সা.-এর দৌহিত্র তথা আদরের কন্যা খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতেমা রা.-এর পুত্র হযরত হুসাইন রা.-কে পাশবিকভাবে হত্যার সেই মর্মন্তুদ কাহিনি মহাবিশ্বের সর্বকালের ইতিহাসে কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। এই দিনটিকে বহু দেশে কালো পতাকা, কালো ঝাণ্ডা উড়িয়ে বা মুখে কালো কাপড় বেঁধে স্মরণ করা হয়। সেই অনুষঙ্গে কোথাও কোথাও লাঠি হাতে কিংবা শসস্ত্র মিছিল বের হয়। এটা মূলত পাষণ্ড ও ঘাতক ইয়াজিদ বাহিনীকে মোকাবিলার লক্ষ্যে প্রতীকি মহড়া বলা যায়। দিনটি পালন বা স্মরণে নানান আঙ্গিক বা ঘরানা দেখা যায়। কিন্তু কারবালার সেই ‘রক্তে লেখা ইতিহাস’ মুসলিম উম্মাহ কোনওদিন ভুলতে পারবে না। কারণ হযরত হুসাইন রা. ও তাঁর সঙ্গীসাথীরা ইসলামের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েমের পক্ষে কালেমার ঝাণ্ডা বুলন্দ করতে হযরত মোয়াবিয়া রা.-এর পুত্র ইয়াজিদের মোকাবিলায় নিজেদের জীবন বাজি রেখে শেষমেষ শহিদ হন। সপরিবারে ও সপরিষদে মোট ৭২ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে ইয়াজিদ-বাহিনী। এদিকে হিজরি ৬০ সালে পিতার ইন্তেকালের পর ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়া স্বঘোষিত খলিফা বলে দাবি করেন। আসলে সে ছিল স্বৈরাচারী ও একনায়কতন্ত্রী এবং ইসলামের দুশমন। হারাম-হালাল, জায়েয-নাজায়েয,আল্লাহ আদেশ-নিষেধ কোনও কিছুর ধার ধারত না সে। তাই তাকে খলিফা বলে মানতে অস্বীকার করে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচনের মাধ্যমে ইসলামি শাসনব্যবস্থা চালু রাখার পক্ষপাতী ছিলেন হযরত হুসাইন রা.। 

এক কথায় বলা যায়, কারবালার শিক্ষা হল, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচনের মাধ্যমে আল্লাহর জমিনে ইসলামের শাসন কায়েম রাখার প্রয়াস। তাই হযরত হুসাইন রা.-কে বলা হয় গণতন্ত্রের আলোকবর্তিকা।  

পবিত্র আশুরা সম্পর্কে ইসলামের ইতিহাস পরিক্রমায় জানা যায়, মহানবী সা. যখন জানতে পারলেন বনি ইসরাইলরা (ইহুদি) নবী মুসা আ.-এর বিজয় দিবস হিসেবে ১০ মুহাররম তারিখে রোযা রাখে। তাই মহানবী সা. বললেন,আশুরার রোযার ব্যাপারে ইহুদিদের থেকে ব্যতিক্রম বা পার্থক্য করতে হবে।

 তিনি ঘোষণা করলেন, আগামী বছর হায়াতে থাকলে আশুরার রোযা একদিন বাড়িয়ে করবেন ইনশাআল্লাহ্। তবে এই অতিরিক্ত রোযার দিন নিয়ে সব থেকে গ্রহণযোগ্য হাদিস হল,৯ তারিখ। অর্থাৎ আশুরার আগের দিন এবং আশুরার দিন রোযা রাখা। ৯ এবং ১০ মুহাররম রোযা রাখা উত্তম। আবার ১০-১১ বা ৯-১০-১১ তারিখ তিনদিন রোযা রাখাও যেতে পারে। হাদিসের বর্ণনায় এসেছে আশুরার রোযা রাখলে পূর্ববর্তী একবছরের গুনাহ মাফ হতে পারে।

উল্লেখ্য, রমযান মাসের রোযা ফরয হওয়ার আগে আশুরার রোযা ফরয ছিল। কিন্তু হিজরি দ্বিতীয় সন থেকে রমযানের সিয়াম ফরয হওয়ার পর আশুরার রোযা ঐচ্ছিক হয়ে যায়। তবে যাই হোক না কেন, এটা স্পষ্ট যে, আশুরার রোযা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। তাই বলা হয়, রমযানের পর মুহাররম মাসের আশুরার রোযা সর্বাধিক ফজিলতপূর্ণ। 

উল্লেখ্য, রোযা ছাড়াও আশুরার দিন নফল নামায,তরজমা সহ পবিত্র কুরআন অধ্যয়ন,ইসলামি আলোচনার মজলিশ ইত্যাদি নানারকম ইবাদাত-বন্দেগির মাধ্যমে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা সর্বোত্তম। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only