বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

রোহিঙ্গা গণহত্যা ও বাংলাদেশে শরণার্থী জীবনের তিন বছর,গণহত্যার বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ, বিস্তারিত পড়ুন



পুবের কলম ওয়েব ডেস্ক:­ তিন বছর আগে ২৫ আগস্ট ২০১৭য় শুরু হয়েছিল রোহিঙ্গা গণহত্যা ও জাতি-সাফাই অভিযান। তিন বছর পরও সেই কালো অধ্যায়ের বীভৎস ঘটনাগুলো আজও তাড়া করছে সর্বহারা রোহিঙ্গাদের। কট্টরপন্থী বৌদ্ধ ও বার্মিজ সেনার যৌথ হামলায় রোহিঙ্গা মুসলিমদের রক্তে ভেসে গিয়েছিল রাখাইন যার পুরনো নাম আরাকান। পরে মায়ানমার সরকার ওই এলাকার নামটাও যাতে লোকে ভুলে যায় তার জন্য নতুন নাম রেখেছে রাখাইন। রোয়ান্ডার পর এমন নৃশংস গণহত্যা দেখেনি বিশ্ব। তবুও নীরব আন্তর্জাতিক মহল। 

হতদরিদ্র রোহিঙ্গাদের গ্রামে আগুন লাগিয়ে নির্বিচারে গুলি করে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চাপিয়ে দেওয়া হয় নিরপরাধ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশুদের ওপর। হাজার হাজার নিষ্পাপ রোহিঙ্গাদের হত্যা করা হয়। বালিকা ও নারীদের ধর্ষণ করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের পরই হত্যা করা হয়। মায়ের চোখের সামনে তাঁর প্রিয় শিশুকে মাথা কেটে মায়ের বুকে ফিরিয়ে দেয় এই উগ্র বৌদ্ধ হারমাদরা। 

এ ধরনের চরম পাশবিক ও ক্ষমার অযোগ্য মানবতাবিরোধী জেনোসাইডের পরও মায়ানমার সরাকার মনে করে তারা কিছুই করেনি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে বহুল সমালোচিত এই গণহত্যা ও জাতি-সাফাই কার্যক্রম নিয়ে বরাবরই উদাসীনতা ও এড়িয়ে যাওয়ার কূটনীতি বেছে নিয়েছে মায়ানমার সরকার। প্রতিবারই সাফাই দিয়ে বলা হয়,প্রথমে না কি সেনাচৌকিতে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছিল রোহিঙ্গারা। তাই পালটা সন্ত্রাসীদের নিকেশ করতে অভিযান চালায় সেনাবাহিনী। আন্তর্জাতিক সব মহল থেকেই অবশ্য সুকি সরকারের এই বানোয়াট যুক্তি খারিজ করা হয়েছে। 

আসলে, মায়ানমারের সেনাবাহিনীর চালানো হামলায় প্রায় ১০ লক্ষ রোহিঙ্গা মুসলিম চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে শুধু প্রাণে বাঁচার আশায় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকায় আশ্রয় নেয়। টেকনাফ নদি পেরিয়ে একহাঁটু কাদাপথ মাড়িয়ে দিনের পর দিন তারা শিশু ও বৃদ্ধদেরকে কাঁধে নিয়ে পাড়ি দেয় বাংলাদেশে। বার্মিজদের ছুরি-বল্লম-টাঙি-তলোয়ার এবং রাইফেল উঁচিয়ে তাড়ার মুখে প্রাণ বাঁচাতে এভাবেই তারা মাইলের পর মাইল পেরিয়ে  আসে সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের এলাকায়।

উদ্বাস্তু শিবিরের এক রোহিঙ্গার কথায়, ‘জোর করে আমাদের জন্মভূমি থেকে খেদানো হয়েছে। আমাদের বাড়ি, ঘর,মসজিদ, স্কুল-মাদ্রাসাগুলো নির্বিচারে অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বাধা দিতে গেলেই বার্মিজ সেনা ও উগ্র বৌদ্ধদের নির্মমতা আরও কঠোর হতো। গুলি-গ্রেনেড-দা-ছুরি ব্যবহার করে তাঁরা নতুন করে হত্যালীলা ও নারী-ধর্ষণে মেতে উঠত।’ তাদের একটিই কথা, ‘যদি প্রাণে বাঁচতে যাও তাহলে আরাকান থেকে চলে যাও।’ ফলে আরাকান প্রদেশ এখন রোহিঙ্গা শূন্য। কিছু বার্মিজ এবং মায়ানমারের সেনারা আরাকানে রোহিঙ্গাদের বাড়ি-ঘর, শস্য-ক্ষেতের দখল নিয়েছে। আর রোহিঙ্গারা শুধুমাত্র প্রাণ হাতে করে কোনওক্রমে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে এসে মুখ থুবড়ে পড়েছে। 

প্রায় ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্যাম্পে ঠাসাঠাসি করে মানবেতর জীবনযাপন করছে। আর ‘ক্যাম্প’ বলতে ছোট ছোট জায়গায় খড় ঝুপড়ি বা টিনের ঘর। বাংলাদেশ সরকার প্রথমে রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করতে না চাইলেও পরবর্তীতে জনমতের চাপে তাঁদের খোলা আকাশের নীচে ঠাঁই দিতে বাধ্য হয়।

রাষ্ট্রসংঘের বিভিন্ন শাখা সংস্থার তদন্তেও প্রমাণ হয়েছে যে, মায়ানমারের সেনা ও উগ্রপন্থী বৌদ্ধরা জাতিগত গণহত্যা সংঘটিত করার উদ্দেশ্যেই নির্মম ও রক্তাক্ত হামলা চালিয়েছিল। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে শরণার্থী শিবিরগুলোতে কোনও রকমে মাথা গুঁজে তিন বছর কাটানো রোহিঙ্গাদের মধ্যে তাই এখন অপরাধ প্রবণতা দেখা দিচ্ছে বলে বাংলাদেশ সরকারের ধারণা। এতবড় সংগঠিত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও জাতি-সাফাই অভিযান দেখেও কানে তুলো আর পিঠে কুলো বাঁধার ভান করছে সারাবিশ্ব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এতবড় মানবিক সংকট আসেনি কোনও দেশে। ম্যানমেড এই সংকটে নিরসনে একমাত্র তুরস্ক ছাড়া আর কোনও দেশ সেভাবে সাহায্যের হাত বাড়ায়নি।

চোখের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে শিশু-কিশোর সন্তানদেরকে। গলা কেটে নেওয়া হয়েছে গৃহকর্তার। ঘুম থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ করে নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে নারীদের। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া নারকীয় গণহত্যার এ রকম বহু যন্ত্রণাবিদ্ধ স্মৃতি রয়েছে শরণার্থী রোহিঙ্গাদের হৃদয়-মনে।

 রাখাইনের সেই রক্তাক্ত দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করেছেন আমিনার মতো অনেকেই। রোহিঙ্গা গণহত্যার তিনবছর পূর্ণ হল আজ ২৫-এ আগস্ট। তাদের উদ্বাস্তু হওয়ার এই দিনটিকে স্মরণ করে নীরব প্রতিবাদ করতে দেখা গিয়েছে বাংলাদেশের শিবিরে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গাদের নয়া জীবনযুদ্ধের শুরু। কিন্তু তাঁরা এখনও বাংলাদেশে অমানবিক জীবনযাপন করে যাচ্ছে। তাদের হাল ফেরা বা আরাকান (রাখাইন) প্রদেশে নিজেদের বাসভূমিতে ফিরে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনায় দেখা যাচ্ছে না। যদিও প্রথমে আন্তর্জাতিক চাপে সুকি সরকার বলেছিল তারা রোহিঙ্গা ভূমিপুত্রদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু তাদের স্বভূমিতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো কোনও পরিবেশই তারা গড়ে তোলেনি। 

বাংলাদেশে অনাহারে-অর্ধাহারে রয়েছে অনেকেই। তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা রোহিঙ্গা পরিবারগুলি এখনও বুঝে উঠতে পারছে না। চোখের পানি ছাড়া তাঁদের আর কোনও সম্বল নেই। হাজার বছর ধরে এই রোহিঙ্গা মুসলিমরা আরাকান ভূেম কাটিয়েছে। মায়ানমার সরকারের অনেক উচ্চতম পদে চাকরি করেছেন অনেকে। ভোটে জিতে সাংসদ-মন্ত্রীও হয়েছেন তাঁরা। কিন্তু ১৯৮২ সালে নতুন আইন করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়। তবে ‘শান্তিতে নোবেলজয়ী’ সু কি-র ‘গণতান্ত্রিক সরকার’ রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যে আচরণ করেছে, তা পূর্বতন সামরিক জান্তা সরকারগুলোও করেনি।

বাংলাদেশ সরকার নিজের জনাকীর্ণ দেশে ১০-১১ লাখ রোহিঙ্গাকে পুনর্বাসিত করতে রাজি নয়। অন্য কোনও দেশও তাদের গ্রহণ করছে না। আর বাংলাদেশ সরকারের কাছে এত জমি বা আর্থিক সম্বল নেই যে তারা পুনর্বাসনের বিরাট দায়িত্ব কাঁধে নেবে। আর রোহিঙ্গাদের যথাযথ নিরাপত্তা দিয়ে আরাকানে ফিরিয়ে নেওয়ারও কোনও উদ্যোগ সুকি সরকার গ্রহণ করেনি। তাই এক অনিশ্চিত ও শূন্য ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে রয়েছে এই ১১ লাখ নির্যাতিত বনি আদম। 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only