শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২০

হিন্দু-বিরোধিতা ও তোষণের শ্বেতপত্র দিন নাড্ডাজি



এ. এইচ ইমরান

বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জে পি নাড্ডা দলের নয়া রাজ্য কমিটির বৈঠকে ভাষণ দিয়েছেন। তিনি বলতে গেলে একটি পুরোপুরি রোডম্যাপই বাতলে দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর দল কী কী ইস্যুতে জনগণের কাছে যাবে, তাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন।


তৃণমূল সরকারকে আক্রমণ করার জন্য সাম্প্রদায়িকতাই যে হবে তাদের প্রধান হাতিয়ার, সে সম্পর্কে সন্দেহের কোনও অবকাশ রাখেননি নাড্ডা। তিনি বলেছেন, তৃণমূল সরকারের নাকি ‘হিন্দু বিরোধী’  মনোভাব রয়েছে। আর রয়েছে নাকি ঘোরতর মুসলিম-প্রেম। তাঁর বক্তব্য তৃণমূল সরকার সংখ্যালঘু তোষণের দ্বারা ভোটের রাজনীতি করে চলেছে। 


বিজেপি এবং সংঘ পরিবারের অন্যান্য সংগঠনের প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে, তাদের ‘মুসলিম চেতনা’। হয়তো সঠিকভাবেই অনেকে বলেছেন, যদি ভারতবর্ষে মুসলিম, খ্রিস্টান এবং শিখ সংখ্যালঘুদের সম্পূর্ণ হতমান করে দেওয়া যায়, সেক্ষেত্রে বিজেপি নির্বাচনে জনমত গড়ার জন্য কোনও ইস্যুই পাবে না। কারণ তাদের অস্ত্র হচ্ছে সংখ্যালঘু বিদ্বেষ ও ভীতি চাগিয়ে তোলা। আর যদি সংখ্যালঘুকে ভোট-বৃত্তের বাইরে ঠেলে দেওয়া যায়, তাহলে হাতে থাকে শুধু ‘পেনসিল’। 


শুধু জে পি নাড্ডা নন। বিজেপিতে প্রায় সব নেতারই মুখে এই স্লোগানটি শোনা যায়। আর তা হচ্ছে, ‘মুসলিম বা সংখ্যালঘু তোষণ’। কিন্তু জে পি নাড্ডা সহ যদি বিজেপি নেতারা পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু তোষণের এক তালিকা প্রকাশ করতেন, তবে বোধহয় বিজেপি সত্যি সত্যি বাজিমাত করতে পারত। 


তবে নাড্ডাজি তালিকা না দিলেও একটি মোক্ষম ঘটনার কথা কিন্তু উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, (বাবরি মসজিদের জমিতে) রাম মন্দির নির্মাণ করার জন্য যে ‘ভূমিপূজন’ হয়, সেদিন পশ্চিমবাংলায় রাজ্য সরকার করোনার জন্য লকডাউন ঘোষণা করে রেখেছিলেন। আর তাতে পশ্চিমবাংলার শ্রীরামের ভক্ত জনগণ নাকি টেলিভিশনে ভূমিপূজন দেখা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অথচ তৃণমূল সরকার ৩১ জুলাই ঈদ-উল-আযহার দিন লকডাউন তুলে নেয়। 


বোঝা যায়, নাড্ডাজির উদাহরণটি বেশ হৃদয়বিদারক। কিন্তু হিন্দু-মুসলিম ওয়াকিফহাল মহল বলছে, নাড্ডাজি কীসের সঙ্গে কীসের তুলনা করলেন! ৩১ তারিখ ঈদের দিন কোনও লকডাউনই ছিল না। অবশ্য যদি নাড্ডাজিদের মনে হয়, ঈদের দিনে লকডাউন ঘোষণা করা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কর্তব্যকর্ম ছিল, তাহলে অবশ্য আলাদা কথা। আর ৫ আগস্ট লকডাউন না তুলে তৃণমূল সরকার বরং রাম মন্দির নির্মাণের ভূমি পূজনকে টেলিভিশনে দেখার সুযোগকে আরও সহজ ও সম্প্রসারিত করে দিয়েছিলেন। এজন্য ধন্যবাদ পাওয়ার পরিবর্তে তৃণমূল সরকারের কপালে জুটল তিরস্কার! 


আবারও বলব, তৃণমূল সরকারের হিন্দু বিদ্বেষের যে ঘটনাটির কথা নাড্ডাজি উল্লেখ করেছেন, তা খুব জোরদার নয়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হিন্দু সংখ্যাগুরুদের রাজ্যের সংখ্যাগুরু হিসাবে সব ধরণের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার দিয়ে চলেছেন। শুধু ধর্মীয় অধিকারের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি হিন্দুদের দুর্গাপুজো ও কালী পুজোয় প্রদেশে লম্বা ছুটি দিচ্ছেন যা বিজেপি শাসিত কোনও রাজ্যে আজ অবধি দেওয়া হয়নি। তা সে দশেরা হোক কিংবা কালীপুজো। 


মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেড রোডে দুর্গাপুজোয় কার্নিভালের ব্যবস্থা করেছেন, যা দেশ বিদেশ থেকে পর্যটক টানছে। দক্ষিণেশ্বর মন্দির ও কালীঘাটের জন্য স্কাইওয়াকের বন্দোবস্ত করেছেন। তারকেশ্বরের জন্য উন্নয়ন পর্ষদ গড়ে ভক্তদের জন্য একটি পুজো ও পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তুলেছেন। একইভাবে নতুনভাবে সাজানো হয়েছে তারাপীঠ মন্দিরকে। বাদ দেওয়া হয়নি লোকনাথ ধামকেও। স্বামী বিবেকানন্দর শিষ্যা নিবেদিতার বাড়িও উদ্ধার করে সেখানে মিউজিয়াম গড়ে তোলা হয়েছে। লেক কালীবাড়িকে বড় জমি লিজ দেওয়া হয়েছে। আর দিঘায় সরকারি খরচে তৈরি করা হবে পুরীর আদলে বিশাল জগন্নাথ মন্দির। একইভাবে ব্যাপক উন্নয়ন করা হয়েছে গঙ্গাসাগরে কপিল মুনীর আশ্রম সংলগ্ন এলাকারও। এভাবে যদি হিসাব করা যায়, তাহলে নাড্ডাজিরা অনেক উদাহরণই পাবেন। 


সংখ্যালঘু সম্পর্কে নাড্ডাজির অসন্তুষ্টির কারণ বোঝা যায়। এ কথা ঠিকই পশ্চিমবাংলায় বড় দাঙ্গা হয় না। সরকার হিন্দু-মুসলিম না দেখে দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেন। এখানে মুসলিমরা নাগরিক হিসাবে তাদের অধিকার দাবি করতে পারেন। শিক্ষা ও অর্থনীতিতে পিছিয়েপড়া মুসলিমদের জন্য সরকার নাগরিক হিসাবে যা তাদের প্রাপ্য সেই লক্ষ্যেই কাজ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তোষণ করার মতো মুসলিম ও খ্রিস্টানদের জন্য মমতা সরকার কী কী ব্যবস্থা নিয়েছেন, তা ভালোভাবে খুঁজে নাড্ডাজিরা যদি একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করেন, তাহলে বোধহয় তাঁর যুক্তি ভোটযুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য হবে। 

 

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only