বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০

মানবতা মায়ানমার পেরিয়ে আজও কাঁদে আ-বিশ্বের আকাশে



 ২ গত ২৬ আগস্ট ‘পুবের কলম’-এ প্রথম পাতায় প্রকাশিত ‘গণহত্যার ৩ বছর, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ কী’ প্রতিবেদনটির পরিপ্রেক্ষিতে এ চিঠি। মানবসভ্যতার ইতিহাসে রোহিঙ্গা গণহত্যা এক চরম লজ্জা ও কলঙ্কের অধ্যায়।


২৫ আগস্ট ২০১৭ বেনজির বর্বরতার মালা গেঁথে মায়ানমারে যে মানবতার নিধনযজ্ঞ শুরু হয়েছিল তার তৃতীয় বর্ষ পূর্ণ হল। নৃশংসতা, নারকীয়তা, নির্লজ্জতার সব নজির ভেঙে কট্টরপন্থী বৌদ্ধ ও বার্মিজ সেনারা যেভাবে নিরীহ রোহিঙ্গা নর-নারীদের হত্যালীলায় মেতেছিল--- সর্বহারা রোহিঙ্গাদের রক্তে ভাসিয়ে দিয়েছিল রাখাইন--- মনে করলে আজও বোবা কান্নায় কঁকিয়ে ওঠে বাংলদেশে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া লক্ষ লক্ষ মানুষ, আজও দুঃস্বপ্নের দিন-রাত তাড়া করে বেড়ায় তাদের। সেদিনের সেই হাড়হিম হিংসার কথা স্মরণ করলে আজও শিউরে ওঠে বুকের ভেতরটা। তিন বছর আগে মায়ানমারে সংঘটিত গণহত্যা ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস দেখেও নীরব ছিল মানবতার ধ্বজাধারী তথাকথিত প্রগতিশীল পৃথিবী। 


১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে সীমাহীন দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছে--- মানবেতর জীবনযাপন করছে। মাবতার এই চরম দুর্দিনে, রোহিঙ্গাদের সীমাহীন দুর্দশা দেখে সেদিনের মতো আজও তারা নীরব। দেখেশুনে মনে হচ্ছে, কানে তুলো আর পিঠে কুলো বেঁধে আছে তারা। অথচ তারা দাবি করে, তারা প্রগতিশীল, তারা মানবতাবাদী। প্রশ্ন জাগে মনে, এটাই প্রগতিশীলতা ও মানবতাবাদের পরিচয়? রোহিঙ্গারা অর্ধাহারে, অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। তাদের না আছে চিকিৎসা, না আছে মাথার ছাদ, ঠাসাঠাসি ক্যাম্প রাষ্ট্রসংঘ? বাংলাদেশ যথেষ্ট মানবিকতা দেখিয়েছে। 


দুনিয়ার বড় বড় নামধারী দেশ রোহিঙ্গাদের দুর্দিনে তাদের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়নি। গরিব হলেও মন ও মানবতার দিক দিয়ে বড় বাংলাদেশ দশ লক্ষ রোহিঙ্গা মুসলিমকে আশ্রয় দিয়েছে, সাধ্যমতো দেখভাল, খাদ্য ও বসবাসের ব্যবস্থা করেছে। এমনিতেই তারা দুর্বল অর্থনীতির দেশ। রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদী দায়িত্ব সামলানো তাদের পক্ষে অসম্ভব। তাই মায়ানমারে তাদের প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করা উচিত। 


কিন্তু না রাষ্ট্রসংঘ, না দুনিয়ার দণ্ডমুণ্ডের কর্তাকেও এ ব্যাপারে কোনও উদ্যোগ নিচ্ছে না। ফলে স্বভূমিতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি বিশবাঁও জলে। শরণার্থী শিবিরের বিভীষিকাময় বর্তমান ও এক অনিশ্চিত শূন্য ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে আছে ১১ লাখ নির্যাতিত বনি আদম। ‘পুবের কলম’ যথেষ্ট মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়ে বিষয়টি পাঠকের সামনে তুলে ধরেছে, সময় ও সমাজের কাছে প্রশ্ন তুলেছে। পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে এ জন্য ধন্যবাদ জানাই।


স্মৃতির সরণি বেয়ে আমরা যদি ফিরে যাই দুঃস্বপ্নের সেই দিনগুলোতে দেখব, রোহিঙ্গা জনজাতিকে মায়ানমার থেকে মুছে দেবার জন্য সেখানকার ‘স্টেট কাউন্সিলর’ আং সান সু কি, জুন্টা মিলিটারি ও বৌদ্ধ মিলিসিয়ারা মিলিতভাবে নারকীয়, পৈশাচিক বর্বরতায় মেতে উঠেছিল। রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর চলেছে অকথ্য অত্যাচার। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। নির্বিচারে চলেছে গণহত্যা। হাত-পা কেটে নেওয়া হয়েছে। নারী-শিশু-বৃদ্ধ কারও রেহাই নেই। দেহের বিভিন্ন অংশ কেটে টুকরো টুকরো করে নাফ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। নারীদের নির্বিচারে ধর্ষণ করা হয়েছে। শিশুদের মায়ের কোল থেকে কেড়ে ছুড়ে দেওয়া হয়েছে আগুনে। যারা বেঁচে ছিল তাদের পেটে খাবার ছিল না। মাথার উপর ছিল না ছাদ। রান্না করার উনুন পর্যন্ত ছিল না। নিজভূমে সর্বহারা হয়ে পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে সারিবদ্ধ পিঁপড়ের মতো কাতারে কাতারে মানুষ প্রতিবেশী বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল। মানবতার এ মৃতু্যমিছিল খাদ্য নয়, বস্ত্র নয়, বাসস্থান নয়, পিছন থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ধেয়ে এসেছিল গুলি।


যে বিষয়টি আমাদের সবচেয়ে বেশি হতবাক করে তা হল--- যে আং সান সু কিকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের লড়াইয়ের জন্য সারা বিশ্ব স্যালুট জানিয়েছিল, শ্রদ্ধায় ভালোবাসায় আমরা যারা তার কাছে মাথানত করেছিলাম, মায়ানমারে নতুন সকালের স্বপ্ন দেখেছিলাম--- সেই আং সান সু কিই মায়ানমারে নৃশংস নরহত্যার নেপথ্য নায়িকা। একজন মানবাধিকার কর্মীর মনে যে এত বিষ থাকতে পারে, ক্ষমতার লোভ যে মানবতার পূজারীকেও পশু করে তুলতে পারে, তা আমরা কখনও কল্পনা করতে পারিনি। এখন বুঝতে পারছি, আমরা ভুল লোককে ভালোবেসেছিলাম, নোবেল পুরস্কার কমিটি ভুল লোকের হাতে তুলে দিয়েছিল নোবেল শান্তি পুরস্কার। ভুলের ভুলভুলাইয়ায় মরীচিকাকে মরুদ্যান ভেবে বিভ্রান্ত হয়েছিলাম আমরা সবাই।


সেদিন মায়ানমারে কেঁদেছে মানুষ। কেঁদেছে মুমূর্ষূ মানবতা। কঁকিয়ে কঁকিয়ে। হাওয়ায় ভেসেছে হাহাকার। স্বজন হারানোর তুমুল আর্তনাদ বোবা কান্নায় কঁকিয়ে কঁকিয়ে মিলে গেছে শূন্য আকাশে। আজও কাঁদছে রোহিঙ্গারা। কাঁদছে মানবতা। শরণার্থী শিবিরে। আলোহীন আনন্দহীন। শীর্ণ-জীর্ণ জীবন। নেই পর্যাপ্ত আহার, আশ্রয়, চিকিৎসার মতো জীবনের ন্যূনতম নিদান। মানবেতর এ জন্তু-জীবন আর কতদিন? জিজ্ঞাসা ওদের। কোনও উত্তর নেই প্রগতি ও সভ্যতার ধ্বজাধারী এ পৃথিবীর।


মায়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যার স্মৃতি বার বার ফিরে ফিরে আসে এবং আসবেও। প্রশ্ন একটাই, কবে ঘুচবে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা? কবে থামবে মানবতার কান্না? মানবতা মায়ানমার পেরিয়ে আজও কাঁদে আ-বিশ্বের আকাশে-বাতাসে। সে কান্না শুনেও নীবর কেন বিশ্ববিবেক? কবে ঘুম ভাঙবে? যারা নেই তারা তো নেই, তারা কবে ন্যায়বিচার পাবে কিংবা আদৌ পাবে কি না আমরা জানি ননা। কিন্তু যারা আছে তাদের দুর্দশা ঘোচাতে আমরা কি বাড়াতে পারি না সহানুভূতির হাত? ওদের কোটরগত চোখ, ফ্যাকাসে মলিন মুখে কি ফোটাতে পারি না একচিলতে হাসি?


মতিউর রহমান, 

ভবানীপুর, মুর্শিদাবাদ 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only