মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

জঙ্গি-মাদ্রাসা, মসজিদ এবং মুর্শিদাবাদ



বিশেষ প্রতিবেদক­‌: ২৪ সেপ্টেম্বর ‘পুবের কলমে’ প্রথম পাতায় প্রকাশিত এবং সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে বহু আলোচিত নওদাপাড়ার ‘মাদ্রাসা কাম মসজিদটি’র ছবি দেখলাম।


বিস্ময়বোধ করছি, মাটির তৈরি এক কামরার ওই ছোট্ট ‘মসজিদ-মাদ্রাসায়’ কী করে ‘জঙ্গিরা’ ট্রেনিং নিত? এবং দিত? কী করে দরজা-জানালা প্রায় না থাকা ওই উন্মুক্ত মসজিদটিতে ‘জঙ্গিরা’ আশ্রয় গ্রহণ করত? কী করেই বা সেখানে সবার চোখের সামনে ট্রেনিং বা পরিকল্পনা-পরামর্শ হত?

 

কিন্তু খবর কাগজের পৃষ্ঠায় ও টেলিভিশনে তাবড় তাবড় সাংবাদিক এবং আলোচকরা ওই মাদ্রাসা কাম মসজিদটিকে একরকম ‘লাদেনের ঘাঁটি’ বানিয়ে ছেড়েছেন! আসলে আমাদের অনেক সাংবাদিক এবং বিদগ্ধ ও বিদ্বেষনন্ধ টিভি আলোচকরা আমার মনে হয় বাংলার মুসলিম সম্প্রদায় সম্পর্কে তেমন কিছুই জানেন না। তারা যেন-তেন প্রকারে মুসলিম সম্প্রদায়কে জঙ্গি কিংবা সন্ত্রাসবাদী বলে প্রচার ও চিহ্নিত করে শুধু পার্থিব নয়, স্বর্গীয় আনন্দ অনুভব করেন। 


এতে কিন্তু আসলে আমাদের দেশেরই ক্ষতি হচ্ছে, ঐক্য ও সম্প্রীতি বিনষ্ট হচ্ছে, যার পরিণতি খ‍ুব মারাত্মক হতে পারে। অবশ্য স্বীকার করতে হবে, এতে  হয়তো কারও কারও ভোট-ব্যাঙ্ক সমৃদ্ধ হতে পারে। ভারতবর্ষের মাদ্রাসা ও মসজিদ আজ প্রায় এক হাজার বছর ধরে কখনোই জঙ্গি আস্তানা হয়ে ওঠেনি। এখানে পবিত্র কুরআন শরীফ, হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনী এবং হাদিস পড়ানো হয়।

 

সব দেশের মানুষের মধ্যে কিছু বিপথগামী মানুষ রয়েছে, যারা আত্মঘাতী আক্রমণকারী হতে প্রস্তুত। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সবথেকে বেশি আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছে শ্রীলঙ্কার হিন্দু, তামিল টাইগাররা (এলটিটিই)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীরা বিগত এক দশকে সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান প্রভৃতি মুসলিম দেশে আক্ষরিক অর্থেই লক্ষ লক্ষ মুসলিম নারী-পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধের উপর গণহত্যা চালিয়েছে। তাদের আগের ইতিহাসও একই রকম রক্তরঞ্জিত।


পশ্চিমবাংলার গ্রামাঞ্চলে গুটিকয়েক তরুণের হোয়াটসঅ্যাপ গ্র‍ুপের সদস্যদের বেআইনি কিন্তু বাল্যখিল্য বার্তালাপকে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল কায়দা বা আইএস-এর ‘মুর্শিদাবাদে মহাপরিকল্পনা’ বলে প্রচার করছে গণমাধ্যমের একটি অংশ। তারা মেঝেতে ছোট্ট একটি ৮ ফুটের এক গর্তকে (হয়তো ওই এলাকায় প্রচলিত শৌচালয়ের নির্মীয়মাণ সেপ্টিক ট্যাঙ্ক-কে) কখনও ‘সুড়ঙ্গ’ কখনও বা ‘বাঙ্কার’, আর কখনও নিজের ঘরেই ‘বিস্ফোরক মজুদ রাখা গুদাম’ বলে অবাধ কল্পনাকে ডানা মেলে উড়তে দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ লেদ মেশিনকে ‘মারাত্মক অস্ত্র’ তৈরির যন্ত্র বলে টিভি আলোচকরা এমনভাবে বলছেন যেন তারা ভয়াবহ মারাত্মক জঙ্গি গ্র‍ুপের রহস্য উন্মোচন করে ফেলেছেন। মনে হবে, আল কায়দা শেষমেশ লেদ মেশিনের দ্বারা প্রাণঘাতী ও গণহত্যার হাতিয়ার তৈরির উদ্দেশ্যে মুর্শিদাবাদের দু’তিনটি গণ্ডগ্রামকে বেছে নিয়েছে! 


আসলে মুসলিমদের সম্পর্কে আতঙ্ক ও বিদ্বেষ তৈরি করাই এসব প্রচারণার লক্ষ্য। যদি কেউ বা কোনও গোষ্ঠী নাশকতামূলক কার্যসূচি নেয়, তবে তারা হিন্দু, মুসলিম, শিখ যে ধর্মবলম্বীই হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। আর দেশবাসীর উচিত তদন্তকারী সংস্থাকে পরিপূর্ণ সহযোগিতা করা। কিন্তু প্রমাণ ছাড়াই ‘জঙ্গি’ বা ‘দেশবিরোধী’ তকমা সেঁটে দিয়ে যেভাবে একটি সম্প্রদায়কে হেয় ও হয়রানি করা হচ্ছে, তাও কিন্তু দেশবিরোধী ও সংবিধান বিরোধী কাজ। প্রকৃত নাগরিক ভূমিপুত্রকে এভাবে নিজভূমে পরবাসী করে দেওয়ার চেষ্টা কখনও শুভ হতে পারে না। দেশের ক্রাইম রেকর্ডগুলোতে অপরাধের যে পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়, তার মধ্যে শতকরা হার হিসেবে মুসলিমরাও রয়েছে। চরম দারিদ্র্য ও বঞ্চনা-বৈষম্যের কারণে হয়তো বা শতাংশ হিসেবে মুসলিমদের সংখ্যা একটু বেশি হতে পারে। অন্তত কারাগারগুলির পরিসংখ্যান তাই বলবে।

 

কিন্তু সংখ্যালঘ‍ুরা নিজেদের অবস্থা উন্নয়নের প্রচেষ্টা করলে তাকে সন্দেহের চোখে দেখা কোনওমতেই সঠিক মানদণ্ড হতে পারে না। ভারতের অন্যতম দরিদ্র জেলা এবং ‘নো ইন্ড্রাস্ট্রি জোন’ করে রাখা মুর্শিদাবাদের মানুষ বিড়ি বেঁধে, মুড়ি ভেজে এবং ভিনরাজ্যে ও দেশের বাইরে রাজমিস্ত্রি, সোনা পালিশ, কৃষি শ্রমিক, আপেল তোলা কিংবা ক্ষেত মজুরের কাজ করে অবস্থা একটু সামলানোর চেষ্টা করছে। মাটির বাড়ি ছেড়ে হয়তো আস্তে আস্তে পাকা বাড়ি করছে। কিছু ব্যবসার কাজও তারা শুরু করেছে। ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করতে না খেয়েও স্কুল, মিশন-স্কুল কিংবা মাদ্রাসায় পাঠাচ্ছে। এই মাদ্রাসাগুলিতে সহপাঠী হিসেবে ইদানীং অমুসলিমদের  বহু বালক-বালিকাও পড়াশোনা করছে। 


মাদ্রাসাকে জঙ্গি তৈরির কারূানার তকমা না দিয়ে বরং প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী তৈরির কারূানাও বলা যেতে পারে। ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদের শিক্ষার শুরু হয়েছিল বিহারের একটি মাদ্রাসায়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ এবং শাহ আজিজুর রহমান আমাদের হুগলি মাদ্রাসার ছাত্র। মাদ্রাসার ছাত্র হিসেবে হিন্দু-মুসলিম অসংখ্যা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নাম পাওয়া যাবে। 

আসুন, জঙ্গি তৈরি না করে আমরা সকলে মিলে প্রকৃত মানুষ ও দেশের সুনাগরিক তৈরি করি। 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only