শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০

আবারও ভয়াবহ গঙ্গা ভাঙন, তলিয়ে গেল আরও ৬৫ বাড়ি



 মুহাম্মদ মুস্তাক আলি, জঙ্গিপুর 

অনেকটা বিড়ালের ইঁদুর ধরার মতো। দু-একদিনের বিরতি। ফের নতুন করে ফুঁসে উঠল গঙ্গা। আবারও চালাল তাণ্ডব। আর বৃহস্পতিবার শেষ বিকেল থেকে শুক্রবার ভোরের আলো ফোটার আগে পর্যন্ত গঙ্গা তার গর্ভে পুরে নিল আরও প্রায় ৬৫টি সাজানো সোনার সংসার। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর বেলাতেও নদীপাড়ে যে বাড়িগুলি দাঁড়িয়েছিল, সেগুলির উপর এখন বয়ে চলেছে নদীর তীব্র স্রোত। কেবল বাড়িঘরই নয়, সামশেরগঞ্জের ধারঘরা-হিরানন্দপুরে গঙ্গার গ্রাসে গাছপালা, জমি, রাস্তাঘাট এখন প্রতি মুহূর্তে জেলার মানচিত্র থেকে মুছেই চলেছে। 


একদিকে, চিরপরিচিত শান্ত গঙ্গারই রুদ্রমূর্তি---অন্যদিকে, সর্বস্বান্ত হয়ে পড়া সামশেরগঞ্জের এই এলাকার মানুষের আর্তনাদ। পরিবেশকে ক্রমশ করুণ থেকে করুণতর করে চলেছে। গত বুধবার রাত থেকে নদী ধসের শিকার হয়েছে মুর্শিদাবাদের একই ব্লকের প্রতাপগঞ্জ পঞ্চায়েতের শিবপুর। ঠিক তার একদিন পরই একই রকমের পরিণতি নিমতিতা গ্রাম পঞ্চায়েতের ধানঘরা-হিরানন্দপুরের। শুক্রবার বিকেলে যখন এই প্রতিবেদন লেখা হচ্ছে সে সময়ও গঙ্গার ভাঙন জারি আছে। ধানঘরার ভাঙনের সত্যতা মিলেছে ফরাক্কার বিডিও জয়দেব চক্রবর্তীর কাছ থেকে। 


তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ হিসেবে ত্রিপল এবং শুকনো খাবার বিলি করা হয়েছে। উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা এ দিনও এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তবে তিনি বিস্তারিত তথ্য তাঁর পক্ষ থেকে দেওয়া সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন। বিষয়টির খোঁজ নেওয়ার জন্য জঙ্গিপুরের মহকুমা শাসক এবং মুর্শিদাবাদ জেলাশাসকের মোবাইলে ফোন করা হয়। কিন্তু উলটো প্রান্ত থেকে কল রিসিভ না করায় কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি। অন্যদিকে, জঙ্গিপুরের সাংসদ তথা বিশিষ্ট শিল্পপতি খলিলুর রহমানের করোনা রিপোর্ট পজিটিভ আসার পর থেকেই বাড়িতে আইসোলেশনে রয়েছেন। তবে তিনি ভাঙনের খবর জানতে পেরে বিচলিত হয়ে পড়েন। 


সূত্রের দাবি, ভাঙনগ্রস্ত এলাকার মানুষের সাহায্যার্থে নূর পরিবারের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিলি অব্যাহত রয়েছে। এই ত্রাণ বিলি পরিচালনা করছেন আলহাজ্ব জয়দুর রহমান। খলিলুর রহমানের মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি সুস্থ রয়েছেন বলে জানান। লোকসভার শীতকালীন অধিবেশনে গঙ্গা-ভাঙন নিয়ে তিনি কেন্দ্র সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন বলে জানিয়ে দেন। গঙ্গার গ্রাসে বাড়ি হারানো ধানঘরার রিন্টু সেখ, মুন্টু সেখ, মেরিনা বিবি, নূরজাহান বিবি, জিয়াউল সেখ, হবিবুল সেখ, আতাবুল সেখ, মইদুল সেখ, আতা সেখ প্রমুখের বক্তব্য, সপ্তাহখানেক আগেও তারা দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি এভাবে গঙ্গা তাদের সর্বস্বান্ত করবে। 


হতভাগ্য মানুষদের অভিযোগ, গঙ্গা পাড়ের মানুষদের রক্ষা করতে কেন্দ্রীয় সরকারের যে মাস্টার প্ল্যানের দরকার ছিল তা হয়নি। অনেকেরই অভিমত--- দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই মুর্শিদাবাদের উন্নয়ন নিয়ে পুরো উপেক্ষা করে গেছে রাজ্য এবং কেন্দ্র সরকার। জেলাকে এইভাবে বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংসদে ঝড় (১৯৬২-১৯৭১) তুলতেন তৎকালীন মুর্শিদাবাদের সাংসদ মরহুম সৈয়দ বদরুদ্দোজা। বর্তমানে সেই কণ্ঠস্বর আর শোনা যায় না। এ প্রসঙ্গে মুর্শিদাবাদের বিশিষ্ট বামপন্থী রাজনীতিক মজফফর হোসেনের প্রতিক্রিয়া, তৎকালীন কেন্দ্র সরকারের ভ্রান্ত ফরাক্কা বাঁধ প্রকল্প এবং মুর্শিদাবাদের প্রতি উপেক্ষার ফসল এই গঙ্গার ভয়াবহ ভাঙন। গঙ্গা ভাঙনে ইতিমধ্যে জেলার কত মৌজা চিরতরে হারিয়ে গেছে সরকারের কাছে সেই খতিয়ানটুকুও বোধহয় সংরক্ষিত নেই। 


উল্লেখ্য, ষাটের দশকে ফরাক্কা বাঁধ নির্মাণের ঘোষণা হতেই এর বিপজ্জনকতা নিয়ে রাষ্ট্রকে সতর্ক করেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী মেঘনাথ সাহা এবং এশিয়ার শ্রেষ্ঠ নদী-বিশেষজ্ঞ কপিল ভট্টাচার্য। তাঁরা সেই সময় বলেন, এই বাঁধ কলকাতা বন্দরের তেমন কোনও সুবিধে দিতে পারবে না। বরং বাঁধ দিলে নদী তার স্বাভাবিক গতি হারাবে। তখন ভাঙন শুরু হবে মালদা-মুর্শিদাবাদ জুড়ে। কিন্তু তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের সেচমন্ত্রী এল রাওয়ের জেদে নির্মিত হয় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বহু বিতর্কের ফরাক্কা ব্যারেজ। এখন প্রকৃত কল্যাণ কার বক্তব্যের মধ্যে ছিল সেটা দেশবাসী হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন।  

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only