শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২০

মুসলিম শাসকদের সম্প্রীতির নিদর্শনগুলি ধ্বংস করা হচ্ছে অযোধ্যায়



প্রদীপ মজুমদার

একটা সময় ছিল যখন অযোধ্যায় একই চত্বরের মধ্যে পৃথক স্থানে হিন্দু মুসলমান মিলিতভাবে প্রার্থনা করতেন। মুসলিম জমিদারদের দানে চলত মন্দিরের ভোগ আরতি। সেই সম্প্রীতির পীঠস্থান অযোধ্যা এখন দেশে মেরুকরণের রাজনীতির কেন্দ্র বিন্দু। দিন কয়েক আগে অযোধ্যার যে প্রাচীন রামজন্মভূমি মন্দিরটি ধূলিসাৎ করে দেওয়া হল, সেই মন্দিরটি নিয়ে আরএসএস, বিজেপি এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদের অস্বস্তি কম ছিল না। ঐতিহাসিকরা প্রশ্ন তুলেছিলেন, অযোধ্যায় যখন দশরথ মহল, কনকভবন, রত্ন সিংহাসন, সীতা রসুইয়ের মতো রাম জন্মস্থান নামে একটি মন্দির আছে, তাহলে সেটাকেই তো রামের জন্মস্থান বলে বিশ্বাস করা উচিত। 


যাঁরা মনে করেন রাম এখানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার বদলে একটি প্রাচীন মসজিদের জমিতেই রাম জন্মেছিলেন বলে দাবিতে অনড় থাকার যুক্তি কি? একটি জন্মস্থান মন্দির থাকার পরও আর একটি জন্মস্থান মন্দির কোন যুক্তিতে হতে পারে? ঠিক এই অস্বস্তি থেকেই ৩০০ বছরের পুরনো রামজন্মস্থান মন্দিরের গুরুত্ব কমানোর তোড়জোড় শুরু করে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকরা। বিশেষ করে ১৯৮৪ সালে রামজন্মভূমি আন্দোলন শুরুর সঙ্গেই ওই প্রাচীন মন্দিরে পুণ্যার্থীদের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা শুরু হয়। শুরু হয় মন্দিরের ‘পবিত্রতা’ খর্ব করার উদ্যোগও। উদ্দেশ্য একটাই আর একটি রামজন্মস্থান নির্ধারণ করার জন্য সেই পুরনো বিশ্বাসের মন্দিরটি ধ্বংস করা জরুরি ছিল, যেটা আগে থেকেই জন্মভূমি মন্দির হিসেবে পরিচিত হয়ে রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় কিছু মহন্ত ও আবেগী মানুষদের জন্য সেটা সম্ভব হচ্ছিল না। সেই কাজটা পুরোপুরি সম্পন্ন করা গেল গত ২৭ আগস্ট, সকলের অলক্ষ্যে, কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে।


বাবরি মসজিদকে ঘিরে যবে থেকে শুরু হয় অশান্তি, তখন থেকেই আশপাশে থাবা বিভিন্ন মন্দিরগুলোতে দর্শনার্থীদের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে পুলিশ-প্রশাসন। অবশ্যই নিরাপত্তার নামে সেই নিয়ন্ত্রণ। এর মধ্যে সবথেকে বেশি প্রভাব পড়ে জন্মস্থান মন্দিরের ক্ষেত্রে। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকরা না চাইলেও এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল লক্ষ লক্ষ রামভক্ত হিন্দুদের আবেগ। তাই সকলের সামনে মন্দিরটি ভাঙা কঠিন কাজ ছিল। তাই শুরু হয় মন্দিরটির চরিত্র বদলানোর কাজ। 


১৯৮৪ সালে মন্দিরের নিচতলায় আবাসিক এলাকায় বানিয়ে দেওয়া হয় পোস্ট অফিস। ১৯৯১ সালের পর থেকে ক্রমশ ওই মন্দিরে বাড়তে থাকে নিরাপত্তা বাহিনীর ভিড়। মন্দিরের দোতলায় মূর্তি থাকা অংশের বাইরে বাকি চত্বর দূল নিয়ে খোলা হয় পুলিশ কন্ট্রোল রুম। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার সময় উত্তরপ্রদেশের পুলিশ আধিকারিকরা ওই মন্দিরে বসেই সাক্ষী ছিলেন মসজিদ ধ্বংসের। সেই সময় বহু সাংবাদিক, চিত্র সাংবাদিকরাও জানিয়েছিলেন, তাঁরা জন্মস্থান মন্দির থেকে মসজিদ ধ্বংস দেখেছেন কিংবা ছবি তুলেছেন। নানা কারণেই ঐতিহাসিক মন্দিরের আর কোনও অস্তিত্বই রাখল না প্রধানমন্ত্রী নির্মিত ট্রাস্ট এবং যোগীর প্রশাসন।


বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার পরে সরকার যখন ৬৭ একর জমির দখল নিয়ে কাঁটা তারের বেড়া লাগিয়ে দেয়, তার মধ্যে ঢুকে যায় ১০-১২ মন্দির। একদা জমিদার মীর মাসুম আলি মন্দিরে ‘ভোগ-আরতি’-র জন্য যে জমি দিয়েছিলেন মন্দিরকে, সেই জমিও চলে যায় কাঁটাতারের ভিতর। মন্দির চালানোর জন্য যে অর্থের প্রয়োজন, তার বেশিরভাগটাই আসত জমির আয় থেকে। সেই জমি কাঁটাতারের ভেতর চলে যাওয়ায় মন্দিরের আয় কমে যায়। 


এমনকী, রামল্লাকে খাওয়ানোর জন্য যে ভোগের আয়োজন হত তার ব্যয় বহনের জন্য জমি দিয়েছিলেন আর এক মুসলিম জমিদার। রামভক্তদের উপদ্রবে রামলালার সেই খাদ্যের সংস্থানই বন্ধ হয়ে যায়। তবে এই একটি মন্দিরই যে রামভক্তরা ভেঙে দিল এমন নয়। বাবরি মসজিদ ভাঙার সময়ে মসজিদের চাতালে সীমা রসুই এবং রাম চবুতরাও ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন রামভক্তরা। সম্ভবত, সেই উন্মত্ত করসেবকের স্রোতের জানাই ছিল না সেখানে একইসঙ্গে হিন্দু-মুসলিমরা নিজেদের উপাসনা করতেন। তারা সবটাই মসজিদের অংশ ভেবেই ধ্বংস করেছিলেন। মুসলিম শাসকরা যে মসজিদের পাশাপাশি হিন্দু প্রজাদের উপসনার ব্যবস্থা করে দিতেন, সেই সম্প্রীতির ইতিহাসটাাকে মুছে ফেলা হচ্ছে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only