বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০

প্রণবদার সঙ্গে কিছ‍ু স্মৃতি (দ্বিতীয় কিস্তি)



 আহমদ হাসান ইমরান

তারপর...

জঙ্গিপুর লোকসভা কেন্দ্রের প্রার্থী প্রণবদার ইন্টারভিউ নিতে হবে, তাই আগের দিনই ট্রেন ধরে আমি জঙ্গিপুর চলে এসেছিলাম। পরদিন দুপুরের দিকে হেলিকপ্টারে করে প্রণবদার আসার কথা। প্রণবদার জন্য মাঠে একটি হেলিপ্যাড তৈরি হয়েছিল। আমি ঠিক করলাম সেখানে গিয়ে প্রণবদার সঙ্গে একবার দেখা করব। দুপুরবেলা আমি মাঠে গিয়ে দেখি চারিদিকে প্রচুর মানুষ। একে তো কংগ্রেস প্রার্থী আসছেন, অন্যদিকে গ্রামের মানুষ হেলিকপ্টারও দেখতে চান। প্রচুর ধুলো উড়িয়ে মাঠের মাঝখানে নামল হেলিকপ্টার। দেখলাম জনতার প্রতি তাঁর একটি দায়বদ্ধতা রয়েছে। তিনি সারা মাঠ ঘুরে ঘুরে হাত জোড় করে জনতাকে প্রণাম করলেন। কোনও একটি কোণও বাদ গেল না। খোলা আকাশের নিচে তখন কাঠফাটা রোদ। এরপরই প্রণবদা একটি সভায় যোগ দেওয়ার জন্য অ্যাম্বাসেডর গাড়িতে করে রওনা হলেন। 


প্রণবদা জঙ্গিপুরে নির্বাচনী প্রচারের জন্য একটি বাড়ি ভাড়া করেছিলেন। আমি ও জি নিউজের ইউসুফ রাত ১০টা নাগাদ সেখানে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। রাত প্রায় ১টা নাগাদ খড়গ্রাম থেকে নির্বাচনী প্রচার সেরে প্রণববাবু ঘরে ফিরলেন। তাঁর সাদা ধুতি, পাঞ্জাবি তখন ঘামে ভিজে জবজব করছে। আমার সঙ্গে থাকা কলমের সাংবাদিক আবদুল ওদুদ বিস্ময় প্রকাশ করলেন, এই বয়সেও প্রাণশক্তির কমতি নেই! 


আমরা ভাবছিলাম হয়তো প্রণববাবু বলবেন, আজ ক্লান্ত। ইন্টারভিউ আগামীকাল বা অন্য দিন নিও। কিন্তু একটু ‘ফ্রেশ’ হয়েই প্রণববাবু সাক্ষাৎকার দিতে চলে এলেন। প্রায় ৩টে পর্যন্ত প্রণববাবু একটি দীর্ঘ ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন। তাতে ভারতের অন্যতম দরিদ্র জেলা মুর্শিদাবাদ, নদীর ভাঙন, মুর্শিদাবাদের বিড়ি শ্রমিক থেকে শুরু করে নানা বিষয় উঠে এল। জি নিউজ মূলত জাতীয় প্রেক্ষাপট এবং আগামী নির্বাচন নিয়ে প্রণবদাকে প্রশ্ন করেছিল। সাপ্তাহিক কলম-এ প্রকাশিত দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি পড়ে প্রণববাবু খ‍ুশি হয়েছিলেন। 


এরপর নির্বাচনে জঙ্গিপুর থেকে বিজয়ী হলেন প্রণব ম‍ুখোপাধ্যায়। আমি তখন রেডিয়ো তেহেরান-এর বাংলা বিভাগে ভারত-প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করি। বাংলা বিভাগ থেকে অনুরোধ এল, যদি প্রণববাবুর একটি ছোট সাক্ষাৎকার পাওয়া যায়। আমি বলতেই প্রণবদা সাগ্রহে রাজি হলেন। জেতার পর হয়তো এটাই ছিল তাঁর দেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকার। তখন তিনি জয়ের সার্টিফিকেট নিয়ে কলকাতা ফিরছিলেন। জঙ্গিপুরে জেতাকে স্বাভাবিকভাবেই প্রণববাবু বলেছেন, তাঁর রাজনৈতিক জীবনে একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’। প্রণববাবু এর আগে কখনোই লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি। 


বরাবর তিনি রাজ্যসভার সদস্য হিসাবেই মন্ত্রিসভায় ছিলেন। তাই জঙ্গিপুরের ৭৫ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত কেন্দ্র থেকে জয় লাভ করে এই ব্রাহ্মণ সন্তান খ‍ুবই খ‍ুশি হয়েছিলেন। তাঁর এই জয় আবারও প্রমাণ করে জঙ্গিপুরের মুসলিমরা সাম্প্রদায়িক ভাবনাতে বন্দি নন। তারা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে যেকোনও যোগ্য ও সেক্য‍ুলার প্রার্থীকে জয়ী করতে প্রস্তুত। এরপর প্রণব ম‍ুখোপাধ্যায়কে দেশের মন্ত্রিসভায় প্রতিরক্ষা দফতরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আমরা স্থির করলাম, প্রণববাবুকে আমাদের বাংলা থেকে একটি সংবর্ধনা দেওয়া উচিত। তাঁর কাছে এই প্রস্তাব রাখতেই তিনি সাগ্রহে রাজি হলেন। 


আমরা পার্ক সার্কাসের ‘ডন বস্কো’ স্কুলের অডিটোরিয়ামে তাঁর এই সংবর্ধনার আয়োজন করেছিলাম। পশ্চিমবাংলার বিশিষ্ট মুসলিমরা এই সংবর্ধনা সভায় উপস্থিত ছিলেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাইফি হল ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলের সাধারণ সম্পাদক জনাব মোতিওয়ালা, জনাব আইনুল হক, উর্দু পত্রিকা ‘আজাদ-হিন্দ’-এর সম্পাদক ও সাংসদ আহমদ সাইয়েদ মালিহাবাদি, শাহ আলম, জনাব মুহাম্মদ সোহরাব প্রম‍ুখ। 


উর্দু ও বাংলাভাষী বিশিষ্ট মুসলিমরা প্রণববাবুকে শুভেচ্ছা জানান। সাইফি হল স্কুলের এনসিসি ক্যাডাররা ডন বস্কো স্কুলের গেটে তাঁকে রিসিভ করে ব্যান্ড ও কুচকাওয়াজের মাধ্যমে হলে নিয়ে আসে। এতে প্রণববাবু খ‍ুব খ‍ুশি হয়েছিলেন। অনুষ্ঠান শুরু হয় ইকবালের ‘সারে জঁহা সে আচ্ছা, হিন্দুস্তা হামারা’ এই তারানা দিয়ে আর শেষ হয়েছিল জাতীয় সংগীত দিয়ে। অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করতে গিয়ে আমি একটু মজা করে বলেছিলাম, জঙ্গিপুরের সাংসদকে সঠিকভাবে ভারতের ‘জঙ্গ’ (যুদ্ধ) পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। 

(চলবে)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only