শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০

তসলিমা নাসরিন সম্পর্কে কি বলেছিলেন প্রণব ম‍ুখোপাধ্যায়‍? জানতে পড়‍ুন আহমেদ হাসান ইমরানের ‘প্রণবদার সঙ্গে কিছ‍ু স্মৃতি’র তৃতীয় কিস্তি



 আহমদ হাসান ইমরান

তারপর...

২০০৮ সাল। প্রণব মুখোপাধ্যায় তখন ভারতের বিদেশমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। কংগ্রেসের নেতা এবং প্রণব মুখোপাধ্যায়ের বন্ধু জঙ্গিপুরের মুহাম্মদ সোহরাব একদিন আমাকে বললেন, ‘প্রণব দার সঙ্গে আমার আলোচনা হয়েছে। তোমাকে প্রাইম মিনিস্টার ডেলিগেশনের সদস্য হিসাবে এ বছর হজে পাঠানো হবে।’ শুনে অবশ্যই খুশি হয়েছিলাম। তারপর নয়াদিল্লির বিদেশ দফতর থেকে আমার পাসপোর্ট চেয়ে পাঠানো হল। আমি নির্দেশ মোতাবেক দিল্লির বিদেশ দফতরের নির্দিষ্ট আধিকারিকের কাছে পাসপোর্ট পাঠিয়ে দিলাম। কয়েকদিন পর ফের ল্যান্ড লাইনে জনাব মুহাম্মদ সোহরাব সাহেবের ফোন এল। ২০০৮ সালে মোবাইল ফোনের এত ছড়াছড়ি ছিল না। তিনি বললেন, প্রণবদা তোমার উপর রেগে গেছেন। আমাকে বললেন, ইমরান এখনও কেন তার পাসপোর্ট পাঠায়নি? আমি তো ওর নাম প্রধানমন্ত্রীর হজ প্রতিনিধি দলে দিয়েছিলাম। ওর জন্য আমাদের প্রতিনিধি দলের তালিকা চূড়ান্ত করতে দেরি হচ্ছে।


আমি বললাম, দিন পনেরো আগে একটি নামি ক্য‍ুরিয়ারে আমি তো পাসপোর্ট পাঠিয়ে দিয়েছি। তার রিসিপ্টও পেয়ে গেছি। সোহরাব সাহেব বললেন, কিন্তু প্রণবদা বলছেন শুধু ইমরানের পাসপোর্টটাই আসা বাকি রয়েছে। পরেরদিন আবার বিদেশ দফতরের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিকের ফোন এল ঘরের ল্যান্ড লাইনে। তিনি বললেন, আমরা তো আপনার নাম ডেলিগেশনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছি। কিন্তু মাননীয় মন্ত্রী বলছেন, ইমরানের নাম কোথায়? আগে ইমরানের নাম তালিকায় ঢুকিয়ে তারপর আমার টেবিলে ফাইল দেবে।


আমি বিষয়টি বুঝতে পারলাম। পাসপোর্টে আমার নাম হচ্ছে আহমদ হাসান। এটাই আমার আসল নাম। আর ডাকনাম হল ‘ইমরান’। প্রণবদা তালিকায় ‘ইমরান’ নাম না পেয়ে দু-দু’বার তা ফেরত দিয়েছেন। ওই আধিকারিককে বিষয়টি বুঝিয়ে বললাম। তিনি হেসে বললেন, বাঁচা গেল। এখনই মাননীয় মন্ত্রীকে গিয়ে বিষয়টি বলছি। হেসে ওই আধিকারিক আরও বললেন, এরপর পাসপোর্টে আপনার নামের পাশে অবশ্যই ‘ইমরান’ লিখবেন। আপনাকে তালিকাভুক্ত করতে গিয়ে আমাদের তো ঘাম ছুটে গেছে। মনে হল, প্রণবদা বিদেশ মন্ত্রী হিসেবে ব্যস্ততার মধ্যে সময় অতিবাহিত করেন। কিন্তু আমাকে যে ডেলিগেশনে মনোনীত করেছেন, তা তিনি ভুলে যাননি। তাই স্নেহভাজন ইমরানের নাম তালিকায় না দেখে ভেবেছিলেন, আধিকারিকরা হয়তো ঠিকমতো আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।


এরপর প্রণবদার সঙ্গে আরেকটি স্মৃতিও মনে পড়ছে। প্রণব দা দিল্লি থেকে কলকাতায় এলে আমি, মিল্লি ইত্তেহাদের সম্পাদক আবদুল আজীজ সাহেব এবং জনাব ইদ্রিশ আলি তাঁর ঢাকুরিয়ার বাড়িতে দেখা করতে গিয়েছিলাম। কি বিষয়ে তা অবশ্য এখন মনে পড়ছে না। একটু পরেই আমাদের ডেকে পাঠালেন। বললেন, ইমরান, খবর বলো। হঠাৎ ইদ্রিশ সাহেবের দিকে তাঁর নজর পড়ল। কোনও একটি বিষয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক সম্পর্কে ইদ্রিশ সাহেব যে মন্তব্য করেছিলেন, তা তাঁর পছন্দ হয়নি। ইদ্রিশ সাহেবকে আমাদের সামনেই একটু বকলেন। কিন্তু তারপরেই বললেন, ইদ্রিশ এভাবে তোমার কথা না বলাই ভালো। বুঝলাম, ইদ্রিশ সাহেবের প্রতি তাঁর স্নেহ-ও রয়েছে।


সে সময় তসলিমা নাসরিনের লেখা একটি বই নিয়ে কলকাতার মুসলিম সমাজ খুবই ক্ষুব্ধ। তসলিমা নাসরিন তাঁর ‘দ্বিখণ্ডিত’ নামের পুস্তকটিতে হয়তো একটি মহলকে খুশি করার লক্ষে হযরত মুহাম্মদ সা. ও ইসলামের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন নানা অবমাননাকর কথা লিখেছিলেন। ফলে পুস্তকটি নিষিদ্ধকরণের দাবি ওঠে। আমি প্রণবদাকে বললাম, বিদেশিনী এই লেখিকা অতিথি হয়েও আমাদের দেশে হিন্দু-মুসলিম সংহতি নষ্ট ও সমাজে উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা করছেন। অথচ, আমাদের সরকার তাঁকে এই দেশে থাকতে দিয়েছেন।


প্রণববাবুর জবাবটি আমার চিরকাল মনে থাকবে। তিনি বললেন, ‘একজন লেখিকা হিসাবে তাঁকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তসলিমা নাসরিনের বইপত্র পড়ে আমি অবাক হয়ে গেছি। ‘দ্বিখণ্ডিত’ পড়তে গিয়ে দেখলাম, শুধু ইসলাম নয়, নিজের মাকেও তসলিমা খুবই কদর্যভাবে বর্ণনা করেছে। ‘দ্বিখণ্ডিত’ ও তাঁর অন্যান্য বইও অশ্লীলতায় ভরা। দ্বিখণ্ডিত আমি পড়ছিলাম। কিন্তু শেষ করতে পারিনি। দ্বিখণ্ডিত পড়তে গিয়ে সবসময় লক্ষ্য রাখতে হত, আমার মেয়ে বা পরিবারের অন্য কেউ দেখছে না তো যে বইটি আমি পড়ছি! কিশোর বা তরুণরা প্রাপ্ত বয়স্কদের বই পড়লে যেমন বালিশের তলায় লুকিয়ে রাখে, তেমনি অবস্থা আর কি।’


আমরা হাসতে বাধ্য হলাম। আবদুল আজীজ বললেন, আপনার কাছে আমাদের আবেদন, এই ধরনের পুস্তক বাজেয়াপ্ত হওয়া উচিত। আর বিদেশি কাউকে আমাদের দেশের আইন-শৃঙ্খলা নষ্ট হয়--- এমন কিছু করার অনুমতি দেওয়া বোধহয় উচিত নয়।

(চলবে)


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only