শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০

দুনিয়ায় আমরা দু-দিনের মুসাফির, পরকালই চিরস্থায়ী ঠিকানা



মুদাস্সির নিয়াজ

কবি লিখেছেন, ‘পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয়, মরণ একদিন মুছে দেবে সকল রঙিন পরিচয়।’ সত্যিই তো এই পৃথিবীতে আমরা দু-দিনের মুসাফির। ইহকাল হল ক্ষণস্থায়ী, পরকালই মানুষের চিরস্থায়ী ঠিকানা। এখানে ৬০-৭০ বছরের হায়াত প্রতি মুহূর্তে বরফের মতো গলে যাচ্ছে। ওখানে আদি-অনন্তকাল কাটাতে হবে। দুনিয়ায় যে যেমন আবাদ বা আমল করবে, আখেরাতে তেমনই ফসল পাওয়া যাবে। অর্থাৎ যেমন কর্ম তেমন ফল।


 একদিন সবাইকে রঙিন পৃথিবীর মায়াত্যাগ করে বিদায় নিতে হবে। আমরা আমাদের ম্যানুফ্যাকচারিং ডেট জানলেও এক্সপায়ারি ডেট জানাটা আমাদের সাধ্যের অতীত। অন্তর্যামী একমাত্র আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন। সূরা আল-ইমরানের ১৮৫ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘কুল্লু নাফসিন জায়েকাতুল মউত।’ অর্থাৎ ‘সব মানুষকেই একদিন মৃত্য‍ুর স্বাদ নিতে হবে।’ মৃত্য‍ুর ঊর্ধ্বে আমরা কেউ নই। রক্ত-মাংসের এই নশ্বর জীবন হল কচুপাতায় একফোঁটা পানির মতো। দুনিয়াভি চাকচিক্য বা শান শওকতময় জীবনকে আলবিদা জানিয়ে মাটির দেহ একদিন মাটিতে মিশে যাবে। সেখানে কেউ আমাদের সঙ্গী হবে না। একাকী ভোগ করতে হবে কর্মফল। সেখানে কেউ আমাদের হয়ে ওকালতি করতে পারবে না। কবর থেকেই শুরু হয়ে যাবে পরপারের জীবন। 


তাই প্রিয়নবী সা. কবরের আজাব, পরকালের ভয়াবহতা ও আখেরাতের নিদারুণ পরিণাম সম্পর্কে সকলকে সাবধান-সতর্ক করে গিয়েছেন। জান্নাতের সুসংবাদদাতা এবং জাহান্নামের ভয়াবহতা সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করার উদ্দেশ্যেই তাঁকে নবীকুলের সর্দার হিসেবে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছিল। সূরা আত-তাহরিমের ৬ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘কু আনফুসা কুম ওয়াহলিকুম নারা।’ অর্থাৎ ‘তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের আহেল বা পরিজনকে দোজখের আগুন থেকে রক্ষা কর।’ 


মৃত্য‍ুর নাগাল থেকে আমরা কেউ পালাতে পারব না। কিন্তু যদি আমরা জীবদ্দশায় আল্লাহর নির্দেশিত এবং রাসূল সা.-এর প্রদর্শিত পথে চলার চেষ্টা করি, তাহলে জাহান্নামের ভয়াবহ আজাব-গজব থেকে নিস্তার পেতে পারি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় সম্পূর্ণ উলটো চিত্র। আমরা মৃত্য‍ুর কবল বা ছোবল থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে কত কিছুই না করি। কিন্তু পরকাল বা আখিরাতের সাজা থেকে হেফাজতের জন্য তেমন কিছু করি না। 


কিন্তু মনে রাখতে হবে, কবরের আজাব কিংবা জাহান্নামের লেলিহান শিখা থেকে কেউ আমাদেরকে বাঁচাতে পারবে না। আল্লাহ্র আযাব-গজব থেকে বাঁচতে হলে নিজের দু-হাতের আমলই একমাত্র সম্বল। কারও ওসিলা-সিলসিলায় পুলসিরাত পার হওয়া যাবে না। কারও সাফায়াত বা সুপারিশ সেখানে কাজে লাগবে না। সেদিন একমাত্র নিজের আমলনামাই হবে ওসিলা। এ ছাড়া নাজাতের কোনও বিকল্প মাধ্যম নেই। কুরআন-হাদিসের ওসিলা কিংবা সিলসিলা ছাড়া কোনও কিছুই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। 


কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, এ সব ব্যাপারে সঠিক ধারণা না থাকায় আমরা জীবনভর দুনিয়াভি লাভ-ক্ষতির খতিয়ান নিয়েই মশগুল থাকি। মরিচিকার পিছনে অবিরাম দৌড়ে যাই, মরুদ্যানের সন্ধান পাই না। জায়েজ-নাজায়েজ, হারাম-হালাল, গুনাহ-সওয়াব, হক-না-হক নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাই না। সস্তায় জান্নাত পাবার আশায় বিপথগামী হয়ে যাই। জাগতিক রঙিন মোহে আবিষ্ট হয়ে গড্ডালিকা স্রোতের জীবন-তরণী ভাসিয়ে দিই। অথচ বৈতরণী পার হতে পারি না। 


অথচ পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘জান ও মালের বিনিময়ে আল্লাহ্ আমাদের জান্নাত খরিদ করে নিয়েছেন।’ কেবলমাত্র নামায, রোযার মতো কিছু সহজ আমল করলেই কিংবা পরহেজগারি অবলম্বন করলেই নাজাত মিলবে না। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে আমাদেরকে দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছে পরীক্ষার জন্য। শেষ বিচার দিবস সম্পর্কে সূরা বাকারাহ’র ৪৮ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা সেই দিনের ভয় কর। 


যেদিন কেউ কারও সামান্যতম উপকারে লাগবে না। কারও পক্ষে কোনও সাফায়াত বা সুপারিশ কার্যকর হবে না। কারও কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ নেওয়া হবে না। তারা কোনও সাহায্য পাবে না।’ অর্থাৎ শেষ বিচার দিবসে ইহজীবনের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের জন্য আল্লাহর সামনে প্রত্যেককে জবাবদিহী করতে হবে। সেই আদালতে কোনও আইনজীবী থাকবে না, লাগবেও না। বিচারক ও ফরিয়াদি মুখোমুখি সওয়াল-জওয়াব হবে। নেক্ আমলের মাধ্যমে দুনিয়ায় যারা আখিরাতের জন্য পুঁজি সঞ্চয় করেছে, কেবলমাত্র তারাই সেদিন কামিয়াব হবে।


তবে আল্লাহ্তায়ালা কারও সঙ্গে পক্ষপাত করবেন না। সবাই যে যার আমলনামা অনুযায়ী ইনসাফ পাবে। তাই আমরা যেন সকল কাজে একমাত্র আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করতে পারি। সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ যেন আমাদেরকে সেই তাওফিক দেন। আমিন।   


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only