সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০

‘লাভ জিহাদ’-এর ধুয়ো তুলে বন্ধ করে দেওয়া সিরিয়াল ‘বেগম জান’ পুনরায় সম্প্রচারের নির্দেশ হাইকোর্টের




 পুবের কলম প্রতিবেদকঃ ‘লাভ জিহাদ’ ছড়াচ্ছে ‘বেগম জান’ সিরিয়াল। এছাড়া অভিযোগ ছিল, এই সিরিয়ালে মুসলিমদের ‘ভালো’ হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছে। এই দুই অভিযোগ তুলে রে-রে করে আসরে নেমেছিল অসমের উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। 

শুধুমাত্র তাদের প্রবল আপত্তির কারণেই ‘বাস্তব চিত্র’ খতিয়ে না দেখেই তড়িঘড়ি সিরিয়ালটি বন্ধ করে দেন গুয়াহাটির পুলিশ কমিশনার। বলা ভাল ‘হিন্দু আগ্রাসনের’ কাছে আত্মসমর্পণ করেন পুলিশ কমিশনার। গুয়াহাটি হাইকোর্টের এদিনের রায় বিজেপি-শাসিত অসমের প্রশাসনের গালে বড় থাপ্পড় বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। কারণ হাইকোর্ট সাফ জানিয়ে দিয়েছে  সিরিয়ালটির চিত্রনাট্যে এমন কোনও ঘটনা দেখানো হয়নি যা দেশের নিরপেক্ষতা ও সম্প্রীতিকে বিঘ্নিত করে। 

আদালতের নির্দেশে ফের টিভিতে ফিরছে ‘বেগম জান’। ‘লাভ জিহাদ’-এর ধুয়ো তুলে সিরিয়ালটি নিষিদ্ধ করার দাবিতে সোচ্চার হয়েছিল কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা। তারপরই এক ধাক্কায় সিরিয়ালটির সম্প্রচার বন্ধ করে দেয় অসম পুলিশ। শনিবার গুয়াহাটি হাইকোর্ট পুলিশ প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে পুনরায় সিরিয়ালটি সম্প্রচার করার নির্দেশ দিয়েছে। 

উগ্র হিন্দুত্ববাদী ও গেরুয়া বাহিনীর প্রবল আপত্তিতে গুয়াহাটি পুলিশ কমিশনার ৬০ দিনের জন্য ‘বেগম জান’-এর সম্প্রচার আটকে দেন। কট্টরপন্থীদের অভিযোগ ছিল, সিরিয়ালে যা দেখানো হচ্ছে তা নাকি দেশের সংবিধানের নিরপেক্ষ নীতিগুলিকে প্রভাবিত করছে। সিরিয়ালটি নিয়ে অভিযোগ ওঠায়û পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি জেলা তদারক কমিটি সিরিয়ালের বিষয়বস্তু খতিয়ে দেখে। সবথেকে আশ্চর্যের তদারক কমিটিও সিরিয়ালটি নিষিদ্ধ করার পক্ষেই রায় দেয়। তদারক কমিটির সম্মতির পরই এক নির্দেশিকা জারি করে সিরিয়ালটির সম্প্রচার বন্ধ করে দেন কমিশনার। 

শুধু তাই নয়– সিরিয়ালটির প্রস্তুতকারক সংস্থা ও সম্প্রচার সংস্থাকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়। পুলিশ কমিশনারের এই পদক্ষেপের পাশাপাশি হিন্দুত্ববাদী এক ভুঁইফোড় সংস্থা ‘ইউনাইটেড ট্রাস্ট অব অসম’ নামে একটি সংস্থা হাইকোর্টে আবেদন করে ‘বেগম জান’-এর বিরুদ্ধে ‘আইনত’ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। অন্যদিকে ‘বেগম জান’ নিষিদ্ধ করার নির্দেশিকাকে চ্যালেঞ্জ করে গুয়াহাটি হাইকোর্টে আবেদন করে সিরিয়ালটির প্রস্তুতকারক সংস্থা ‘এ এম টেলিভিশন’। 

তারপরই হাইকোর্ট সিরিয়ালটি সম্প্রচারের নিষেধাজ্ঞাকে অবৈধ বলে রায় দেয়। উল্লেখ্য– এর আগেও ৩ সেপ্টেম্বর গুয়াহাটি হাইকোর্ট ২৪ আগস্ট প্রদত্ত পুলিশ কমিশনারের দেওয়া নির্দেশিকাকে খারিজ করে দিয়ে বলেছিল– এটি শুধু তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রকের আদেশই লঙ্ঘন করেনি– স্বাভাবিক ন্যায় বিচারের নীতিকেও লঙ্ঘন করেছে। শুধু তাই নয়– পুলিশের সমালোচনা করে আদালত বলেছিল– তারা এক্ষেত্রে নিজেদের বাস্তব বুদ্ধি প্রয়োগ করেনি। আদালত আরও বলেছে– টিভি সিরিয়ালটির কোন অংশ আপত্তিজনক এবং কী কারণে তা নিয়ে আপত্তি তোলা হচ্ছে সে সম্পর্কেও কমিটির রিপোর্টে কোনও উল্লেখ নেই।

প্রসঙ্গত– ‘বেগম জান’ সিরিয়ালটিতে মুসলিম চরিত্রগুলিকে  ‘ভালো হিসাবে’ চিত্রিত করা হয়েছে। আর এতেই গাত্রদাহ শুরু হয় উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির। ‘বেগম জান’-এর এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগকে রুখতে তারা বিজেপি-শাসিত অসমের পুলিশকে দিয়ে সহজেই সিরিয়ালটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে সক্ষম হয়। দর্শকরা জানাচ্ছেন– সিরিয়ালের মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে মুসলিম মহল্লায় এসে সমস্যায় পড়া এক হিন্দু তরুণী। তখন মুসলিমরাই ওই তরুণীর জাত-ধর্ম না দেখে তার প্রতি আন্তরিকভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। তাদের মধ্যে এক মুসলিম যুবক ওই হিন্দু তরুণীকে সহায়তার ব্যাপারে সবথেকে বেশি আন্তরিক ছিল। শুধু এটুকুতেই ঘটনাটিকে ‘লাভ জিহাদ’ তকমা দিয়ে আসরে নামে উগ্রবাদীরা।

বেগম জান’ সিরিয়ালের মুখ্য নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করা প্রীতি কঙ্গনা আগেই জানিয়েছেন– এই ধরনের চরিত্র করার জন্য তাঁকে অনলাইনে ধর্ষণ– খুনের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। অভিনেত্রীর দাবি– সিরিয়ালে কোথাও ‘লাভ জিহাদ’ দেখানো হয়নি। বিপদে পড়া একজন হিন্দু তরুণীকে এক মুসলিম যুবক সাহায্য করছেন–এটাই সিরিয়ালের মূল গল্প। 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only