মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২০

প্রণববাবুর পরিবারের পুরোহিতের চোখে আজ শুধু স্মৃতি...



দেবশ্রী মজুমদার, মিরাটি:  মায়ের মূর্তির কাঠামোতে মাটি দেওয়া হয়েছে। পুজো হবে। তবে প্রণববাবু নেই, ভাবতেই মন খারাপ হয়ে যায়। তাই মিরাটি ছুটে গেছিলাম। কথা গুলো ভারি গলায় বললেন মুখার্জি পরিবারের পুরোহিত ড. তরুণ মুখোপাধ্যায়।

 

তিনি জানান, ২০১৩ সাল থেকে প্রণববাবুর বাড়িতে দুর্গাপূজা করে আসছেন তিনি। পারিবারিক পুরোহিত হিসেবে, খুব কাছ থেকে দেখেছেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়কে। ষষ্ঠীর আগেই পৌঁছুতে হত তরুণ মুখোপাধ্যায়কে। ষষ্ঠীর দিন এসে, দেখা হতেই জিজ্ঞেস করতেন, তরুণ, কেমন আছো?  তাঁর কথায়,  খুব সময়ানুবর্তী ও নিয়মনিষ্ঠ ছিলেন প্রণববাবু। ঘড়ি ঘন্টা ধরে পুজোর সময় হাজির হতেন। বাড়ির বেলতলায় গর্ত করে দেবীর বোধন অধিবাস হতো। তার পর প্রণববাবু জিজ্ঞেস করতেন, তরুণ, কাল কখন দোলা ভরতে যাব। 


ঠিক সময়ে ধুতি পরে হাজির হতেন। উনি তো ষষ্ঠীর দিন আসতেন। তার আগেই কুয়ে নদীর বাঁধানো ঘাটে ডুবুরিরা জলে নেমে সব দেখে নিত। হাতে ধরা থাকতো উনার পছন্দের সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের পুরোহিত দর্পণ। তবে উনার সব মুখস্থ ছিল। গড়গড় করে আওড়াতেন দুর্গার স্নানমন্ত্র। প্রতিদিন চণ্ডিপাঠ করতেন। তবে সেটা করতেন দুর্গা মন্দির লাগোয়া নারায়ণ মন্দিরে। প্রতিদিন অঞ্জলী দিতেন। ১০৮টি পদ্ম ও ১০৮টি প্রদীপ প্রজ্জ্বলন হতো। সন্ধীপুজোর‌ সময় ঠিক হাজির হতেন। উনি তন্ত্র ধারক ছিলেন। আমি ছিলেম পুরোহিত। প্রথমে বাড়ির পুরানো পুরোহিত সুভাষ দা তন্ত্র ধারকের কাজ হিসেবে মন্ত্র বলতেন, আমি পুজো করতাম।


পরে, সুভাষ দা আসেন নি। প্রণববাবুই তন্ত্র ধারকের কাজ করতেন। প্রথমে একটু কেমন লাগতো, সমীহ করতাম, এতবড়ো পণ্ডিতের সামনে মন্ত্রোচ্চারণ করবো! উনি যে আমার পুজোয় সন্তুষ্ট ছিলেন, বুঝতে পেরেছিলাম। উনি আমাকে বলেছিলেন, যতদিন বেঁচে থাকব, তোমাকেই বাড়ির পুজো করতে হবে। তার অন্যথা হয় নি। শুধু তাই নয়, আমাকে স্বহস্তে একটি শংসাপত্র লিখে দিয়েছিলেন। সেগুলো এখন স্মৃতি। মুখুজ্জে পরিবারে বলি প্রথা ছিল না, বলে জানান তরুণ মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেন, প্রণববাবুর বাবা স্বাধীনতা সংগ্রামী কামদাকিঙ্কর মুখোপাধ্যায় গান্ধীজি আদর্শে অহিংসার পুজারী ছিলেন। 


পরিবারের নিয়ম অনুযায়ী মাকে বিসর্জন পর আমাকে বিশেষার্ঘ্য শঙ্খ হাতে নিতে হত। তার পর দুর্গা মন্দিরকে সাতবার প্রদক্ষিণ করতে হতো। -- (দুর্গাং শিবাং শান্তি করিং/ ব্রহ্মাণী ব্রহ্মণ্য প্রিয়াম) স্তোত্রপাঠ সহ প্রদক্ষিণ  করতে করতে আগে যেতেন প্রণববাবু , আমি শঙ্খ হাতে এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা আমার পিছন পিছন যেতেন। শেষে সাষ্টাঙ্গে মন্দিরে প্রনাম করতেন প্রণববাবু।


একবার মাত্র নবমীর দিন উনি মিরাটি ছেড়েছিলেন, দিল্লি যাওয়ার জন্য। তাও হোম শেষ হওয়ার পর মুখে কিছু তুলেছিলেন, তার আগে নয়। দশমীর দিন সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে দেশের উদ্দেশ্যে বিজয়া ও অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের জন্য শুভেচ্ছা বার্তা দিতেন। তার পর ১০-৩০ নাগাদ দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা দিতেন। তরুণ মুখোপাধ্যায় বলেন, একটা বিষয় না বললেই নয়। উনি আমাকে আপনি আজ্ঞা করতেন। সেটা বারণ করাতে তুমি বলতেন। কিন্তু দশমীর ঘট বিসর্জনের পর উনাকে প্রণাম করতে গেলেই, উনি বলতেন-- তুমি আমার পুরোহিত। তোমার প্রণাম নেওয়া ঠিক নয়।


আমার নাছোড়বান্দা ভাব দেখে, প্রণববাবুর ছেলে অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় বাবাকে বলতেন, মায়ের ঘট বিসর্জন হয়ে গেছে। এবার নিতে পারো। কতটা নিয়মনিষ্ঠ ছিলেন উনি। তার পর তাঁর স্নেহের আমন্ত্রণে রাইসিনা হিল গেছি। উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছি। ১৩ নং তালকোটরা লেনে উঠি। সরকারি গাড়িতে ঘুরেছি। রাইসিনার ৩৪০ টি রুম ঘুরেছি। আজ সেই সব স্মৃতিতে চোখ বাষ্পাকুল হয়ে যাচ্ছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only