বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রণব ম‍ুখোপাধ্যায়ের প্রথম কর্মস্থল বাঁকড়া হাই স্ক‍ুল, বিস্তারিত পড়‍ুন



 আসিফ রেজা আনসারী

প্রণব ম‍ুখোপাধ্যায়ের গ্রামের বাড়ি বীরভূমের কীর্ণাহার যেমন আদরের ‘পল্টু’র মৃত্য‍ুতে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছে, তেমনি হাওড়ার বাঁকড়াতেও এলাকাবাসীর মন ভারাক্রান্ত। কেন-না, তাঁদের ‘মাস্টারমশাই’ চলে গেলেন! মুসলিম প্রধান এই বাঁকড়া এলাকার সঙ্গে প্রণব ম‍ুখোপাধ্যায়ের জীবনের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। 


দেশের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি ও ক্ষুরধার রাজনীতিবিদ প্রণব ম‍ুখোপাধ্যায় এখানে অবস্থিত ‘বাঁকড়া ইসলামিয়া হাইস্কুল’-এ শিক্ষকতার মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। এই তথ্যটি হয়তো অনেকেরই জানা নেই। স্বল্পভাষী ও সৌম্য চেহারার তরুণ প্রণব যখন ইসলামিয়া হাইস্কুলে যোগ দেন, তখন সাদরে তাঁকে গ্রহণ করেছিলেন ইসলামিয়া হাইস্কুলের শিক্ষক, ছাত্র ও অভিভাবকরা। তাই তাঁদের মাস্টারমশাই যখন দেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন, ভারতরত্ন পেয়েছেন, তখন বাঁকড়ার বহু মানুষ স্বভাবতই গর্ববোধ করেছেন।  


ইসলামিয়া হাইস্কুলে প্রণব ম‍ুখোপাধ্যায়ের আগমন ও শিক্ষকতার সময়ের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বাঁকড়ার ভূমিপুত্র তথা বিশিষ্ট কবি হাজী শেখ ফিরোজউদ্দিন আহমদ বলেন, একজন তরুণ আহমদ হোসেন মণ্ডল (যিনি পরে রাজ্যসভার সাংসদ হয়েছিলেন)-এর কাছে বীরভূম জেলা কংগ্রেসের সভাপতির লেখা চিঠি নিয়ে সকাল সকাল হাজির। আহমদ হোসেন মণ্ডল ইসলামিয়া হাইস্কুলের সম্পাদক ছিলেন। জানা গেল পত্রবাহকের নাম প্রণব ম‍ুখোপাধ্যায়। তাঁকে শিক্ষকতার চাকরি প্রদানের জন্য সুপারিশ করেই এই চিঠি। কোনও দেরি না করে আহমদ হোসেন সাহেব পত্রপাঠ প্রণব ম‍ুখোপাধ্যয়কে ইসলামিয়া হাইস্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসাবে কাজে যোগদানের ব্যবস্থা করেন। এই ইসলামিয়া হাইস্কুল থেকেই শুরু হয় প্রণব ম‍ুখোপাধ্যায়ের কর্মজীবন। 


তারও কিছুদিন পর প্রণবজায়া শুভ্রা ম‍ুখোপাধ্যায়কে হাওড়ারই মাকরদহ হাইস্কুলে শিক্ষিকা হিসাবে নিয়োগের বন্দোবস্ত করেন আহমদ হোসেন মণ্ডল ও হাওড়া জেলা কংগ্রেসের তৎকালীন সভাপতি বিশ্বরতন গঙ্গোপাধ্যায়। শেখ ফিরোজউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, প্রণববাবু চাকরি পাওয়ার পর হাওড়ার কদমতলায় ভাড়া থাকতেন। প্রসঙ্গত, ১৯৫৭ সাল থেকে ১৯৫৯ পর্যন্ত বাঁকড়া ইসলামিয়া হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন প্রণব ম‍ুখোপাধ্যায়।


বাঁকড়া ইসলামিয়া হাইস্কুলের প্রাক্তন মাস্টারমশাই তথা দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি স্মৃতিচারণায় হাজী শেখ ফিরোজউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রণব বাব‍ু খ‍ুব ভালো মনের মানুষ ছিলেন। ছাত্রদের পড়ানোর সময় খ‍ুব যত্ন করে বোঝাতেন, লাইব্রেরিতে বই পড়ার জন্য উৎসাহ দিতেন। তিনি নিজেও ইসলামিয়া লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে পড়তেন। স্কুল বাড়ির অভ্যন্তরে থাকা ইসলামিয়া লাইব্রেরিতে ছিল তাঁর নিত্য আনাগোনা।


উল্লেখ্য, ইসলামিয়া হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার আগেও বাঁকড়ার ওইস্থানে এক বড় লাইব্রেরি ছিল। বেদ-কুরআন-বাইবেল সহ একাধিক ধর্মগ্রন্থ ও দর্শন, রাজনীতি, সমাজবিদ্যার নানান বই রয়েছে ওই পাঠাগারে। ভূমিদাতা হাজী ইয়াকুব মোল্লার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার কিছুদিন আগে ১৯৪৭ সালে। প্রথম প্রধানশিক্ষক ছিলেন গুরুসদয় দেব। এলাকার ছেলেমেয়েরা শিক্ষিত হয়ে ইসলামি মানবতাবাদ ও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠবে এমনই স্বপ্ন দেখতেন প্রতিষ্ঠাতারা। ইসলামিয়া হাইস্কুলের দ্বার জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল প্রথম থেকেই। এই স্কুলের বহু পড়‍ুয়া কর্মজীবনে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। প্রণববাবু সবাইকে কাছে টেনে নিতেন। যাঁরা পড়াশোনায় ভালো তাঁদের অত্যন্ত স্নেহ করতেন তাঁদের প্রিয় মাস্টারমশাই।


বহু স‍ুখকর স্মৃতি থাকলেও একটি আক্ষেপও রয়েছে হাজী শেখ ফিরোজউদ্দিন আহমদের। তিনি বলেন, বাঁকড়াবাসী ও ইসলামিয়া হাইস্কুল তাঁকে বড্ড আপন করে নিয়েছিল। তিনি আমাকে বারবার বলতেন, কীর্ণাহার নিয়ে যাবো, যদিও গিয়েছিলাম। কিন্তু দ‍ুঃখ এখানেই যে, তিনি তাঁর প্রথম কর্মস্থল বাঁকড়া বা ইসলামিয়া হাইস্কুলের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। এমনকী তিনি কোথাও তাঁর বক্তৃতা, লেখা বা স্মৃতিচারণায় বাঁকড়া ইসলামিয়া হাইস্কুলের কথা উল্লেখ করেছেন বলে জানি না। এখান থেকে চলে যাওয়ার পর বিদ্যানগর কলেজে তিনি যোগ দেন। কিন্তু এরপর আর কখনও প্রণববাবু ইসলামিয়া হাইস্কুল বা বাঁকড়ায় আসেননি।


ফিরোজউদ্দিন সাহেব আরও বলেন, আমাদের মাষ্টারমশাই আজ দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। পরম শ্রদ্ধার মানুষ প্রণববাবু আমাদের কাছে ছিলেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন। ব্যস্ততার জন্য হয়ত প্রণববাবু বাঁকড়ায় আসতে পারেননি।

 

কিন্তু ফিরোজউদ্দিন সাহেবের এই কথাটি হয়তো সঠিক নয়। কারণ প্রণববাবুর ছাত্র এবং পরে বাঁকড়া ইসলামিয়া স্কুলের প্রধানশিক্ষক শেখ গোলাম রসুল (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) ‘পুবের কলম’-কে বলেন, ১৯৭২ সাল নাগাদ প্রণব ম‍ুখোপাধ্যায় একবার বাঁকড়া ইসলামিয়া হাইস্কুলে এসেছিলেন। আমরা এখাননকার প্রাক্তন ছাত্ররা তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ করেছিলাম। মাস্টারমশাই আমাকে দেখেই চিনতে পারলেন। ইসলামিয়াতে আমি তাঁর প্রিয় ছাত্র ছিলাম। আমাদের আমন্ত্রণে মাস্টারমশাই ইসলামিয়া স্কুলে এসেছিলেন। 


যাই হোক অশীতিপর ফিরোজউদ্দিন আহমদ-এর আরও বক্তব্য, আমরা চাই তাঁর ছেলেমেয়েরা বাঁকড়া ও ইসলামিয়া হাইস্কুলে একবার অবশ্যই আসুন। তাঁরা নিজেদের পিতার কর্মস্থল একবার দেখে যান। আমরা তাঁদেরকে সাদর অভ্যর্থনা জানাব।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only