রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০

'কাউ বয় টু কার্ডিয়াক সার্জেন' ডোমকলের আমানুল হক যুবসম্প্রদায়ের অনুপ্রেরণা

 


জিশান আলি মিঞা , ডোমকলঃ হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাসে লেখা রয়েছে 'কাউবয় টু কার্ডিয়াক সার্জেন'ছোটবেলার স্মৃতি কথা আজও মনে গেথে রেখেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের স্ট্যাটাসে লেখা এই  ধ্রুব সত্য কথাটিমুর্শিদাবাদের  ডোমকল থানার প্রত্যন্ত গ্রাম বাগলপাড়ার রাখাল বালক আমানুল হক বর্তমানে রাজ্যের তাবড় কার্ডিয়াক সার্জেন দের মধ্যে অন্যতম মুর্শিদাবাদের প্রত্যন্ত গ্রাম বাগলপাড়া গ্রামের প্রান্তিক চাষি পরিবারের সন্তান আমানুল হক পাচ ভাই সাত বোনের অভাবের সংসারে এগারো নম্বর সন্তান তিনিছোট বেলা কেটে বাড়ির গরু,ছাগল মাঠে চরিয়েগ্রামের অন্য বাড়ির ছেলেমেয়েদের স্কুলের পোষাক পরে বই খাতা নিয়ে স্কুল যেতে   দেখে আমানুল হকের বাবা আতর আলি মা খাইরুন্নিসা বিবি ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর চেষ্টা করেনকিন্তু বড়ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া শেখাতে তারা ব্যর্থ হন অবশেষে আমানুল হক কিছুটা বড় হয়ে স্কুল যাওয়ার জন্য বায়না ধরেনবড়বোন মর্জিনার হাত ধরে শুরু হয় স্কুল জীবন



 

আমানুল হক জানান গ্রামের দুই মাস্টারমশাই নাজিম সেখ আইয়ুব আলির উদ্যোগে তাদের বাড়ির সামনেই বাগানে কাঠাল গাছের তলায় শুরু হয় পাঠশালাপাশের গ্রামের স্কুল ছেড়ে নতুন স্কুলে  মাটিতে চট বিছিয়ে চলে -, , শেখার পাঠগ্রাম থেকে ছেলে মেয়ে জোগাড় করে শুরু হয় এই নতুন স্কুল১৯৯০ সালে এই গাছতলার স্কুল থেকেই বাকি দশ পড়ুয়ার সাথে চতুর্থ শ্রেণী উত্তীর্ণ হয় আমানুলএরপর বাড়ি থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে কুশাবাড়িয়া হাইস্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হয় সেপাটের জঙ্গলে ঘেরা ফসলের জমির আল বেয়ে অর্ধসিক্ত অবস্থায় স্কুলে আসা যাওয়া স্কুল থেকে এসে ফের গরু ছাগল চরানোমাঠে মুনিষের (শ্রমিকেরজন্য খাবার নিয়ে যাওয়া,গরুর গাড়িতে করব গোবর সার নিয়ে গিয়ে জমিতে ছড়ানো, পাট জাক দেওয়া,পাট ছাড়ানো সব কাজের ফাকে লেখা পড়াটা চালিয়ে গিয়েছে সেবিনা টিউশনে কাজের ফাকে পড়াশোনা করে ক্লাসে প্রথম স্থান কোনোদিন লাভ করতে না পারলেও প্রথম দশের মধ্যেই সে থাকতগরু,ছাগল চরানোর ফাকেই গরুর পিঠে চড়ে বই নিয়ে পড়ার পাশাপাশি,নজরুলের 'বিদ্রোহী ', রবি ঠাকুরের ' আফ্রিকা ' মত কবিতা মুখস্থ করে স্কুলের  প্রতিযোগিতায় সবাইকে সে তাক লাগিয়ে দিতোভলিবল খেলাতেও সকলের প্রশংসা অর্জন করত সেএভাবে গবাদিপশু চরিয়ে, মাঠে চাষের কাজ করে কুপির আলোয় পড়াশোনা চালিয়ে ১৯৯৬ সালে ৭৩ শতাংশ নম্বর পেয়ে মাধ্যমিক পাশ করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয় আমানুল

 


এরপর বাড়ি থেকে কুড়ি কিলোমিটার দূরে ডোমকল ভবতরন হাইস্কুলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমানের পরামর্শে বিজ্ঞান নিয়ে ভর্তি হওয়াস্থানীয় একটি সস্তার মেসে থেকে পড়াশোনা করে ৬০ শতাংশ নম্বর পেয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাশউচ্চমাধ্যমিকের পর রুটিরুজিরা টানে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয় সেঅবশেষে তার এক মাসির ছেলের পরামর্শে কলকাতার আসাবেলঘরিয়ার এক মেসে থেকে পেটের ক্ষিদে আর বড়ো হওয়ার ক্ষিদে নিয়ে শুরু হয় জীবন যুদ্ধসিটি কলেজে গনিত বিষয় নিয়ে স্নাতক স্তরে ভর্তি হলেও মেসের এক দাদাকে দেখে জয়েন্ট এন্ট্রান্সের জন্য শুরু করেন পড়াশোনা একাধিকবার ব্যর্থ হয়েও ২০০০ সালে মেডিক্যাল জয়েন্টে ৬৯  র‍্যাঙ্ক  করে ভর্তি হন নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে এনআরএস এমবিবিএস এর গন্ডি পেরিয়ে এসএসকেএম হাসপাতাল থেকে মেডিক্যাল জগতের সর্বোচ্চ ডিগ্রি হাসিল করে রাখাল বালক আমানুল এখন কার্ডিয়াক সার্জেন ২০১২ সালে গোল্ড মেডেল পেয়ে সার্জারী পাশ করেন তিনি  সেই কলেজ থেকেই২০১৫ সালে এমসিএইচ সুপার স্পেশালিষ্ট কার্ডিয়াক সার্জেন  ডিগ্রি লাভ করে বর্তমানে তিনি এখন কলকাতার বি.এম. বিড়লা হার্ট রিসার্চ সেন্টারে কর্মরত

 

তবুও এখনো তার ছেলে বেলা নিজের গ্রাম কে ভোলেননি আমানুলএকখো তার হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাসে লেখা 'কাউবয় টু কার্ডিয়াক সার্জেন 'ছুটি পেলেই তিনি ছুটে আসেন গ্রামে গ্রামের অসহায় মানুষদের বিন্যাব্যয়ে চিকিৎসা পরিষেবা দিতে নিজের বাড়িতে চালু করেছেন 'লিটিল হার্ট ' ক্লিনিক নিজের গাড়িতে ঔষধ বয়ে নিয়ে এসে গ্রামের মানুষ দের চিকিৎসা পরিষেবা দেনগ্রামের গরীব অসহায় মানুষ দের হাতে  ঔষধ তুলে দেনঘুরে বেড়ান সেই মাঠ ঘাটে খুজে ফেরে তার ফেলে আশা দিনগুলির কথাআর হবে নাই বা কেনো গরু চরানো, মাঠে কাজ করার ফাকেই তো আমানুল হক স্বপ্ন দেখেছিলেন বড় হওয়ার আর এখন তিনি বাকি দের অনুপ্রেরণা আমানুল হকের কথায়, " আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে রয়েছে এই গ্রামের আলো, বাতাস, গ্রামের মানুষের ভালোবাসা, আশির্বাদ আমি গ্রামের মানুষের কাছে চির ঋনী গ্রামের অসহায় মানুষগুলির জন্য কিছু করতে পেরে নিজেরও ভালো লাগে"              

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only