সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০

দিল্লি সহিংসতাঃ চার্জশিটে বুদ্ধিজীবীদের নাম, পুলিশ তদন্তকে কোন দিশায় নিতে চাইছে?



নয়াদিল্লি, ১৩ সেপ্টেম্বরঃ দিল্লি পুলিশ ফেব্রুয়ারিতে ঘটা দিল্লি দাঙ্গাকে সিএএ-বিরোধী প্রতিবাদীদের এক গভীর ষড়যন্ত্র বলে বারবার দাবি করছে। আর এই দাবিকে মান্যতা দিতে তারা সিপিআইএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ জয়তী ঘোষ, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বুদ্ধিজীবী অপূর্বানন্দ, নেতা যোগেন্দ্র যাদব ও তথ্যচিত্র নির্মাতা রাহুল রায়ের মতো স্বনামধন্য ব্যক্তিদের এই মামলায় টেনে আনছে। তাদেরকে ওই গভীর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে খাড়া করার চেষ্টা করা হচ্ছে। দিল্লি পুলিশের অতিরিক্ত চার্জশিটে তাদের নাম এসেছে। তিন ছাত্রের ভূমিকা প্রসঙ্গে উঠে এসেছে তাদের নাম। এর মধ্যে রয়েছেন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের দেবাঙ্গনা কলিতা ও নাতাশা নারওয়াল জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার গুলফেশা ফাতিমা। জাফরাবাদে সংঘটিত হিংসায় তাদের নাম জড়িত বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। মেএর শেষ সপ্তাহে কলিতা ও নারওয়ালকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জুলাইয়ের শেষের দিকে আটক করা হয় ফাতিমাকে। এই তিনজনই এখন ইউএপিএ আইনে বিচারাধীন। দিল্লি পুলিশ তাদের চার্জশিটে জানাচ্ছে যে কালিতা ও নারওয়াল অধ্যাপক ঘোষ অপূর্বানন্দ এবং রায়ের নাম নিয়েছে তাদের হলফনামায়। তারাই নাকি সিএএবিরোধী প্রতিবাদে হিংসার শরণ নিতে বলেছিল। তাদের যে বয়ান তাতে তারা জানাচ্ছে জাফরগঞ্জে প্রতিবাদ সভা ও চাকা জ্যাম হয়েছিল ওই তিনজনের নির্দেশ অনুসারে। তবে ওই বিবৃতি ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে কালিতা ও নারওয়াল লিখেছেন আই রিফিউজ টু সাইন। অর্থাৎ তারা বিবৃতিতে স্বাক্ষর করতে চাননি। বাধ্য করা হয়েছে। কিন্তু দিল্লি পুলিশ অমিত শাহের কাছে পেশকৃত এই চার্জশিটে অভিযোগে নিয়ে এসেছে যে তারাই তাদেরকে ইন্ধন জুগিয়েছে। ইন্ধনদাতা হিসেবে নাম এসেছে ছাত্রনেতা ওমর খালিদেরও। 


পুলিশের দাবি,জয়তী ঘোষ,অপুর্বানন্দ ও রায় পপুলার ফ্রন্ট অফ ইন্ডিয়া সঙ্গেও জড়িত। জড়িত জামিয়া কোঅর্ডিনেশন কমিটির সঙ্গেও। তারাই পিঞ্জিরা তোড় সংগঠনের এই মেম্বারদের সহিংসতায় উস্কানি দেয়। পুলিশ ফাতিমার বিবৃতিকে এক্ষেত্রে হাতিয়ার করেছে। সেখানে অভিযোগ সীতারাম ইয়েচুরি, ভীম আর্মি প্রধান চন্দ্রশেখর,স্বরাজ অভিযানের নেতা যোগেন্দ্র যাদব,মাহমুদ,ওমর খালিদ,প্রাক্তন বিধায়ক মাতিন আহমেদ,আনাস,বিধায়ক আমানাতুল্লাহ খান ষড়যন্ত্রকারীদের হিংসায় সহযোগিতা করেছেন। জানুয়ারির ১৫ তারিখ থেকে শুরু করে তার পরবর্তী সিএএবিরোধী প্রতিবাদগুলি পিঞ্জিরা তোড় নেতা ফাতিমা আয়োজন করেছেন। তিনি নাকি ভারত সরকারের ভাবমূর্তি কলুষিত করার জন্য এইসব প্রতিবাদ সভার আয়োজন করতে বলেছিলেন। পুলিশের দাবি তারা সবাই উচ্চশিক্ষিত। শিক্ষাগত যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে তারা সাধারণ মুসলিমদেরকে বিভ্রান্ত করেছে এবং মুসলমানদের জানিয়েছে যে এনআরসি মুসলিম বিরোধী। অন্যদিকে আইনজীবীরা জানাচ্ছেন কালিতা ও নারওয়ালের যে বিবৃতি তা হুবহু একই রকমের এমনকি মুদ্রণপ্রমাদ ও ব্যাকরণগত বিভ্রান্তিও একই। এ থেকে প্রমাণ হয় যে এটি পুলিশি তৈরি করেছে।

পুলিশ দিনরাত এদের অ্যান্টিন্যাশনাল এলিমেন্টস দাঙ্গাকারী ইত্যাদি নামে অভিহিত করেছে। মুসলিমবিরোধী দাঙ্গায় তদন্ত শুরু হবার পর থেকে একে শান্তিপূর্ণ সিএএ বিরোধী সমাবেশের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। বিভিন্ন পুলিশ স্টেশনে ৭৫১টির কাছাকাছি এফআইআর নথিভুক্ত করা হয়েছে।  প্রথমে পুলিশ দাঙ্গার অভিযোগ নিয়ে তদন্ত শুরু করেছিল। কিন্তু ক্রমশ এটা পড়ুয়াদের  নিশানা বানিয়েছে। সমাজকর্মী এবং অ্যাক্যাডেমিশিয়ান যারা নরেন্দ্র মোদি সরকারের নীতির সমালোচনা করে থাকেন তাদেরকেও নিশানা বানিয়েছে।  এবং যারা এনআরসি বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত তাদেরকেও দিল্লি দাঙ্গার সঙ্গে যুক্ত করে একটা অন্যরকম ফায়দা তোলার চেষ্টা করছে অমিত শাহের পুলিশ। এসব নেতাদের এবং বুদ্ধিজীবীদের যখন হেনস্থা করা হচ্ছে তখন বিজেপির কপিল মিশ্র, অনুরাগ ঠাকুর প্রবেশ বর্মাদের উপর কোনও নজরই দিচ্ছে না দিল্লি পুলিশ। অথচ তারা খোলাখুলিভাবে হিংসার হুমকি দিয়েছিলেন সিএএ বিরোধী প্রতিবাদীদের। তারা উস্কানি দিয়েছেন সেটি ভিডিওতে ধরা রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার হয়েছে। অথচ পুলিশ তাদেরকে দেখতে পাচ্ছে না। ঘুরেফিরে যাচ্ছে সেই মোদি সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধেই। বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র পুলিশ আধিকারিকের সামনেই বলেছিলেন যে পুলিশ যদি জাফরাবাদের প্রতিবাদে স্থল থেকে প্রতিবাদীদের সরাতে না পারে তাহলে সে এবং তার সমর্থকরা আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন এবং তাদেরকে সরিয়ে দেবেন। এরপরও তার বিরুদ্ধে কোনও এফআইআর করেনি দিল্লি পুলিশ। কিভাবে অনুরাগ ঠাকুর প্রবেশ বর্মারা ঘুরে বেড়াচ্ছেন বহাল তবিয়তে? আসলে তারা এই আন্দোলনকে শেষ করে দেওয়ার জন্য অর্থনীতিবিদ ঘোষ সীতারাম ইয়েচুরিদের মতো নেতাদের এ ষড়যন্ত্রের মামলায় ফাঁসাচ্ছে। প্রাথমিক নিশানা পরুয়ারা হলেও স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবীদের দিকে তারা এবার হাত বাড়িয়েছে যারা মোদি সরকারের সমালোচনা করে থাকেন।  জয়তী ঘোষকেও এখন টেনে আনা হয়েছে এ দাঙ্গা ষড়যন্ত্র মামলায়। ঘোষ আর কিছুদিনের মধ্যেই জেএনইউ থেকে একজন সিনিয়র প্রফেসর হিসেবে অবসর নেবেন। তিনি বেশ কিছু বই লিখেছেন। রাষ্ট্রসংঘের তিনি একজন পরামর্শদাতা। বেশকিছু আন্তর্জাতিক কমিশনের সদস্য। তার একটি আন্তর্জাতিক খ্যাতি রয়েছে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। অপূর্বানন্দ জানাচ্ছেন দিল্লি দাঙ্গা ষড়যন্ত্র মামলার সঙ্গে ভীমা কোরেগাঁও মামলার একটি সাদৃশ্য রয়েছে। দুটি ক্ষেত্রেই হিংসার ঘটনাগুলিকে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হচ্ছে না। উভয় ক্ষেত্রেই পুলিশ সত্য খুঁজে পেতে আগ্রহী নয়। তারা সিএএবিরোধী প্রতিবাদীদেরকেই অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করতে উঠে পড়ে লেগেছে। এর মধ্যে রাজনীতির স্পষ্ট ছায়া দেখতে পাচ্ছেন তিনি।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only