সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০

যে ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ সমগ্র ভারত শাসন করত, তার মালিকানা এখন এক ভারতীয়ের হাতে



পুবের কলমের বিশেষ প্রতিবেদনঃ­ ষোড়শ শতাধী থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ সহ দক্ষিণ এশিয়ায় ঔপনিবেশিক আধিপত্য ও শোষণের ক্ষেত্রে যে নামটি প্রথমেই মনে আসবে তা হল ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’। কিন্তু ইতিহাসের বিড়াম্বনায় আজ এই কোম্পানিটির মালিকানা এসেছে এক ভারতীয়র হাতে। কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর। উদ্দেশ্য ছিল মশলার ব্যবসা। ব্রিটিশ সরকার এই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে যুদ্ধ করার অনুমতিও দিয়েছিল। এরপর ২৫০ বছর ধরে এই কোম্পানি ভারতীয় উপমহাদেশে ধীরে ধীরে আধিপত্য বিস্তার করে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল ভারত,বর্তমান পাকিস্থান,বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তানের অর্ধাংশ।   
কিন্তু এই কোম্পানিটিকে ১৮৭৪ সালের ১ জুন বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়। কারণ ছিল ১৮৫৭ সালে কোম্পানিটির ভারতীয়  সিপাহিরা  বিদ্রোহ করে বসেছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষুদ্র একটি ছায়া  কিন্তু রয়ে গিয়েছিল। আর তা ছিল এর ব্যবসায়িক নাম এবং ছোট একটি চা ও কফি বিক্রয়ের প্রতিষ্ঠান। 
২০০৫ সালে ভারতীয় ব্যবসায়ী সঞ্জীব মেহতা এই কোম্পানির নামটি খরিদ করে নেন। সঞ্জীব মেহতা নামটিকে একটি ‘কনজিউমার ব্র্যান্ডে’ পরিণত করেছেন। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে  দামি চা কফি ও খাবারের ব্যবসাতে মনোনিবেশ করেছেন। 
‘এক সময়  যে কোম্পানিটির মালিকানায় ছিল সমগ্র ভারত এখন ওই কোম্পানির মালিকানা হস্তগত করেছে এক ভারতীয়’। এই মন্তব্য করেন সঞ্জীব মেহতা। তিনি আরও বলেন আমার মন-মস্তিষ্কে এক অনুভূতি জাগে যেন সাম্রাজ্য পাল্টা অধিগ্রহণ করছে ।  সঞ্জীব মেহতা ২০১০ সালে লন্ডনের অভিজাত মে ফেয়ার এলাকায় নিজের তৈরি প্রথম স্টলটি উদ্বোধন করেন। 
কী করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তিনি অধিগ্রহণ করলেন সেই ইতিহাস সম্পর্কে সঞ্জীব বলেন ‘আমি হঠাৎই জানতে পারলাম কোম্পানির শেয়ারগুলি বিক্রয়ের জন্য ছাড়া হয়েছে। আমার মনে হল আমাকে এই কোম্পানিটি অধিগ্রহণ করতে ই হবে তা সে যে মূল্যেই হোক না কেন।’
এখন সঞ্জীব মেহতার এই কোম্পানির মাধ্যমে ব্যবসা করার লাইসেন্স রয়েছে। তিনি এই ঐতিহাসিক কোম্পানির পরিচয়সূচক চিহ্ন (লোগো) এবং সিল ব্যবসার জন্য ব্যবহার করার অধিকারী। 
ব্রিটিশ সরকার এই কোম্পানিটিকে অধিকার দিয়েছিল যে তারা মুদ্রা তৈরি করতে পারবে। বর্তমানে সে অধিকার বর্তেছে কোম্পানির নয়া মালিক সঞ্জীব মেহতার ওপর। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৯১৮ সালে ব্রিটিশ ভারতে শেষবারের মতো স্বর্ণ মোহর মুদ্রা তৈরি করেছিল। 
একজন ভারতীয় যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগ্রাসী বাণিজ্য নীতি এবং ভারতীয় উপমহাদেশে শোষণ চালানোর ইতিহাস ভালো ভাবে জানেন তার পক্ষে কোম্পানির শেয়ারগুলো খরিদ করতে পারা এক আবেগঘন অভিজ্ঞতা। এই মন্তব্য করেন কোম্পানির নয়া মালিক।  তাঁর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শেলফে এখন ভারত-চিন ও আফ্রিকা থেকে আমদানিকৃত চা-কফি থরে থরে সাজানো রয়েছে। 
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নয়া অবতার এই ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত যে ‘বৈচিত্র্যের মধ্যেই রয়েছে ঐক্য’। মেহতা বলেন– আমরা কিন্তু কোম্পানির ভালো টা গ্রহণ করেছি এবং খারাপটি পরিত্যাগ করেছি। আগে এই কোম্পানির ভিত্তি ছিল আগ্রাসনের ওপর। কিন্তু নতুন কোম্পানির ভিত্তি হচ্ছে দরদ ও পারস্পরিক সমবেদনা। 
সেই ১৬০০ সালের শেষ দিকে রানি এলিজাবেথ (প্রথম) ২০০-রও বেশি ইংরেজ ব্যবসায়ীকে ইস্ট ইনডিজে এই কোম্পানির মাধ্যমে কাজ করার অনুমতি দিয়েছিলেন। লক্ষ্য ছিল ডাচ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা। পরে তাদের কোম্পানিটি ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। আর আঠারো শতাধীর মধ্যে এই কোম্পানিটি সারা বিশ্বের টেক্সটাইল ব্যবসার ওপর আধিপত্য বিস্তার করে। তাদের স্বার্থ দেখার জন্য তারা একটা বড় ও শক্তিশালী সেনা বাহিনী গড়ে তোলে। প্রাথমিক পর্যায়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মূল অবস্থান ছিল মাদ্রাজ,কলকাতা ও মুম্বই। সিপাহী বিদ্রোহের পর কোম্পানির আঞ্চলিক ও অর্থনীতির ওপর কব্জা নিয়ন্ত্রণভার ব্রিটিশ সরকার গ্রহণ করে এবং ১৮৭৪ সালে নাম ব্যতীত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিটি বিলুপ্ত করে দেয়। 
কিন্ত ঔপনিবেশিক শোষণের কালো ইতিহাস ও উত্তরাধিকার বহনকারী এই কোম্পানিটি কি পুনরুজ্জীবিত হতে পারবে? 
মেহতা বলেন হ্যাঁ নিশ্চয়। আমাদেরও এই নিয়ে প্রথমে একটু সংশয় ছিল। কিন্তু এই কোম্পানিটি খরিদ করেছে একজন ভারতীয় তিনি সেই ভারতেরই একজন যাদের ওপর ঔপনিবেশিক শাসন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আর এই তথ্যটি আমাদের পুনরায় সাফল্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only