রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

কলকাতার পার্ক স্ট্রিটে হাজার স্মৃতি আঁকড়ে আজও দাঁড়িয়ে জরাজীর্ণ ‘মুর্শিদাবাদ হাউস’

 




মুর্শিদাবাদের নবাবদের জৌলুস এসে পৌঁছেছিল কলকাতাতেও। ৮৫ নম্বর পার্ক স্ট্রিটের ‘মুর্শিদাবাদ হাউস’ সেই ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কথাই বলে। আজও জরাজীর্ণ এবং অবহেলায় পড়ে রয়েছে এই ঐতিহাসিক ইমারতটি। লিখছেন ইতিহাসের অধ্যাপক ফারুক আবদুল্লাহ।    


           

বিশেষ প্রতিবেদনঃ কলকাতার ৮৫ পার্ক স্ট্রিটে থানার পাশে ওই রাস্তা দিয়ে আসা যাওয়ার সময় ওই বিশাল বাড়ি অনেকেই দেখেছেন। এই বাড়ি বা নবাব হাউস হল সিরাজ-উদ-দৌলাহ পরবর্তী মুর্শিদাবাদের নবাবদের বংশধরেদের বাড়ি।  বর্তমানে তা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের  জুডিশিয়াল ডিপার্টমেন্টের অধীনে রয়েছে। এর ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে রয়েছে সরকার স্বীকৃত ‘মুর্শিদাবাদ এস্টেট’। 

  

কলকাতার ৮৫, পার্ক স্ট্রিটে অবস্থিত মুর্শিদাবাদের নবাবদের স্মৃতিবিজড়িত মুর্শিদাবাদ হাউস এক সময় ছিল কলকাতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এই বাড়িতেই একসময় থাকতেন মুর্শিদাবাদের নবাব বাহাদুর ওয়াসিফ আলি মির্জা এবং তার পুত্র নবাব ওয়ারিশ আলি মির্জা। এখন কালের করালগ্রাসে মুর্শিদাবাদ হাউস জরাজীর্ণ হয়ে ধ্বংসের মুখে পড়েছে ঠিকই কিন্তু তবুও বাড়িটির দিকে এক ঝলক তাকালেই অনুমান করা যায় বাড়িটির পুরনো আমলের জৌলুসের কথা। বর্তমানে মুর্শিদাবাদের নবাবদের কয়েকজন বংশধর এই জরাজীর্ণ বাড়িতেই বহু পুরনো স্মৃতি বুকে আঁকড়ে বসবাস করছেন। সেই সব স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে আজও তাঁদের চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তাঁরা যেন এক ঝটকায় অতীতে ফিরে যান। বলতে শুরু করেন এই বাড়ির গৌরবময় অধ্যায়ের গল্প। যা শোনাতে গিয়ে তাদের চোখ ছলছল করে ওঠে আবেগাশ্রুতে। 



উনিশ শতকের প্রায় ছয়ের দশকের কথা। প্রশাসনিক কাজ সহ আরও নানান প্রয়োজনে মুর্শিদাবাদ নিজামত পরিবারের বহু সদস্যকেই প্রায়ই কলকাতায় ছুটতে হত। নিজামত পরিবারের সদস্যরা কলকাতায় গেলে  তাঁদের থাকার তেমন অসুবিধে হত না কোনও দিনই। কিন্তু তবুও অভিভাবিকা হিসেবে নবাব হুমায়ুন জা-এর বিধবা পত্নী রাইসউননিসা বেগম উপলব্ধি করেছিলেন যে নিজামত পরিবারের সদস্যদের কলকাতার বুকে একটি নিজস্ব আশ্রয়স্থল প্রয়োজন। কারণ কলকাতায় মীরজাফরের আমলের যে বাড়ি নিজামত পরিবার উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল সেগুলি বসবাসের তেমন উপযোগী ছিল না। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় একটি নতুন বাড়ি নির্মাণের। কিন্তু এর মধ্যেই খবর পাওয়া যায় যে কলকাতায় কোনও এক ইংরেজ আধিকারিকের বেশ বড় একটি বাড়ি বিক্রি আছে। ফলে সেই বাড়ির খোঁজ শুরু হয় এবং বাড়িটি বেগমের মনে ধরলে তিনি বাড়িটি নির্দ্বিধায় কিনে নিয়ে নিজের মতো করে সাজিয়ে-গুছিয়ে নেন।


সব কিছু বেশ ভালোই চলছিল। এর মধ্যেই বেশ কয়েকটি যুগ পেরিয়ে গিয়েছে। বাংলা,বিহার,ওড়িশার নবাব নাজিমরা ভাগ্যচক্রে পরিণত হয়েছেন শুধুমাত্র মুর্শিদাবাদের নবাব বাহাদুরে।

বিংশ শতকের প্রথম দিকের কথা। নবাব ওয়াসিফ আলি মির্জা তখন মুর্শিদাবাদের মসনদে। নবাবের ছিল বড় খরচের হাত। ফলে মুর্শিদাবাদে থাকাকালীনই তিনি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং নানান আর্থিক বিড়ম্বনায় জড়িয়ে অপমানিত নবাব মুর্শিদাবাদ ত্যাগ করে বসবাসের জন্য গিয়ে ওঠেন ৮৫,পার্ক স্ট্রিটের সেই মুর্শিদাবাদ হাউসে। যদিও এই বাড়িতে শুধুমাত্র নবাবের একার অধিকার ছিল না। ছিল সমগ্র নিজামত পরিবারের সদস্যদেরই। কিন্তু ওয়াসিফ আলি মির্জা যেহেতু নবাব ছিলেন তাই তার ক্ষমতাবলে খুব সহজেই এই বাড়ির উপর নিজ অধিকার কায়েম করেছিলেন।

কলকাতায় এসে ওয়াসিফ আলি মির্জা মুর্শিদাবাদ হাউসকে নতুনভাবে সাজিয়েছিলেন। ফলে সাধারণ বাড়ি হয়ে উঠেছিল রাজকীয়। সমগ্র বাড়িটি ঘেরা ছিল উঁচু প্রাচীর দিয়ে। সেখানে ছিল প্রবেশের এবং প্রস্থানের জন্য পৃথক দু’টি বড় দরজা ছিল। সেই দরজায় পাহারায় থাকতেন স্থানীয় থানার সেপাইরা। মূল প্রবেশদ্বার দিয়ে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ত ‘মুর্শিদাবাদ হাউস’। যার সামনের দিকটায় ছিল সবুজ ঘাসে মোড়া একটি খোলা লন। যা ছিল নবাব ও তাঁর পরিবার-পরিজনদের অবসর কাটানোর স্থান।

মার্বেল বসানো দৃষ্টিনন্দন দোতলা মুর্শিদাবাদ হাউসের নিচের তলায় ছিল ডাইনিং-রুম এবং নবাবের দফতর। দোতলায় ওঠার জন্য ছিল লোহার কারুকার্য খচিত রেলিং সহ কাঠের সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি সোজা গিয়ে উঠেছে ড্রয়িংরুমে। ড্রয়িংরুমের পাশেই ছিল নবাবের শয়নকক্ষ। এ ছাড়াও মূল বাড়ি সংলগ্ন আরও বেশ কয়েকটি ঘর ছিল। সেগুলির কোনওটি ছিল নবাবের রসুইখানা কোনওটি গাড়ি রাখার গ্যারাজ কোনওটি আবার বাড়ির কর্মচারীদের শয়নকক্ষ। বাড়ির ছাদে লাগানো থাকত মুর্শিদাবাদের নবাবী পতাকা। সেই পতাকা হাওয়ায় উড়তে-উড়তে জানান দিত নবাবদের গৌরবগাথা। নবাব মুর্শিদাবাদ থেকে চলে আসতে বাধ্য হলেও নবাবের স্মৃতিজুড়ে থাকত মুর্শিদাবাদ। তিনি কলকাতায় থাকলেও তাঁর প্রতিদিনের খাওয়ার পানি আসত সেই মুর্শিদাবাদ থেকেই।


নবাবের যাতায়াতের জন্য ছিল সেই সময়ের সর্বাধুনিক মোটর গাড়ি। গাড়িতে লাগানো থাকত মুর্শিদাবাদের নবাবী পতাকা। সেই গাড়ি নিয়ে নবাব বের হলে রাস্তায় যতই যানজট থাকুক না কেন নবাবকে সম্মান জানিয়ে তাঁর গাড়ি আগে ছেড়ে দেওয়ার নিয়ম ছিল।     

নবাব ওয়াসিফ আলি মির্জার মৃত্যু হয় ১৯৫৯ সালে। তারপর নবাব হন তাঁর প্রথম পুত্র ওয়ারিস আলি মির্জা। পিতা-পুত্র দীর্ঘদিন ধরে মুর্শিদাবাদ হাউসে বসবাস করলেও ১৯৬৩ সালে নবাব ওয়ারিস আলি মির্জার আমলে পাস হওয়া এক আইনে সর্বপ্রথম মুর্শিদাবাদ হাউসের উপর নবাব বাহাদুরের অধিকার স্বীকৃত হয়। তাঁর মৃত্যুর পর যোগ্য উত্তরাধিকারীর অভাবে দীর্ঘ দিন মুর্শিদাবাদের নবাব পদ শূন্য হয়ে পড়ে। তখন থেকে নবাবের আত্মীয়-স্বজনরা এই বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। বর্তমানে নবাব ওয়াসিফ আলি মির্জার মোতাহ বেগম (চুক্তিভিত্তিক) সুগরা খানমের পুত্র সাজিদ আলি মির্জার বিধবা পত্নী আফসান মির্জা তাঁর কিছু আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে বসবাস করেন মুর্শিদাবাদ হাউসে।

বর্তমানে মুর্শিদাবাদ হাউসের দৈন্যদশায় নবাবদের মুর্শিদাবাদ হাউসকে আর চেনা যাবে না। বাড়িটি হয়তো যেকোনও দিন ধ্বসে পড়বে। অথচ কলকাতার একটি ঐতিহাসিক ও হেরিটেজ ঘোষিত প্রাসাদ ছিল এই মুর্শিদাবাদ হাউস। পূর্বের সেই ফুলের বাগান এখন পরিণত হয়েছে গাড়ি পার্কিংয়ের মাঠে। বাড়ির সামনের দিকের দোতলার একটি অংশ দীর্ঘদিনের অবহেলায় ভেঙে পড়েছে। নবাবের ডাইনিংরুম নবাবের দফতর আজ পরিণত হয়েছে স্টোররুমে। নিচতলা থেকে যে রাজকীয় কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে যেত সেই সিঁড়ি আজ অন্ধকারে নিমজ্জিত। লোহার কারুকার্য খচিত সেই রেলিংয়ে মরচে পড়েছে। দোতলার যেখানে নবাবের ড্রয়িংরুম ছিল  সেখানে আজ প্লাইউড দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট ঘর। নবাবের শয়নকক্ষ আজ বেদখল। সেই কক্ষটিও ভাগ হয়ে গিয়েছে দু’টি ঘরে।

মুর্শিদাবাদ হাউস থেকে আজ শুধুই হাহাকার ভেসে আসে। এই অবহেলিত জরাজীর্ণ বাড়িটি যেন আর্তনাদ করে বলতে চায় তার গোপন কষ্টের কথা তার গৌরবমাখা স্মৃতির কথা। কিন্তু তার কথা শোনার মতো কেউই নেই। 

ইতিহাসের স্মৃতি বহনকারী পার্ক স্ট্রিটের এই মুর্শিদাবাদ হাউস পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জুডিশিয়াল বিভাগের হাতে থাকলেও তাঁরা এর রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা মেরামতের জন্য বিগত দু-তিন দশকের মধ্যে কোনও উদ্যোগ নিয়েছেন বলে কারও জানা নেই। মুর্শিদাবাদ হাউসের বিশাল এলাকার মধ্যে  হিন্দিভাষী বহু মানুষ ঢুকে পড়েছেন। পুরো মুর্শিদাবাদ হাউস এখন এদের অবৈধ কবজায়। কে বা কারা এ বাড়ির সামনের সেই বিখ্যাত লনটিকে এখন দুই-তিনশো গাড়ি রাখার গ্যারেজে পরিণত করেছে। কলকাতার এই হেরিটেজ বাড়িটি এখন পুরোপুরি বিনাশের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। মুসলিম সমাজের বিদ্বজ্জনরা বলছেন মুর্শিদাবাদ হাউসের নানা জট কাটিয়ে কিংবা অধিগ্রহণ করে এই নবাব বাড়িতে মুসলিম মেয়েদের কলেজ স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম শহিদ সিরাজ-উদ-উল্লাহর স্মৃতিতে কোনও কিছু করলে তা একদিকে যেমন হেরিটেজকে রক্ষা করত সেইসঙ্গে দেশ-বিদেশের পর্যটকরাও এখানে আসতেন। কিন্তু প্রায় বেওয়ারিশ হয়ে মুর্শিদাবাদ হাউস এখন পড়ে রয়েছে। 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only