বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

চাষির মেয়ে সাহিনা আজ ভূমি-রাজস্ব আধিকারিক



মির্জা মোসারাফ হোসেন, বীরভূমঃ কথায় বলে যদি ইচ্ছাশক্তি প্রবল থাকে  তাহলে অসাধ্য সাধনও করা যায়। যতই জটিলতা আসুক না কেন সেই জটিলতার জাল ছিঁড়ে লড়াকুরা  ঠিকই সাফল্যের ছটায় নিজেদের জীবনকে আলোকিত করে নিতে পারে। গৌরবান্বিত করে তার পরিবারকে আশেপাশের মানুষকে তার সমাজকে। আর সেই লড়াকু যদি কোনও মেয়ে হয় তার সমাজ যদি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অন্যতম হয় তাহলে তার সাফল্য তার সমাজের মানুষের কাছে অনুপ্রেরণা ও উৎসাহের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠে। 
এরকমই এক উজ্জ্বল লড়াকুর নাম সাহিনা খাতুন। বীরভূমের লাভপুর ব্লকের লাঘোষা নামে এক প্রত্যন্ত গ্রামে তাঁর বাড়ি। বর্তমানে সাহিনা পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত দপ্তরের অধীনে ভাবী ভূমি-রাজস্ব আধিকারিক। 
গত ৪ই সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালের রাজ্যের সিভিল সার্ভিসেস পরীক্ষার গ্র&প ‘সি’ বিভাগের ৯৪ জনের যে চূড়ান্ত ফলাফলের তালিকা প্রকাশিত হয় তাতে ১৯ জন মুসলিম প্রার্থী চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছে। সাহিনা সেই ১৯ জনের মধ্যে একজন ‘ওবিসি (এ) - পিএইচএলভি’ সংরক্ষিত ক্যাটেগরিতে তার নাম চূড়ান্ত হয়েছে। তার এই সাফল্য তার পরিবারের কাছে সংখ্যালঘু সমাজের কাছে অনুপ্রেরণা বয়ে এনেছে। কারণ সাফল্যের এই পথ সাহিনার কাছে কখনই সহজ ছিলোনা। কখনও সুযোগসুবিধার অপ্রতুলতা কখনও  দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ সাফল্যর চাবিকাঠি কি হাতে আসবে? এসব পাহাড়সম প্রতিকূলতা ডিঙিয়েই গ্রামের মেয়ে সাহিনা সাফল্যের মুখ দেখেছে। 
সাহিনার পিতা মুহাম্মদ মোরতুজা গ্রামে নিজের স্বল্প জমিতে চাষবাস করেন। চার ছেলেমেয়ে ও তারা স্বামী-স্ত্রী মিলে মোট ছয় জনের সংসার চালান মুহাম্মদ মোরতুজা । নিজে ছিলেন কমার্সে স্নাতক। তাই হয়তো ওই সামান্য উপার্জনের উপর ভিত্তি করেই তিনি ছেলেকে বি-টেক পড়িয়েছেন। সাহিনার দিদির বিয়ে দিয়েছেন সাহিনাকে কলকাতা পাঠিয়েছেন সিভিল সার্ভিসেস পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য। আর তিনি ছোট মেয়েকে কলেজে পড়াচ্ছেন তৃতীয় বর্ষে।  মুহাম্মদ মোরতুজা সাহেব অনেক সমস্যার অনেক জটিলতার সম্মুখীন হয়েছেন এসবের ব্যবস্থা করতে। কিন্তু মেয়েকে হাল ছাড়তে দেননি। হয়তো পিতার গভীর জেদ মেয়েকে প্রেরণা জুগিয়েছে। মেয়ের এই সাফল্যে পিতা আজ খুবি খুশি। 
৫৫ বছরের মোহাম্মাদ মরতুজা বলেন যে  ‘মেয়ের সাফল্য আজ পরিবারে খুশির জোয়ার এনে দিয়েছে। সেই ছোটোবেলা থেকে সাহিনাকে যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলাম আজ তা সাকার করেছে সাহিনা। আমার মেয়ে আমার স্বপ্নকে পূরণ করেছে। তার এই সাফল্যে আমি গর্বিত,আমার পরিবার গর্বিত’। 
পিতার স্বপ্নকে বাস্তব রুপ দিতে পেরে সাহিনা নিজেও খুবই খুশি। তাঁর কথায় আব্বা আমার অল্প বয়স থেকেই সিভিল সারভেন্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখান।  আমিও আব্বার স্বপ্নকে আমার নিজের জীবনের লক্ষ্য করে ফেলি। আর তাই অনার্সসহ স্নাতক ডিগ্রি পাওয়ার পর কলকাতা চলে যাই প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য। আজকের এই সাফল্য সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র আব্বার জন্য। আব্বার উৎসাহ অনুপ্রেরনা আমাকে সবসময় ভরসা জুগিয়েছে। আব্বার স্বপ্নকে পূরণ করতে পেরে আজ আমি খুবই খুশি। সাহিনা আরও বলেন তার মা,দাদা,দিদি,বোন এবং বিশেষকরে শিক্ষকরা সবসময় আমার পাশে থেকেছেন আমাকে আশ্বাস জুগিয়েছেন। 
সাহিনার যে এলাকায় বাড়ি সেই লাভপুর রাজ্যবাসীর কাছে ‘রাজনৈতিক হটস্পট’ হিসেবেই খ্যাত। মারামারি খুনোখুনি লাভপুরে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কিন্তু সে সবকে উপেক্ষা করেই সাহিনা আজ এলাকার নক্ষত্র। 
প্রাথমিক মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রামের লাঘোষা হাইস্কুলেই সম্পন্ন করে মাধ্যমিকে স্টার মার্কস নিয়ে সাহিনা লাভপুর যাদবলাল হাইস্কুলে এইচ এস-এ আর্টস নিয়ে ভর্তি হয়। উচ্চমাধ্যমিকে স্টার মার্কস সহ পাশ করে লাভপুরের শম্ভুনাথ কলেজে ইংরেজি অনার্সে ভর্তি হয়। এরপর ২০১৪ সালে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন হলে সিভিল সার্ভিসেস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে কলকাতার ‘রাইস’ নামক শিক্ষাপ্রতিস্থানে ভর্তি হয় এবং ২০১৫ ও ২০১৬ এই দুই বছর ওখানে থাকে। পরে ২০১৭ থেকে ২০১৮ এর মাঝামাঝি আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত আবাসিক সটাডি সেন্টারে কোচিং নেয় এবং ২০১৮ এর ডব্লিউবিসিএস প্রিলিমিনারিতে উত্তীর্ণ হলে মেইন পরীক্ষার জন্য আলআমীন মিশন চালিত কোচিং সেন্টারে ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য যায়। 
ইতিমধ্যে ২০১৭ সালের পরীক্ষার গ্র&প ‘ডি’ বিভাগের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হলে তাঁর নাম চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পায়। ওই ফলাফলের দরুণ ২০২০ সালের মে মাসে বীরভূমের নানুর ব্লকে ‘ইন্সপেক্টর অফ কোঅপেরাটিভ সোসাইটিজ’ পদে যোগদান করে। তবে এখন নতুন পোস্টে যোগদানের প্রক্রিয়া প্রণালী শেষ হলেই নতুন পোস্টে সাহিনা যোগদান করবে।  
তাঁর মতো পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর মেয়েরা যারা সাফল্য পেতে নিজের স্বপ্নকে সাকার করতে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকেন তাদের জন্য সাহিনার বক্তব্য " আশাহত হলে চলবে না। ধৈর্য্য ধরে নিজেদেরকে অধ্যাবসায়ের সঙ্গে পুরোপুরি নিয়োজিত করতে হবে। ইনশাআল্লাহ সাফল্য আসবেই। 
 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only