মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

ইতিহাসের আলোকে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী

 


বিশেষ প্রতিবেদনঃ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আমাদের বাংলার মেদিনীপুরের বিখ্যাত সোহরাওয়ার্দী পরিবারের সন্তান। তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রিমিয়ার বা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। সেই সঙ্গে তিনি অখন্ড পাকিস্তানেরও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এপার বাংলায় তাঁকে ৪৬ এ কলকাতায় দাঙ্গার জন্য দায়ী করা হয়।

ভারত ও বাংলা বিভাজনের সময় দাঙ্গা রোধের জন্য প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে গান্ধিজির সঙ্গে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীও বেলেঘাটার ‘হায়দারী মনজিল’-এ অবস্থান করেন। ফলে হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে দাঙ্গা কলকাতায় ব্যাপকভাবে ছড়াতে পারেনি। স্বাধীনতার প্রায় ২ বছর পর কলকাতা থেকে চলে গিয়ে পাকিস্তানেও শহীদ সোহরাওয়ার্দী গণতন্ত্র এবং পূর্ব পাকিস্তানের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ছিলেন। বাংলাদেশে তাঁকে ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’  হিসাবে অভিহিত করা হয়। আজ তাঁর জন্মদিন। এ নিয়ে আলিমুজ্জমানের লিখিত বিশেষ প্রতিবেদন। 

১৮৯২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর কলকাতায় (মতান্তরে পারিবারিক বাড়ি মেদিনীপুরে) উপমহাদেশের বিখ্যাত রাজনৈতিক– সাংস্টৃñতিক ও মর্যাদাবান সোহরাওয়ার্দী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ-বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনসহ ভারতীয় পিছিয়ে পড়া মুসলমান জাতির প্রতিটি ন্যায্য দাবিতে প্রয়োজনীয় ভূমিকা রেখে যেসব নেতা জাতীয় জীবনে অমর হয়ে আছেন গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তাঁদের অগ্রগামীদের একজন। উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ মহাত্মা গান্ধি, মাওলানা মুহাম্মদ আলী, শওকত আলী ভ্রাতৃদ্বয়, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, এ কে ফজলুল হক, সুভাষচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র বসু প্রমুখ ছিলেন তাঁর প্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। শহীদ সোহরাওয়ার্দী রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। তিনি সংগ্রাম ও আন্দোলনের রাজনীতির পাঠ নেন আলী ভ্রাতৃদ্বয়ের কাছে, জনগণের মাঝে থেকে রাজনীতি করা শেখেন শের-ই-বাংলা একে ফজলুল হকের সঙ্গে মন্ত্রিত্বকালে। ছেচল্লিশের দাঙ্গা ও দেশভাগের সময় মানুষের রক্ত গঙ্গা অত্যন্ত কাছ থেকে দেখে মানবতার চরম লাঞ্ছনার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে শিক্ষা নিয়েছিলেন, গণতন্ত্র হচ্ছে সুস্থ সমাজ বিকাশের একমাত্র পথ। এইজন্যই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাঁর  সংগ্রাম ছিল আজীবন। 

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পিতা ছিলেন বিখ্যাত বিচারপতি স্যার জাহিদ সোহরাওয়ার্দী ও তাঁর  মা খুজিস্তা আক্তার বানুও ছিলেন অত্যন্ত বিদুষী মহিলা। ভারতীয় প্রথম মুসলমান মহিলা খুজিস্তা, যিনি সিনিয়র কেমব্রিজ পাস করেছিলেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় মহিলাদের মধ্যে প্রথম উর্দু সাহিত্যের পরীক্ষক নিযুক্ত হয়েছিলেন। মা খুজিস্তা এবং নিঃসন্তান মামা পৃথিবীখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ স্যার  আবদুল্লাহ আল মামুন আল সোহরাওয়ার্দী ভাবীকালের মহাপুরুষ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গড়ে তুলেছিলেন।             

বাড়িতে মা এবং মামার কাছে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ভর্তি হয়েছিলেন কলকাতার বিখ্যাত আলিয়া মাদ্রাসায়। এখানে তিনি ভালোভাবে শিখেছিলেন আরবি উর্দু ও ফারসি। আগেই বাড়িতে মা ও মামার কাছে রপ্ত করেছিলেন ইংরেজি, বাংলা। এখানকার শিক্ষা শেষে অনার্সসহ বিএসসি ডিগ্রী শেষ করেছিলেন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্পন্ন করেন আরবি সাহিত্যে এম.এ। 

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯১১ সালে বিলাতে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং আইনের সর্বোচ্চ ডিগ্রী বিসিএল পাস করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি ও ইংরেজি ভাষায় এম.এ ডিগ্রিও শেষ করেন ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯১৮ সালে। লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়ার সময় ১৯১৯ সালের ১২ জানুয়ারি কলকাতায় তাঁর  মায়ের মৃতু্য হয়। ১৯২০ সালে ব্যারিস্টারি পাস করে দেশে ফিরে কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন।  

এই সময় থেকে আইন ব্যবসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতি ও সমাজ সেবায় যুক্ত হন। তাঁর মামা বিখ্যাত স্যার আবদুল্লাহ আল মামুন আল সোহরাওয়ার্দীর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় শহীদ সোহরাওয়ার্দী পুরোপুরি জড়িয়ে যান রাজনীতিতে। বঙ্গীয় আইনসভার নির্বাচনে ১৯২১ সালে তিনি প্রথম সদস্য নির্বাচিত হন। এ সম্পর্কে তিনি বলেছেন– ‘১৯২০ সালে রাজনীতিতে প্রবেশ করে আমি বাংলার আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হই এবং খেলাফত সংগঠনে যোগ দেই ও কলকাতা খিলাফত কমিটির অনেক বছর সম্পাদক ছিলাম। প্রথমদিকে আমি কংগ্রেসে যোগ দেই এবং মেয়র সি.আর. দাশের সঙ্গে কলকাতার ডেপুটি মেয়র ছিলাম।’     

অক্সফোর্ডে শিক্ষাপ্রাপ্ত হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আইন পরিষদে আত্মপ্রকাশ করেন দুর্জয় সাহসী ও স্বাধীনচেতা রাজনীতিবিদ হিসেবে। ব্রিটিশ সরকার এই সময়ে আইনসভায় ভারতীয়দের দমন করার উদ্দেশ্যে বেত্রাঘাত বিল আনলে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ব্রিটিশ সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি দেন  ‘ভারতীয়রা পশু নয়। তাদের সাদা প্রভুদের ন্যায় তারাও মানুষ। ব্রিটিশদের ন্যায়  তাদের অনুভূতি আছে।পৃথিবীর অন্যান্য সভ্য জাতির নেই তাদেরও একই রকমের আত্মসম্মান আছে। ক্ষমতায় উন্মাদ হয়ে ব্রিটিশ সরকার মনোনীত সদস্যদের দ্বারা বিলটি পাস করাতে পারে কিন্তু তা হবে মনুষ্যত্বের বিরুদ্ধে।’ 

সেই সময়ে দাম্ভিক ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে এমন জোরালো বক্তব্য রাখা একমাত্র যুবক শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পক্ষেই সম্ভব ছিল। সরকার-বিরোধী আন্দোলনে জোয়ার আনার উদ্দেশ্যেই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তাঁকে  কংগ্রেস দলে টেনে আনেন। তিনি বুঝেছিলেন হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের প্রয়োজনে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে দরকার। ১৯২৩ সালে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হয়। সেই সময়ে বাংলায় ছিল মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ  মুসলমান সমাজ শিক্ষাসহ আর্থিক দিকেও হিন্দুদের থেকে অনেক পিছিয়ে ছিল। দেশবন্ধু অনুধাবন করতে পেরেছিলেন উভয় সম্প্রদায়ের সমভাবে উন্নতি করতে না পারলে মিলন হতে পারে না। হিন্দু-মুসলমানের জন্য পৃথক নির্বাচন সহ সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ মুসলমানদের নিয়োগের কথা লিপিবদ্ধ হয় বেঙ্গল প্যাক্ট চুক্তিতে। একদল কংগ্রেস নেতার প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও মাওলানা মুহাম্মদ আলী ও চিত্তরঞ্জন দাশের চেষ্টায় কংগ্রেস অনুমোদন দেয় বেঙ্গল প্যাক্টকে। এবারে উভয় সম্প্রদায়ই  শান্তিতে  বসবাস করতে শুরু করে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রতিষ্ঠার অগ্রনায়ক ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। এই  অসাম্প্রদায়িক জাতীয় নেতার ১৯২৫ সালের ১৬ জুন আকস্মিক  মৃত্যু হলে বেঙ্গল প্যাক্টের কার্যকারিতা বন্ধ হয়ে যায়।   

 হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বাংলায় মুসলমান স্বার্থরক্ষায় সদা তৎপর থাকতেন।  ১৯২৮ সালে শহীদ সোহরাওয়ার্দী নিজ উদ্যোগে কলকাতায় প্রথম আয়োজন করেন নিখিল বঙ্গ মুসলিম কনফারেন্স। মুসলমানদের স্বার্থের বিষয়ে বলিষ্ঠভাবে লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এই সম্মেলনে। এরপর ১৯২৮ সালের শেষে ও ১৯২৯ সালের প্রথমে দিল্লিতে যে সর্বদলীয় মুসলিম নেতাদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় তাতেও সোহরাওয়ার্দী মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণে ১৪ দফা দাবি পেশ করেন। এই সম্মেলনে যোগদানকারীদের মধ্যে অন্যতম মুসলিম কণ্ঠ ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। 


 শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯২৬ সালে ইন্ডিপেন্ডেন্ট মুসলিম পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী অ্যাসেম্বলি নির্বাচনের সময় ১৯২৯ সালে সোহরাওয়ার্দী  বেঙ্গল মুসলিম ইলেকশন বোর্ড নামে গড়ে তোলেন অপর একটি সংগঠন ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইন প্রবর্তন করলে  প্রদেশের দ্বৈত শাসন প্রথা বিলুপ্ত হয়। এই আইনে পৃথক নির্বাচন প্রথা কেন্দ্রে ফেডারেল সরকার এবং প্রদেশের স্বায়ত্ত শাসন প্রবর্তন হয়। অবাঙালি মুসলিম লীগ নেতারা বিশেষ করে হাসান ইস্পাহানীর নেতৃত্বে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে কলকাতা আসার আহ্বান জানালে তিনি ১৯৩৬ সালের ১৭আগস্ট কলকাতায় এসে পৌঁছান। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে সবাই পরামর্শ দেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে মুসলিম লীগের যোগদান করাতে পারলে বাংলায় লীগের  ভবিষ্যৎ উজ্জল। এবারে জিন্নাহর  পরামর্শে সে-সময়ের বাংলা লীগ নেতারা খাজা নাজিম উদ্দিন খাজা নুরুদ্দিন ও আবদুর রহমান সিদ্দিকী শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাছে যান এবং তাঁকে  রাজি করান মুসলিম লীগে যোগদানে। প্রধানত হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাংগঠনিক শক্তির সুবাদেই লীগ ১১টি প্রদেশের মধ্যে কেবল বাংলায় সাফল্য পায়। এই বিজয়ের পেছনে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অবদান অনিস্বীকার্য।

মুসলিম লীগ ও শের-ই-বাংলা একে ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি কোয়ালিশনে মন্ত্রিসভা গঠনে সমর্থ হয়। শের-ই-বাংলা একে ফজলুল হক অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। বাংলা শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার ১৭৫৭ সালে পলাশির এক প্রহসন যুদ্ধে পরাজয়ের ১৮০ বছর পর বাংলা শাসনের ভার পান একজন বাঙালি মুসলমান। এটা ছিল বাঙালির কাছে হতে গৌরব ফিরে পাওয়ার অনুপ্রেরনা, আশা, আখাঙ্খা পূরণে তিরতিরে অনুভূতি।

১৯৩৭ সালে এ কে ফজলুল হকের মন্ত্রিসভায় বাণিজ্য ও শ্রমমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের ১৯৪৩ সালে গঠিত মন্ত্রিসভায় খাদ্য ও সরবরাহ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ১৯৪৫ সালের ৩১ মার্চ নাজিমউদ্দিন মন্ত্রিসভার পতন ঘটে। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে বাংলা প্রদেশে মুসলিম লীগের বিজয় লাভের পর তিনি অখণ্ড বাংলার প্রধানমন্ত্রী হন। বাংলার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি ১৯৪৭ সালের ১৩ আগস্ট পর্যন্ত । 

 ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কাছ থেকে সংগ্রাম করে ভারতের স্বাধীনতা আসে। ভারতকে বিভক্ত করে পাকিস্তান নামক নতুন একটি রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয় ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসনে অখণ্ড উপমহাদেশে বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নানা স্বার্থ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্রিটিশ সরকারের কাছে সবসময় আপসহীন ও সাহসী ভূমিকা পালন করে গিয়েছেন। তাঁর ছিল অসাধারণ বাগ্মিতা সরকারি নীতির বিরুদ্ধে সোহরাওয়ার্দীর অনলবর্ষী ও ক্ষুরধার বক্তব্য সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করত অতি সহজেই। স্বাধীনতা প্রাপ্তির কিছু আগে বাংলাকে অখণ্ড রেখে তিনি চেয়েছিলেন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা প্রতিষ্ঠা। সেদিনে তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি একথা সত্য। কিন্তু ১৯৭১ সালে তাঁরই রাজনৈতিক শিষ্য শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর  স্বপ্নের বাস্তবায়ন। মুসলিম লীগের যে দ্বিজাতি তত্বের ওপর ভিত্তি করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সোহরাওয়ার্দী ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট, স্বাধীন হওয়ার পর মুহূর্তে সেই দ্বিজাতি তত্ত্বের বিলোপ সাধনের সুপারিশ করেছিলেন। তিনি জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পাকিস্তান মুসলিম লীগ সরকারের পরিবর্তে জাতীয় সরকার গঠনের জন্য জিন্নাহর নিকট প্রস্তাব করেন। সেদিন সোহরাওয়ার্দীর এ প্রস্তাবে কেউ কর্ণপাত করেননি।

দেশ বিভাগের ফলে বাংলার মুসলমানদের অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানে চলে যাননি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এইসব অসহায় নিরাপত্তাহীন মানুষদের পাশে থেকে দিনরাত্রি সাহস যুগিয়েছেন তিনি। মহাত্মা গান্ধির সঙ্গে তিনি শান্তি স্থাপনে বিভিন্ন জায়গায় ছুটে গিয়েছেন বক্তৃতা  দিয়েছেন। মহাত্মা গান্ধি ১৯৪৮ সালের ৩০ জুন আঁততায়ীর হাতে নিহত হলে স্বাভাবিকভাবেই স্থগিত হয়ে যায় মিশনের কাজ। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীই এবারে নিরাপত্তাহীন অবস্থায় পতিত হন এবং ১৯৪৯ সালের ৫ মার্চ পাকিস্তানের করাচি চলে যান। পাকিস্থানে এসে সোহরাওয়ার্দী নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন শুরু করেন। বলা যেতে পারে তাঁর সমতুল্য সংগঠক পাকিস্তানের তো বটেই উপমহাদেশে ছিল বিরল। ১৯৪৯-৬৩ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন পাকিস্তানের মুকুটহীন রাজা। তাঁর কৃতিত্ব ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ। কিন্তু গণতান্ত্রিক পদ্ধতির অভাবে অল্প সময়ের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটে। ১৯৫৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর রিপাবলিকান দলের সমর্থনে পাকিস্তানের পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। প্রধানমন্ত্রিত্বের ১৪ মাসের মাথায় প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জার সঙ্গে বিরোধের ফলে ১৯৫৭ সালের ১১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন সোহরাওয়ার্দী। ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ বলা হয় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে। একমাত্র গণতান্ত্রিক পদ্ধতিই দেশে আধুনিক চিন্তা-চেতনার বিকাশ ঘটাতে পারে বলে তাঁর বিশ্বাস ছিল। পাকিস্তানের আধুনিক চিন্তা,সভ্যতা,সংস্কৃতির অগ্রদূত তাঁর মুক্তবুদ্ধি ও মানবতাবাদের দৃষ্টিভঙ্গি মুসলমানদের কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাসের মুক্ত করে। পাকিস্থানে গণতন্ত্র উদ্ধারের জন্য তাঁর ছিল আন্দোলন। সামরিক স্বৈরাচারী শাসক আইয়ুব খান তাঁকে গ্রেফতার করেন ১৯৬২সালের ৩০ জানুয়ারি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে। ১৯৬২ সালের ১৯ আগস্ট জেল থেকে মুক্তি পান তিনি।

জেল থেকে মুক্তি লাভের পর শহীদ সোহরাওয়ার্দী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই আন্দোলন পাকিস্তানের কোণে কোণে যখন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে তখনই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিছুদিন করাচিতে চিকিৎসার পর তিনি উন্নত চিকিৎসার জন্য গমন করেন লেবাননের রাজধানী বৈরুতে। উপমহাদেশের এই মহান নেতা ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর স্বদেশ স্বজন হতে বহু বহু দূরে বৈরুতের এক হোটেলের নির্জন কক্ষে মৃতু্যবরণ করেন। তাঁর মৃতদেহ করাচি হয়ে ঢাকায় এনে ৮ ডিসেম্বর ঢাকা হাইকোর্ট প্রাঙ্গনে শের-ই-বাংলা একে ফজলুল হকের মাযারের দক্ষিণ পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। 

 সোহরাওয়ার্দীর শাসনামল কলঙ্কিত হয়েছিল ১৬ আগস্ট ১৯৪৬ কলকাতায় সংঘটিত নজিরবিহীন হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ঘৃণ্য দাঙ্গা । সেদিনে ‘দি গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ শিরোনামে এই বীভৎস দাঙ্গার খবর পরিবেশন করেছিল ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য স্টেটসম্যান’নিঃসন্দেহে মানবতা ধর্ষিত হয়েছিল ছেচল্লিশের কলকাতায় সংঘটিত এই দাঙ্গায়। এই সময়ে বাংলায় মুসলিম লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে দায়ী করেছিলেন অনেকেই। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হলেও প্রকৃত দাঙ্গার মুখগুলোকে আজও চিহ্নিত করা যায়নি বলে অনেকের ধারণা।


(লেখক  বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও গবেষক  আলিমুজ্জামান   )


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only