মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২০

তরুণ সন্তানদের লাশ নিয়ে এক কঠিন সফর

ফাইল চিত্র


মুজাফফর রানা

কাশ্মীরের যাযাবর এক পশুপালক হিসেবে মুহাম্মদ ইউসুফ সব সময় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে অভ্যস্থ।  কিন্তু বিগত শনিবার তিনি এমন এক সফরে যেতে বাধ্য হন, যা ছিল তাঁর জীবনের সবথেকে কঠিন এক যাত্রা, সবথেকে বেদনাপূর্ণ। কারণ ইউসুফের সঙ্গে ছিল তাঁর তরুণ পুত্র মৃত মুহাম্মদ আবরারের লাশ (২৫ বছর)। সেনাবহিনী কাঠ দিয়ে তৈরি এক নতুন কফিনে পচনশীল লাশটি তাঁর কাছে হস্তান্তর করে। কফিনে ছিল তাঁর পুত্রের মৃতদেহ, বুলেটের আঘাতে যার মুখায়ব ছিল বিকৃত। 


দেড় বছরের এক শিশুর পিতা আবরারের লাশ এবং তাঁর দুই তরুণ চাচাতো ভাই ইবরার ও ইমতিয়াজের দেহ কবর থেকে তুলে শনিবারের দিনই সকালেই ইউসুফের হাতে তুলে দেয় সেনাবাহিনী ও পুলিশ।  বলা হচ্ছিল, জুলাই মাসে এক এনকাউন্টারে সেনাবাহিনী ‘তিনজন অজ্ঞাত-পরিচয় সন্ত্রাসবাদী’কে নিকেশ করেছে। সেনাবাহিনী বারামুল্লা জেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম গান্টিমুল্লাতে ৩ জনকে কবরস্ত করে। ৭৩ দিন পর জনগণের চাপে তাদের লাশ তুলে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত নেয়। 


ইউসুফ এবং পারিবারের জনাকয়েক আত্মীয় জম্মুর রাজৌরি জেলার তাদের গ্রাম থেকে শুক্রবার রওয়ানা দেয় কাশ্মীরি এই তরুণদের লাশগুলি গ্রহণ করার উদ্দেশে। আর শনিবার ভোরে তারা লাশগুলি নিয়ে ২৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে গ্রামে পৌঁছানোর লক্ষ্যে রওনা দেয়।


ইউসুফ ইংরেজি সংবাদপত্র দি টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘আমার ছেলে ও তাঁর দুই চাচাতো ভাইয়ের মুখ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা কি এমন করেছিল যে, তাদের এই ধরণের বর্বরতার শিকার হতে হল? তারা আমার নিরাপরাধ পুত্রকে কোনও কারণ ছাড়াই নির্মমভাবে হত্যা করেছে। তার সঙ্গে হত্যা করেছে তার দুই চাচাতো ভাইকেও।’


ইউসুফ আরও বলেন, ‘আমার বয়স এখন ৫০ পার হয়ে গেছে। কিন্তু কখনও কোনও সফরের সময় আমি আমার শরীর ও মনজুড়ে এতো বেদনা অনুভব করিনি। যেখানে সেনারা এদের কবর দিয়েছিল,  আমরা সেই গান্টিমুল্লা গ্রাম থেকে ভোর সাড়ে পাঁচটায় রওয়ানা দেই। আর সন্ধ্যার সময় আমরা নিজেদের গ্রামে পৌঁছাতে পারি। কিন্তু ফেরত যাত্রার সময় মনে হচ্ছিল কফিনে ভরা সন্তানদের দেহ নিয়ে এই পথ যেন শেষ হবে না। প্রতিটি মুহূর্তই যেন হৃদয়কে বিঁধে যাচ্ছিল।’


জম্মুর রাজৌরি থেকে তরতাজা তিন তরুণ এসেছিল কাশ্মীরে। উদ্দেশ্য ছিল, কোনও কাজ করে কিছু রোজগার করা, যাতে তাদের গরিব পরিবারকে খানিকটা হলেও সাহায্য করা যায়। কোভিড মহামারিতে রাজৌরির এই গরিব পরিবারগুলি আরও সংকটের মধ্যে পড়েছিল। 


১৭ জুলাই রাত্রে রোজগারের খোঁজে আসা এই তরুণরা শোফিয়ানের আমশিপোরায় রাষ্ট্রীয় রাইফেলসের গরম বুলেটের শিকার হয়ে প্রাণ হারায়। রাষ্ট্রীয় রাইফেলস্ গর্বের সঙ্গে দাবি করে, তারা তিন অজ্ঞাত পরিচয় জঙ্গিকে নিকেশ করতে সক্ষম হয়েছে।  


অজ্ঞাত পরিচয়ে জঙ্গিদের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর যে নিয়ম রয়েছে, তাদের দেহ বারামুল্লার একটি প্রত্যন্ত ও আপাত নির্জন কবরস্থানে পুঁতে দেওয়া হয়। পরিবার নিশ্চিত ছিল তাদের নিরুদ্দেশ সন্তানরা হয়তো কোনও রোজগারে লেগে পড়েছে, হয়তো ফোন করার সুযোগ পাচ্ছে না। 


কিন্তু ১০ আগস্ট এই হতভাগ্য পরিবারটি সোশ্যাল মিডিয়ায় নিহতদের ছবি দেখে। বলা হচ্ছিল, এরা সেনাবাহিনীর হাতে তিন নিহত জঙ্গি। এই ছবি দেখেই পরিবার বুঝতে পারে, এরাই হচ্ছে তাদের তিন সন্তান, যাদের জঙ্গি আখ্যা দিয়ে ‘নিকেশ’ করা হয়েছে। 


এই নিয়ে কাশ্মীরে শোরগোল শুরু হয়। চাপের মুখে পুলিশ এবং সেনাবাহিনী আলাদা করে তদন্ত শুরু করে। কয়েক সপ্তাহ পর পুলিশ জানায়, ‘হত্যাকৃত তিন তরুণের সঙ্গে পরিবার থেকে সংগ্রহ করা ডিএনএ-এর নমুনা সম্পুর্ণ মিলে গিয়েছে।’


মানবাধিকার কর্মী গাফফার আহমদ যিনি এদের ইনসাফ পাওয়ার লড়াই-য়ে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তিনি লাশ নেওয়ার জন্য এই পরিবারের সঙ্গে সফর করেন।  তিনি বলেন, ‘আমি মৃতদেহগুলি দেখেছি। বুলেটে দেহগুলির হাড় পুরোপুরি অথবা আংশিকভাবে বিকৃত হয়ে গিয়েছে।’


তিনি আরও বলেন, ‘যখন এই তরুণদের মৃতদেহগুলি কবর থেকে তোলা হয়, তখন পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। গ্রামে মৃতদেহগুলি নিয়ে এলে হাজার হজার মানুষ তা দেখার জন্য একত্রিত হয়। সকলেরই হৃদয় ছিল দুঃখে ভরা, শোক-সন্তপ্ত।’


 এই মৃতদেহগুলির মধ্যে একটি ছিল ১৭ বছর বয়সী ইবরারের। সে দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র ছিল। আর ইমতিয়াজের বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর। তাদের আশা ছিল, যদি তারা কাশ্মীরে গিয়ে মেহনতের কাজ করে পরিবারের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করতে পারে। কিন্তু তার বদলে পরিবারের জন্য অফুরন্ত দুঃখ ও শোকের পাহাড় নিয়ে তারা গ্রামে ফিরে এলো। 


এই যাযাবর পশুপালক পরিবারগুলি অন্তত সন্তানদের লাশ ফিরে পাওয়ার আশায় অনবদ্য এক লড়াই শুরু করেছিল। তাদের আশা ছিল, তাদের তরুণ সন্তানদের তো সেনাবাহিনী হত্যা করেছেই। যদি এখন তারা লাশগুলো ফেরত দেয়, তাহলে অন্তত নিজেদের গ্রামের কবরস্থানে ইসলামী রীতি মেনে সন্তানদের জানাযার নামায আদায় করে তাদের দাফন করতে পারবে।

তরজমা: এ এইচ ইমরান 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only