শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২০

মতপ্রকাশের স্বাধীনতারকে অপব্যবহার করা হচ্ছে বেশি, কেন্দ্রকে তোপ স‍ুপ্রিম কোর্টের



পুবের কলম, নয়াদিল্লিঃ তবলিগ-ই-জামাতের এক অনুষ্ঠান হয়েছিল নয়াদিল্লির নিজামুদ্দিন দরগাহ এলাকার একটি মসজিদে। দিল্লিতে তখন চলছিল করোনার দাপাদাপি। মার্চ মাসের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত ওই ধর্মীয় সভাতে বিদেশ থেকেও বেশ কিছু তবলিগ অনুসারী যোগ দিয়েছিলেন। হঠাৎ ঘোষিত লকডাউনের কারণে দিল্লিতে থাকা তবলিগ-ই- জামাতের অনুসারীরা শহরেই আটকে পড়েন। 


দিন কয়েক পর কয়েকটি চিহ্নিত নিউজ চ্যানেল ও সংবাদপত্র প্রায় প্রতিদিনই দোষারোপ করতে থাকে, তবলিগ-ই-জামাতের ওই ধর্মীয় সভার কারণেই নাকি দিল্লি ও ভারতের বিভিন্ন জায়গায় করোনা ছড়িয়েছে। আর নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়কে এজন্য দায়ী করা হতে থাকে। মিডিয়ার এই ভূমিকার কারণে সংখ্যালঘ‍ু সম্প্রদায়ভুক্ত ফল ও সবজি বিক্রেতা থেকে শুরু করে অটোচালকরাও নির্মমতার শিকার হতে থাকে। দোকানপাট ও শপিংমল থেকে সংখ্যালঘ‍ু সম্প্রদায়কে বয়কট করারও নজির মেলে। তবলিগ-ই-জামাত তো বটেই সংখ্যালঘ‍ু সম্প্রদায়ের নাগরিকরাও  নানান হয়রানির শিকার হন। 


সংবাদমাধ্যমের এই একপেশে আচরণের বিরুদ্ধে ইনসাফ চেয়ে এখন সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলার শুনানি হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট বৃহস্পতিবার এ সম্পর্কে কেন্দ্রীয় সরকারের কড়া সমালোচনা করেন প্রধান বিচারপতি এস এ বোবদের নেতৃত্বাধীন বিচারপতিদের এক বেঞ্চ। তাঁদের বক্তব্য, কেন্দ্র এ সম্পর্কে যে হলফনামা দাখিল করেছে, তা চাতুরীপূর্ণ এবং তাতে মূল বিষয়কে এড়িয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা রয়েছে।


সুপ্রিম কোর্ট আরও বলেছে, বর্তমানে মত প্রকাশের স্বাধীনতারই সবথেকে বেশি অপব্যবহার হচ্ছে। শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে এই বেঞ্চে জমিয়তে উলেমায়ে হিন্দ এবং আরও কয়েকজনের দায়েরকৃত মামলার শুনানি হয়। ওই সংগঠনগুলি আলাদা আলাদাভাবে অভিযোগ করে, তবলিগ-ই-জামাত সম্মেলন ও কোভিড ১৯’এর খবর এবং দৃশ্য সম্প্রচারে সাম্প্রদায়িক রং রয়েছে ও এজন্য তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানায়। 


কেন্দ্রের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতাকে শীর্ষ আদালতের বিচারপতিদের বেঞ্চ এজন্য ভর্ৎসনা করে যে, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক এক জুনিয়র অফিসারকে দিয়ে শীর্ষ আদালতে হলফনামা পেশ করেছে। আর ‘অপ্রয়োজনীয়’ এবং ‘অর্থহীন’ যুক্তি পেশ করে ওই বিষয়ে মিডিয়ার রিপোর্টিং সম্পর্কে হলফনামা দেওয়া হয়েছে। শীর্ষ আদালত আরও বলেছে যে, কেন্দ্রকে সেক্রেটারি পর্যায়ের আধিকারিককে দিয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রককে বিস্তারিত জানাতে হবে যে ‘অনুপ্রাণিত মিডিয়ার’ ওই ধরনের উদ্দেশ্যমূলক রিপোর্টিংকে বন্ধ করার জন্য তারা কী ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। 


সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা আরও বলেন, আপনারা যে পদ্ধতিতে হলফনামা পেশ করেছেন, আদালতের প্রতিও সেই একই আচরণ করতে পারেন না। হলফনামাটিতে এড়িয়ে যাওয়ার মতো যুক্তি পেশ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে অভিযোগকারীরা খারাপ রিপোর্টিংয়ের কোনও নজির পেশ করেনি। বিচারপতিরা আরও বলেন, সম্প্রচার মন্ত্রকের আইনজীবীরা সহমত পোষণ করতে নাও পারেন। কিন্তু তারা বলতে পারেন না যে, কোনও মন্দ রিপোর্টিংয়ের ঘটনা দেখানো হয়নি। 


মন্ত্রকের সেক্রেটারিকে আরও একটি হলফনামা পেশ করতে হবে। আর তাতে এবারকার মতো চাতুরীপূর্ণ ও এড়িয়ে যাওয়া বক্তব্য যেন না থাকে। প্রধান বিচারপতি বোবদে স্বয়ং শীর্ষ আদালতে ওই মন্তব্যগুলি করেন। তবলিগ-ই-জামাতের সিনিয়র আইনজীবী দুষ্মন্ত দাবে আদালতকে বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার বরং উলটে তাদের হলফনামায় অভিযোগে করেছে, অভিযোগকারীরাই নাকি বক্তব্য ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতাকে গলা টিপে ধরতে চাইছে। তাৎপর্য্যপূর্ণ বক্তব্য রেখে বিচারপতি বোবদে, বিচারপতি এ এস বোপান্না এবং ভি রামসুব্রহ্মণ্যম বলেন, বাক্-স্বাধীনতা এবং মতামত প্রকাশের অধিকারের সাম্প্রতিককালে সবথেকে বেশি অব্যবহার হচ্ছে। 


এই মামলার শুনানি পুনরায় ২ সপ্তাহ পরে অনুষ্ঠিত হবে। কেন্দ্রীয় সরকার তাদের হলফনামায় আরও বলেছিল, সংবাদ প্রতিবেদনগুলি যদি সত্য ও তথ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সেগুলিকে সেন্সর করা যায় না। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রের এই বক্তব্যকে খারিজ করে দিয়ে তাদেরকে নতুন করে হলফনামা পেশ করতে বলল। আইনজ্ঞরা বলছেন, তথ্য ও ছবিকে নিজস্ব মতামত ও ধ্যান-ধারণার মোড়কে পেশ করা অসম্ভব কোনও কাজ নয়। 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only