শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২০

গো-রক্ষার নামে বড় মূল্য চোকাতে হচ্ছে ভারতকে


 



পুবের কলম বিশেষ প্রতিবেদনঃ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ২০১৪ সালে হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি নির্বাচনে জেতার পর থেকে ভারতে মুসলিম,নিচু জাতের হিন্দু ও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ঘৃণার পরিমাণ বেড়েছে। প্রায় প্রতি সপ্তাহে গো-রক্ষার নামে লিঞ্চিংয়ের ঘটনা ঘটে চলেছে। মোদি জামানার প্রথম পাঁচ বছরে ধর্মীয় ঘৃণার ফলে অপরাধ ঘটেছে ২৭৬টি। জানাচ্ছে হেট ক্রাইম ওয়াচ নামে তথ্যকেন্দ্র। এই ‘হেট ক্রাইম’-এর শিকার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংখ্যালঘু ও দলিতরা এবং গরু রক্ষার সঙ্গে এগুলির যোগ রয়েছে। আবার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সরকার তথৈবচভাবে এই ধরনের অপরাধকে স্বীকার করলেও অপরাধীদের এই কাজকে সামান্য নিন্দাটুকুও করেনি।

ভারতে গরু জবাই করা বেআইনি হলেও মহিষ জবাই আইনসিদ্ধ। সংবিধানের ৪৮ ধারায় গরু- বাছুর ও দুধ দেওয়া পশুদের হত্যা করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু এই আইন সব রাজ্য মেনে চলতে বাধ্য এমনটাও নয়। উত্তর-পূর্ব– দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতের অনেক রাজ্যে গরু-মহিষ জবাই করার অনুমতি রয়েছে। সম্প্রতি দেশের পশুপালন মন্ত্রক লাইভস্টক সেনসাস প্রকাশ করে গৃহপালিত পশু যেমন গরু,ছাগল,মহিষ,ভেড়া,ঘোড়া ইত্যাদির সংখ্যা তুলে ধরেছে। ২০১৯ সালের এই সুমারিতে দেখা গিয়েছে গৃহপালিত পশুর সংখ্যা ১৯২.৯০ মিলিয়ন এবং আশ্চর্যের বিষয় হল যে রাজ্যগুলিতে পশু জবাই করা আইনসিদ্ধ সেখানেই পশুর সংখ্যা সর্বাধিক বৃদ্ধি পেয়েছে। যেমন পশ্চিমবঙ্গ অসম সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের নানা রাজ্যে। পশ্চিমবঙ্গে বেড়েছে ১৯ মিলিয়ন অর্থাৎ ১৫.১৮ শতাংশ। অসমে ১০ মিলিয়ন অর্থাৎ ৫.২৯ শতাংশ। অন্যদিকে যেসব রাজ্যে পশু হত্যা নিষিদ্ধ যেমন উত্তরপ্রদেশ,মধ্যপ্রদেশ প্রভৃতি সেখানে পশুর সংখ্যা ব্যাপক হারে কমেছে। ভক্তিভরে গো-পূজা হয় যে উত্তরপ্রদেশে সেখানে গরুর সংখ্যা কমেছে ৩.৯৩ শতাংশ। গো-হত্যা অভিযোগে ও সন্দেহে মানুষ খুন করা হয় যে মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ সেখানে গরুর সংখ্যা কমেছে যথাক্রমে ০.৪২ ও ১০.০৭ শতাংশ। এই সংখ্যাগুলিই প্রমাণ করে দিচ্ছে– যেখানে পশুপালন লাভজনক সেখানে মানুষ বেশি পরিমাণে পশুর পালন করছে। উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশের মানুষ পশুপালনে আগ্রহী নয়। যে গরু দুধ দেয় না সেগুলিকে তারা দেখভাল করে না। ছেড়ে দেয়।

ভয়েস অফ আমেরিকা নামে এক সংবাদ সংস্থা ২০১৯ সালে এক রিপোর্ট দেখিয়েছে যে উত্তরপ্রদেশের হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার পশু ব্যবসার উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা চাপানোর ফলে কসাইখানাগুলি প্রায় বন্ধ হওয়ার মুখে পড়েছে। আগে বুড়ো গরুগুলি বেচে দেওয়া হত কসাইখানায়। এই কঠোর আইনের ফলে চাষিরা তাদের বুড়ো গরুগুলি রাতের অন্ধকারে পাশের গ্রামে বা রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বেওয়ারিশ গরুর সংখ্যা বিপুল পরিমাণে বেড়ে গিয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে এই সংখ্যাটা ৫০ লক্ষেরও বেশি।

যে রাজ্যে পশু জবাই নিয়ে কড়াকড়ি নেই সেখানে উত্তরপ্রদেশ থেকে গরু আসত। কিন্তু এই গরু নিয়ে যাওয়া কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছে কারণ বিজেপি সমর্থিত উগ্র গোরক্ষকরা রাস্তায় টহল দিচ্ছে। রাস্তায় ট্রাক দাঁড় করিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে। এর ফলে বহু মুসলিম ও দলিত ট্রাকচালক এই স্বনিযুক্ত গোরক্ষকদের হাতে আক্রান্ত হয়ে প্রাণও হারিয়েছে। এ দিকে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে আসছেন যে চাষিরা যেহেতু ফসলের ন্যায্য মূল্য পান না তাই তাঁরা পশুপালন করেন দুধ বিক্রির জন্য এবং বয়স্ক পশুকে কসাইখানায় বিক্রি করে আয়ের মুখ দেখেন। কিন্তু গরু নিয়ে এই উন্মাদনা ও কড়াকড়ির ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি বেহাল দশায়। এ ছাড়া বিদেশি মুদ্রা আয়েও ভাটা পড়েছে গো-হত্যা ও গো-মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করে দিয়ে। পশ্চিম এশিয়ার ইসলামি দেশগুলিতে হালাল মাংসের বিপুল চাহিদা। এমনকী ইসরাইলেও।

আমেরিকার ভারততত্ত্ববিদ ও শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মীয় ইতিহাসের অধ্যাপক ওয়েনডি ডনিগার লিখেছিলেন যুগ যুগ ধরে পণ্ডিতরা জানেন যে প্রাচীন ভারতে গো-মাংস খাওয়া হত। ১৯ শতকে গো-রক্ষা আন্দোলনের পালে হাওয়া লাগে। এই আন্দোলনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের দমিয়ে রাখা। অত্যাচার করা। সাম্প্রতিককালে মুসলিম, খ্রিস্টান ও দলিতদের যেভাবে লিঞ্চিং করা হচ্ছে সেটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দেখা গেছে যখনই গো-রক্ষার নামে কাউকে পিটিয়ে মারা হচ্ছে তখন সমস্ত তর্কটা অর্থনীতি থেকে ঘুরে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের দিকে চলে যাচ্ছে। ভারত একটা জটিল রাষ্ট্র। দীর্ঘ সময়ের সমৃদ্ধি ও হ্রদয়বিদারক দারিদ্র্যের ইতিহাস রয়েছে এই দেশের। রাজনৈতিক শক্তি ইতিহাসকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে ‘পুরনো গৌরব উদ্ধার’-এর গল্প শোনায়। বিজেপি হিন্দুর গৌরবগাথার কথা বলে। অনস্বীকার্য যে এককালে জ্যোতিবির্দা ও ধাতুবিদ্যায় ভারত অনেক উন্নতি করেছিল।

ভারতের মুসলিম ও খ্রিস্টানরা এটা বোঝেন যে গো-ভক্তি ও গো-পূজা সংখ্যাগুরু হিন্দুর কাছে একটা সংবেদনশীল ব্যাপার। তাই অধিকাংশ মুসলিম খাবারের দোকানের মেনুতে গো-মাংস রাখা হয় না বা বিজ্ঞাপিত করা হয় না। ধারণা হয় যে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে অন্তত গরুর ব্যাপারে একটা সৌহার্দ্যরে সম্পর্ক রয়েছে। তাহলে গরু ব্যবসা ও গরু জবাই নিয়ে এই ধরনের ঘৃণা আসছে কোথা থেকে? উত্তরটা জটিল। কারণ এর শিকড় রয়েছে ব্যক্তির অনুভূতি ধর্মীয় অন্ধত্ব ও রাজনীতিতে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only