শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২০

জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার সুদীর্ঘ ১০০ বছরের যাত্রাপথ : কলমে ড. মহম্মদ নাজিব ক্বাসমি



বিশেষ প্রতিবেদনঃ  জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া স্থাপিত হয়েছিল ১৯২০ সালের ২৯ অক্টোবর। এ বছর এই প্রতিষ্ঠানের ১০০ বছর পূর্তি হল। আমাদের পূর্বসূরিদের স্বপ্ন ও ত্যাগের ফলে এই বিশ্ববিদ্যালয় আজ শুধু ভারতের নয় বরং বিশ্বের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। নয়টি বিভাগ সহ অনেকগুলি বিদ্যাচর্চা কেন্দ্র ও পাঁচটি স্কুল আছে জামিয়ার। বিভিন্ন ধর্মের,বিশেষত মুসলিম ২৫ হাজার ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করছে এখানে। এই মাসে আরও তিনটি বিভাগ খোলা হয়েছে ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজেস,হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট,পরিবেশ বিজ্ঞান। এই অগ্রগতির ধারা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। ডঃ জাকির হুসেনের নামে একটি গ্রন্থাগার রয়েছে জামিয়াতে। লক্ষাধিক বইয়ে সমৃদ্ধ এই গ্রন্থাগার। সৌদির রাজা সালমান বিন আধুল আজিজের অর্থানুকূল্যে ২০০৬ সালে এই গ্রন্থাগার স্থাপিত হয়েছিল। 

বহু দিন ধরে জামিয়াতে একটি মেডিকেল কলেজের প্রয়োজন ছিল। সরকার থেকে নানা প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে অখিলেশ যাদব সরকার কথা দিয়েছিল যে জামিয়ার সংলগ্ন জমিতে একটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন করা হবে। কিন্তু সেটা প্রতিশ্রুতিই রয়ে গিয়েছে। মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিধৌত ও শায়খ-উল-হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসানের উদ্যোগে নির্মিত জামিয়াতে যাতে মেডিকেল কলেজ গড়ে তোলা যায় সে জন্য বর্তমান সরকারের কাছে জমি চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। 


২০২০ সালের আগস্টে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের প্রকাশিত  র‍্যাঙ্কিংতে শীর্ষ স্থান দখল করেছে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া। অন্য ভাবে বললে জামিয়া দেশের অন্যতম সম্মানীয় বিশ্ববিদ্যালয়। অনেকেই এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে টেনে নিচে নামিয়ে আনতে চেষ্টা করেছিল কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালকরা তা হতে দেননি। তাঁরা ধন্যবাদার্হ। বুলেটের জবাব বুলেট দিয়ে নয় বরং শিক্ষক ও পড়ুয়ারা শিক্ষার অলংকার দিয়ে তার প্রত্যুত্তর দিয়েছেন। 


১৯২০ সালে মহাত্মা গান্ধী ও শায়খ-উল-হিন্দ হজরত মাওলানা মাহমুদ হাসানের তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠিছিল জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া যেটা আজ দেশের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলির একটি। এই প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় অনেকের অবদান রয়েছে। যেমন হাকিম আজমল খান, ডঃ মুখতার আহমেদ আনসারি,আধুল মাজিদ খাজা,মাওলানা মুহম্মদ আলি জোহর,ড জাকির হুসেন,অধ্যাপক মুহম্মদ মুজিব সহ বহু নেতা। এই প্রতিষ্ঠানের বিশেষত্ব হল, এর প্রতিষ্ঠাতারা দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলন যখন চরমে সেই রকম সময়ে স্থাপিত হয়েছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়। এ কথা বলা যায় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা মাথায় রেখেই স্থাপিত হয়েছিল জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া। এই কারণে জামিয়ার ভিতেই রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা,স্বাধীনতা,দেশপ্রেম,সহিষ্ণুতা। এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দেশের শিক্ষাগত ভাবে পিছিয়ে পড়া সংখ্যালঘুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করা। অন্ধকার থেকে তুলে আনা। পাশাপাশি উর্দু ভাষার চর্চাও ছিল লক্ষ্য। তাই শুরুর দিন থেকেই বিখ্যাত উর্দু কবি ও পণ্ডিতদের মিলনক্ষেত্র হয়ে উঠেছে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া। 


স্যার সৈয়দ আহমেদ খান একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন আলিগড়ে। কিন্তু এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ব্রিটিশদের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল স্যার সৈয়দের। তাই স্বাধীনতা সংগ্রামীরা এ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। সেই উদ্বিগ্নতা থেকে ১৯২০ সালের ২৯ অক্টোবর জামিয়ার জন্ম। ১৯২৫ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় দিল্লির কারুলবাগে এক ভাড়া বাড়িতে উঠে গিয়েছিল। এমন সময়ও এসেছিল যখন জামিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুখে পড়ে। কিন্তু শিক্ষাবিদ ও উৎসাহীরা এগিয়ে এসে সেই কঠিন সময়ে জামিয়ার পাশে দাঁড়ান। ১৯৩৫ সালে ওখলায় সরে যায় জামিয়া যেখানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি কেনা ছিল। ১৯৬২ সালে জামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের র*প পায় এবং ১৯৮৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে। ’ইসলামিয়া’ শধটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম থেকে সরানোর বহু চেষ্টা হয়েছে কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের শুভানুধ্যায়ীরা তা হতে দেননি। বিশেষ করে মহাত্মা গান্ধী। সংক্ষেপে বললে দেশের নেতৃবর্গ তাঁদের জীবনসম্পদ ও সময় অকাতরে ত্যাগ করেছেন জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার জন্য যা আজ গোটা দেশের আলোকবর্তিকা হিসাবে উজ্জ্বলতা ছড়াচ্ছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only