শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২০

ফ্রান্সে মর্মান্তিক ঘটনা­য় প্রকৃত দায়ীদের কিন্তু চিহ্নিত করতে হবে !


বিশেষ প্রতিনিধি: ফ্রান্সে এক চরম  মর্মন্তুদ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। নীস শহরের বিখ্যাত নটরদাম চার্চের ভেতরে ও বাইরে একাকী ২১ বছরের এক তরুণ সাধারণ অসহায় মানুষের ওপর হামলা চালায়। এই ঘটনায় একজন মহিলাসহ ৩জন নিহত হয়েছে। জানা গেছে আক্রমণকারী সদ্য তরুণ একজন টিউনেশিয়ান বংশোদ্ভূত ফরাসি নাগরিক। তার নাম ব্রাহিম এ বলে জানিয়েছে একটি স্থানীয় দৈনিক ‘নীস মাতিন’। এই আক্রমণের পেছনে হত্যাকারীর উদ্দেশ্য কী ছিল তা নিয়ে তদন্ত চলছে।  ওই চেচেন বা টিউনেশিয়ান বংশোদ্ভূত হামলাকারী কোনও জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিল এর প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।

তবে শহরের মেয়র ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইম্যানুয়েল ম্যাক্রোঁ ইতিমধ্যেই ঘোষণা করে দিয়েছেন এটা ‘ইসলামী সন্ত্রাস’। কারণ হিসাবে তারা বলেছেন হামলাকারী ওই সদ্য তরুণ ব্রাহিম (ইব্রাহিম?) নাকি সমানে বলে যাচ্ছিল ‘আল্লাহু আকবর’। অর্থাৎ ‘ঈশ্বর সর্বশ্রেষ্ঠ’। 
এই ঘটনার নিন্দা করেছেন বিশ্বের সমস্ত নেতৃবৃন্দ। এদের মধ্যে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ,তুরস্কের এরদোগান, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী।  ইরান,মালয়েশিয়ার নেতৃবৃন্দ প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন।  মালয়েশিয়ার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও মুসলিম চিন্তাবিদ মাহাথির বলেছেন ‘পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।’ 

প্রকৃতপক্ষে ফ্রান্সের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মুসলিমদের প্রথম থেকেই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব ছিল। ফ্রান্স ঔপনিবেশিক শক্তি হিসাবে আলজেরিয়া,টিউনেশিয়াসহ অন্য মুসলিম দেশগুলিতে তাদের দখলদারীর সময় যে ভাবে গণহত্যা ,লুন্ঠন ও নির্যাতন চালিয়েছে তা তাদের ইতিহাসকে চিরকালের জন্য কালিমালিপ্ত করেছে। আর এজন্য ফ্রান্সের কর্তৃপক্ষ কখনও দুঃখ দূরে থাকুক লজ্জাও প্রকাশ করেনি। 
কিন্তু এসব ইতিহাস তুলে ধরে কোনও মতেই ফ্রান্সের চার্চটিতে হামলার অপরাধ ও গুরুত্বকে বিন্দুমাত্র লঘু করে দেখানো সম্ভব নয়। এই অপরাধ ও মনোবৃত্তিকে কঠোর নিন্দা করতেই হবে। 

তবে একটি কথা বলে দেওয়া ভালো ওই তরুণ ঘাতক কোনও মতেই মুসলিমদের প্রতিনিধি নয়। তার মানসিক বৈকল্য  রয়েছে কীনা তা পরে হয়তো জানা যাবে। যেভাবে সংবাদমাধ্যমে বলা হচ্ছে যে সে একজন নিরাপরাধ অসহায় মহিলার গলা কেটে হত্যা করেছে কিংবা আরও ২জন পুরুষকে খুন করেছে তাতে বলতেই হবে সে ইসলাম থেকে বহুযোজন দূরে রয়েছে। কারণ ইসলাম মহিলাদের ওপর আক্রমণ বা হত্যাকে বড় ধরণের পাপ বা গুনাহ বলে মনে করে। ইসলামের নবী ও খলিফারা সেনাদের অবশ্য পালনীয় বলে যে নির্দেশ জারি করেছেন তাতে রয়েছে যুদ্ধের সময় নারী-শিশু-বৃদ্ধ বা সন্ন্যাসীদের হত্যা করা চলবে না। এমনকী বিপক্ষের ক্ষতির জন্য  ছায়াদানকারী বৃক্ষকেও কেটে ফেলা নিষিদ্ধ। টিউনেশিয়ান বংশোদ্ভূত ওই তরুণ ইসলামের এই প্রাথমিক নির্দেশকে অমান্য করেছে।

দ্বিতীয়ত পবিত্র কুরআন ঘোষণা করেছে কেউ যদি একজন ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে তবে যেন সে সমগ্র মানবতাকে হত্যা করল। আর যদি কেউ কোনও মানুষের জীবন রক্ষা করে তবে সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করল। ইসলাম কখনই নির্দোষ নিঃসহায়কে নির্যাতন বা হত্যা করে প্রতিশোধ নেওয়াকে স্বীকৃতি দেয় না। 
মস্তিষ্ক যদি খারাপ না থাকে সেক্ষেত্রে কেন শিক্ষক হত্যাকারী ওই চেচেন কিশোর কিংবা টিউনেশিয়ান তরুণটি ক্ষিপ্ত ক্রোধে হত্যার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নিহত শিক্ষক সম্পর্কে বলা যায় সে প্রত্যেক ঈমানদার মুসলিমের প্রাণের চেয়েও প্রিয় রাসূল মুহাম্মদ (সা.)-কে ব্যঙ্গ চিত্রের মাধ্যমে অপমান করার প্রচেষ্ঠায় অহেতুক সামিল হয়েছিল। ওই চেচেন কিশোর তা বরদাশ্ত করতে পারেনি। কিন্তু চার্চের ভেতরে বা বাইরে মহিলাসহ ৩ ব্যক্তির হত্যাকে কোনও ক্রমেই ক্ষমা করা যায় না। 
তবে দেখতে হবে কারা এই ধরণের পরিবেশ গড়ে তুলছে যাতে মানুষ বর্বর শক্তির সামনে অনন্নোপায় হয়ে জীবন বিসর্জন দিতে প্রস্তুত  হয়ে যাচ্ছে? ফ্রান্স কারণ ছাড়াই প্রফেট মুহাম্মদ (সা.) কে অপমান করাকে তাদের অধিকারের পরাকাষ্ঠা বলে মনে করছে। এটাই নাকি স্বাধীনতা,বাক স্বাধীনতা ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা? ফরাসি কর্তৃপক্ষ সমস্ত সরকারি ভবনে রাসূল মুহাম্মদ (সা.) এর ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শন করেছে। কোনও সাধারণ মানুষ নয় এটা করেছে সরকার। আর এর সমর্থনে বড় বড় বুলি ঝেড়েছেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ। 
শুধু ফ্রান্সের মুসলিমদের নয়।  নবীর এই অপমান আহত ও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে সারা বিশ্বের মুসলিমদের। কিন্তু ফ্রান্স ও ইউরোপের অন্য কয়েকটি দেশ মনে করে এটা তাদের স্বাধীনতা। তবে স্বাধীনতার অপব্যবহারের মূল্যও চুকাতে হয়। আর তা চুকাতে হয় সাধারণ নিরপরাধ অসহায় মানুষকে। 

সম্প্রতি ফ্রান্সের সরকার আফগানিস্তান,লিবিয়া,সিরিয়া প্রভৃতি মুসলিম রাষ্ট্রে সৈন্য পাঠিয়ে সাধারণের হত্যাকাণ্ডে সাগ্রহে অংশ নিয়েছে। এই বিষয়টিও মুসলিম জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। পশ্চিম এশিয়ায় ভিন্ন দেশ থেকে ইহুদিদের এনে ইসরাইল রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তুলতেও ফ্রান্সের ভূমিকা নজিরবিহীন।  
কিন্তু সভ্যতার এই সংঘাত কখনই কাম্য নয়। যদিও ফ্রান্স হলোকাস্ট অস্বীকারকারীদের মতামতের স্বাধীনতাকে কিন্তু স্বীকার করেনা। তাদের সমানে  জেল-জরিমানা ও নির্বাসন দিয়ে চলেছে স্বাধীনতার সমর্থনকারী এই দেশটি। অর্থাৎ হলোকাস্ট অস্বীকারকারীদের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই। স্বাধীনতা রয়েছে শুধু প্রফেট মুহাম্মদ (সা.) কে অবমাননা করার! 

আসলে সভ্যতার সংঘাতে না গিয়ে আমাদের বরং সভ্যতার সমন্নয়ে আস্থা রাখতে হবে। আমাদের পরস্পরকে সহিষ্ণুতা ও অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। কারণ ও অকারণ বুঝতে হবে। তা না হলে এই লড়াইয়েরও কোনও শেষ নেই। আর এরদ্বারা মানবতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে অসহায় ও নিরাপরাধ মানুষ। জাতিবিদ্বেষ চাগিয়ে উঠবে। মানবতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল জাপানের হিরোসিমা-নাগাসাকিতে মার্কিন যুক্তরাষ্টের সদর্প আনবিক বোমা নিক্ষেপে শিশু-নারী-বৃদ্ধসহ হাজার হাজার মানুষের করুণ হত্যাকাণ্ডের দ্বারা। অবশ্য এতে লজ্জা পায়নি মার্কিন যুক্তরাষ্ট। তারা বলেছিল এতো হচ্ছে যুদ্ধের স্বাভাবিক ও অমোঘ পরিণতি। তারা খুনি নয়। 

ম্যাক্রোঁকে ভাবতে হবে তিনি সৈন্য মোতায়েন তিনগুন করলেও কোনও ফল হবে কীনা। ভালোবাসা ও সুবিচার যা খ্রিস্ট ধর্মেরও মূল কথা তা তিনি অনুসরণ করবেন? নাকি স্বাধীনতার নামে ঘৃণা-বিদ্বেষ সম্প্রসারণের লড়াই চালিয়ে যাবেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only