বুধবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২০

ভিনধর্মে বিয়েতে সমস্যা নেইঃ ইলাহাবাদ হাইকোর্ট



পুবের কলম, লখনউঃ তথাকথিত লাভ জিহাদ বা আন্তঃধর্মীয় বিবাহ রুখতে বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্য কঠোর আইন তৈরি করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। যদিও এমন কোনও ঘটনার অভিযোগ দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি কোনওদিন করেনি বলে সংসদে জানিয়েছেন বিজেপি সরকারের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। তবুও একটি মহল বারবার এই ইস্যু তুলে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে উত্তরপ্রদেশের ইলাহাবাদ হাইকোর্ট গুরুত্বপূর্ণ রায় দিল মঙ্গলবার। 


এক মুসলিম যুবক এক হিন্দু মেয়েকে অপহরণ করেছে এবং জোরপূর্বক বিয়ে করেছে, এমন অভিযোগ এনে এফআইআর করেছিল মেয়েটির অভিভাবকরা। এর শুনানিতে এ দিন ইলাহাবাদ হাইকোর্ট লাভ জিহাদ ইস্যুতে অভিযুক্ত সালামত আনসারির বিরুদ্ধে দায়েরকৃত এফআইআর খারিজ করে দিয়েছে। আদালত স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক তাদের পছন্দের সঙ্গী নির্বাচন করতে পারেন স্বাধীনভাবে। কার সঙ্গে বসবাস করবেন বা কোন ধর্মের মানুষকে সঙ্গী হিসেবে নির্বাচন করবে, সেটা তাদের পছন্দের স্বাধীনতার অধিকার। 


এর আগে আদালত এই আন্তঃধর্মীয় ইস্যুতে দু’টি মামলার রায় দিয়েছিল, যেখানে শুধু বিয়ের জন্য ধর্মান্তরণকে গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানানো হয়। এর পর পরই মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ লাভ জিহাদ রুখতে আইন প্রণয়নের ঘোষণা দেন। এ দিন ইলাহাবাদ আদালত এ প্রসঙ্গে জানায়, সেগুলি মোটেই ভালো আইন হবে না। মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দের স্বাধীনতাকে হরণ করবে এই আইন। আদালতের এই রায় স্পষ্টত যোগীর ঘোষণায় সপাটে থাপ্পড় কষাল। লাভ জিহাদ প্রপাগান্ডায় ধাক্কা খেল সংঘ পরিবার। 


উত্তরপ্রদেশের কুশীনগরে বসবাসকারী সালামত আনসারি এবং প্রিয়াঙ্কা খারওয়াড় (আলিয়া) তাদের পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গতবছরের আগস্টে বিয়ে করেছিলেন। প্রিয়াঙ্কা বিয়ের আগেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং তিনি নাম পরিবর্তন করে নিজের নাম আলিয়া রাখেন। 


ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রিয়াঙ্কার পরিবার সালামতের বিরুদ্ধে ‘অপহরণ’ এবং ‘বিয়ের জন্য প্রলোভন’ দেওয়ার অভিযোগ এনে এফআইআর করে। এফআইআরে ‘পকসো’ আইনও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে তাদের মেয়ে বিয়ে করার সময় নাবালিকা ছিল। অন্যদিকে, অভিযুক্ত সালামত তার বিরুদ্ধে দায়ের করা এফআইআর বাতিলের জন্য আদালতে আবেদন জানিয়েছিলেন। ওই আবেদনের শুনানিতে ইলাহাবাদ হাইকোর্ট জানায়, আমরা প্রিয়াঙ্কা খারওয়াড় এবং সালামত আনসারিকে হিন্দু ও মুসলিম হিসাবে দেখছি না। 


তারা দু’জনেই প্রাপ্তবয়স্ক এবং একবছরেরও বেশি সময় ধরে তাদের ইচ্ছা ও পছন্দ অনুসারে বিয়ে করে সুখে-শান্তিতে জীবনযাপন করছেন। আদালত এবং সাংবিধানিক আদালত ভারতীয় সংবিধানের ২১নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যেকোনও ব্যক্তির জীবন ও স্বাধীনতা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আইন যেকোনও ব্যক্তিকে তার পছন্দের একই বা ভিন্নধর্মের মানুষকে একসঙ্গে থাকার অনুমতি দেয়। এটি জীবনের অধিকার এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকারের জন্য স্বাভাবিক। ব্যক্তিগত সম্পর্কে হস্তক্ষেপ দু’জনের পছন্দের স্বাধীনতায় মারাত্মক আঘাত হানবে। আর এটা যদি করা হয়, তবে আমাদের দেশের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের ধারণাকেও হুমকির মুখে ফেলে দেবে বলে কোর্ট মন্তব্য করে। 


সালামত আনসারির বিরুদ্ধে করা এফআইআর খারিজ করে ইলাহাবাদ হাইকোর্ট জানায়, কোনও অপরাধ ওই দু’জন করেনি। তাই এই অভিযোগ খারিজ করা হল। আর এই প্রাপ্তবয়স্ক দু’জন এক বছরের অধিক সময় ধরে স্বেচ্ছায় একসঙ্গে বসবাস করছেন। ১১ নভেম্বর বিচারপতি পঙ্কজ নাকভি ও বিচারপতি বিবেক আগরওয়ালের রায়ের ব্যাপারে এ দিন আদালত জানায়, দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জীবন ও স্বাধীনতার বিষয়টিকে ওই রায়গুলিতে বিবেচনা করা হয়নি। নুরজাহান ও প্রিয়াংশী কেসের ওই রায়গুলিকে আমরা ভালো আইন হিসেবে মানতে পারছি না। এ দিন এই মামলার শুনানিতে ধর্মান্তরকরণের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কিছু জানায়নি আদালত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only