সোমবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২০

মতাদর্শের ফারাক ভুলে ‘অপু’র পাশে মমতা



পুবের কলম প্রতিবেদক‌: দু’জনের রাজনৈতিক পথ আর মত ছিল বিপরীতমুখী। প্রয়মজন আজীবন বামপন্থায় বিশ্বাসী ছিলেন। দ্বিতীয়জন রাজনৈতিক জীবনে ডানপন্থী হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু মত-পথের পার্থক্য সব ঘুচে গেল এক লহমায়। প্রথমজনের শোকস্তব্ধ পরিবারের পাশে প্রিয়জনের মতো পাশে দাঁড়ালেন। মৃতু্যর খবর পেয়ে ছুটে গিয়েছিলেন বেসরকারি হাসপাতালে। রবীন্দ্র সদন থেকে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে প্রথমজনের অন্তিমযাত্রায় ভারাক্রান্ত মন নিয়ে পা মেলালেন। শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়া ইস্তক বসেই রইলেন শ্মশান চত্বরে। 


প্রথমজন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। আর দ্বিতীয়জন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আজীবন বামপন্থায় বিশ্বাসী ‘অপুর সংসার’-এর নায়কের চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয়ভার বহনের দায়িত্বই শুধু কাঁধে তুলে নেননি, গান স্যালুটে শেষ বিদায় জানানোর ব্যবস্থা করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে কেন আর পাঁচজনের চেয়ে আলাদা তিনি। কেন মানবিকতায় এখনও তাঁর ধারেকাছে নেই বঙ্গের অন্য রাজনীতির কারবারিরা। কেন সত্যিই তিনি মমতাময়ী। 


আর মুখ্যমন্ত্রীর এমন ‘মহানুভবতা’য় কার্যত আপ্ল$ত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা পৌলমী বসু চট্টোপাধ্যায়। বেসরকারি হাসপাতালের চত্বরে দাঁড়িয়ে বাক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলেই ফেললেন, ‘মমতাদি’র কাছে, রাজ্য সরকারের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। বাবাকে এত যত্ন, এত ভালোবেসে, এত সম্মান দিয়ে দেখাশুনো করার জন্য ধন্যবাদ। আমাদের পরিবার এটা ভুলবে না। যা সম্মান ওঁর প্রাপ্য ছিল, তার থেকেও বেশি সম্মান পেয়েছেন। ভালোবেসে নিজের পরিবারের মতো পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।’


‘অপুর সংসার’-এর নায়কের মৃতু্যসংবাদ পেয়েই বেসরকারি হাসপাতালে রাজ্যের মুখ্যসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় ও পুলিশ কমিশনার অনুজ শর্মাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন শেষকৃত্যের কাজ সম্পন্নের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য। নিজেও বেলা একটার আগেই ছুটে গিয়েছিলেন বেসরকারি হাসপাতালে।


 কথা বললেন কিংবদন্তি অভিনেতার কন্যা পৌলমী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। সৌমিত্রের শেষযাত্রার খুঁটিনাটি চূড়ান্ত করলেন। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রিয় অভিনেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গলাও বুজে এল। কোনওভাবে আবেগ সামলে বললেন, ‘গোটা বিশ্ব চলচ্চিত্র জগতের মহান প্রতিভাবান বরণীয় স্মরণীয় মানুষকে হারাল। তিনি যখন কোভিড আক্রান্ত হয়েছিলেন, তখন শেষ বারের মতো কথা হয়েছিল। প্রত্যেকে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আমরা তাঁকে ধরে রাখতে পারিনি। মৃত্য‍ু নির্মম হলেও বাস্তব। আজকের দিনে আমরা হারিয়েছি আমাদের এক চির ইতিহাসকে। যে জায়গায় সৌমিত্রদা পৌঁছেছিলেন সেখানে যেতে অনেক সংগ্রাম, অধ্যবসায় লাগে।’


বিকালে রবীন্দ্র সদন চত্বরে ভিনপথের মানুষকে শেষশ্রদ্ধা জানিয়ে অন্তিমযাত্রায় পা মেলালেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর শরীরী ভাষাই বলে দিচ্ছিল, প্রিয়জনকে হারানোর বেদনায় ভারাক্রান্ত মন। তবুও রবীন্দ্র সদন থেকে কেওড়াতলা মহাশ্মশান পর্যন্ত হাঁটলেন তিনি। এই মিছিলেই মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে পা মেলাতে দেখা গিয়েছিল বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু, সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্রদের। কার শেষ যাত্রায় ডান-বাম নেতাদের এক সঙ্গে পা মেলাতে দেখা গিয়েছে, তা মনে করতে পারছেন না প্রবীণ মানুষও। 


কেওড়াতলা শ্মশানে পৌঁছেই দায়িত্ব শেষ করেননি মুখ্যমন্ত্রী। প্রিয় অভিনেতার অমৃতলোকে যাত্রা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলেন। অথচ রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল পর্যন্ত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ঘনিষ্ঠ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। পালাবদলের পরে  মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রথম দিকে কিছুটা দূরত্ব রেখেই চলছিলেন অপুর সংসারের নায়ক। কিন্তু সেই দূরত্ব ঘুচিয়েছিলেন মমতা। মতাদর্শের ফারাক থাকলেও ‘বামপন্থী’ সৌমিত্রবাবুকে ‘মহানায়ক’ কিংবা ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করতে দ্বিধা দেখাননি ডানপন্থী মুখ্যমন্ত্রী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দু’জনের সম্পর্কের রসায়নও বদলেছিল। চলচ্চিত্র উৎসবের সমাপ্তি অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে বইমেলার উদ্বোধনে একসঙ্গে দেখা গিয়েছিল মমতা ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে। অতীত ভুলে সৌমিত্রবাবুর দিকে বারেবারে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সেই বৃত্তই সম্পূর্ণ হল তাঁর শূন্যতায়।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only