শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২০

হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের নিরিখে নেতাজি



‘‘মানুষের শ্রেষ্ঠ পরিচয় প্রেমে--- এই প্রেম যত বড়, মানুষ তত বড়। সুভাষচন্দ্রের দেশপ্রেম- তাহার কি তুলনা আছে? স্বামী বিবেকানন্দ ইহাকে জ্ঞানে– কর্মে র‍ূপ দিতে চাহিয়াছিলেন, সুভাষচন্দ্র ইহাকে জ্ঞানেও নয়, ধ্যানেও নয়, তাহার নিঃশ্বাস বায়ুর‍ূপে পাইয়াছিলেন।’’ - (‘জয়ত নেতাজি’- মোহিতলাল মজুমদার/ সুভাষ স্মৃতি-বিশ্বনাথ দে, পৃঃ- ২৪২)। 


নেতাজির আধ্যাত্মিক গুরু স্বামী বিবেকানন্দ এবং তাঁর রাজনৈতিক গুরু দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ছিলেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মূর্ত প্রতীক। স্বামীজির এই অনন্য সাধারণ চরিত্র গৌরবের পরাকাষ্ঠা তাঁরক্ষীর ভবানীমন্দিরে কাশ্মীরি মুসলিম কন্যাকে কুমারীর‍ূপে পুজো করার ঘটনায় (১৮৯৮) আর দেশবন্ধুর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিবোধের মহত্তম প্রকাশ তাঁর ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’-এ (১৯২৩) যেখানে চাকরি ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে অবহেলিত মুসলিমদের সুবিচার দেওয়া হয়েছিল। 


প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সুভাষচন্দ্র তাঁর গুরুর এই অসাধারণ উদ্যোগকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিলেন। অবশ্য এর সুফল সংখ্যালঘুরা সেভাবে ভোগ করতে পারেনি। কারণ ১৯২৩ সালে এই প্যাক্ট সম্পন্ন হয়েছিল, আর ১৯২৫ সালে তাঁর মৃত্য‍ুর পর কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ এই প্যাক্টকে বাতিল ঘোষণা করেন। যাই হোক, আমরা সবাই জানি যে, আজাদ-হিন্দ-ফৌজে নেতাজি সব সম্প্রদায়ের মানুষকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে বেঁধেছিলেন। সে কথায় পরে আসব। এখন আমরা দেখব, দেশত্যাগের আগে নেতাজির লেখায়স বক্তৃতায় ও কার্যাবলিতে এই ভাবাবেগের কোনও প্রকাশ ঘটেছে কি না।


নেতাজি মুসলিম আমলে ভারতীয় সাংস্কৃতিক ঐক্যানুভূতির কথা উল্লেখ করে তাঁর ‘ভারতীয় সংগ্রাম’ পুস্তকে লিখেছেনঃ ‘‘মুসলমানদের আগমনে ভারতে এক নূতন সমন্বয় সৃষ্টি হতে আরম্ভ করে। মুসলমানরা হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেনি, কিন্তু এই দেশের জনতার সামাজিক জীবনে পরস্পরের সুখ-দুঃখ সমভাবে গ্রহণ করেছে। পারস্পরিক সহযোগিতায় গড়ে উঠেছে এক নূতন শিল্প ও সংস্কৃতি --- যা অতীত থেকে অনেকাংশে পৃথক হয়েও সম্পূর্ণ ভারতীয় স্থাপত্যে, চিত্রকলায়, সঙ্গীতে দুইটি সাংস্কৃতিক ধারায় সুসঙ্গমে নতুন সৃষ্টি গড়ে উঠেছে।’’- (সূত্রেঃ ‘নেতাজির দৃষ্টিতে ভারতের ঐক্য ও জাতীয়তা’- সমর গুহ/ ‘নেতাজির স্বপ্ন ও সাধনা’- পৃঃ ৩৭-৩৮)। 


১৯২৪ সালে দেশবন্ধু কলকাতার মেয়র নির্বাচিত হন। আর তিনি তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত তরুণ সুভাষচন্দ্রকে দিলেন কর্পোরেশনের প্রধান প্রশাসকের দায়িত্ব। সুভাষ কী করলেন? ‘‘চিত্তরঞ্জন দাসের বেঙ্গল প্যাক্ট অনুযায়ী বহু শূন্যপদ যোগ্য মুসলমানদের দিয়ে ভর্তি করেন, যদিও কলকাতার শিক্ষিত হিন্দু সমাজ এটা ভালো চোখে দেখেননি এবং এর জন্য সুভাষচন্দ্রকে বেশ সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়। উল্লেখ্য, এ ব্যাপারে তিনি সম্পূর্ণ সমর্থন পান মহাত্মাজির কাছে। যিনি অনেক ব্যাপারেই সুভাষের সঙ্গে ভিন্নমত ছিলেন।’’- (প্রশাসক সুভাষচন্দ্র বসু জন্ম শতবার্ষিকী স্মারকগ্রন্থ- পৃঃ ১৮৫)। 


এ প্রসঙ্গে গান্ধিজি লিখেছিলেন, ‘আমি লক্ষ্য করলাম যে কলকাতা কর্পোরেশনের ৩৩টি শূন্যপদে নিয়োগের সময় কর্পোরেশনের প্রধান প্রশাসক ২৫টি পদেই যোগ্য মুসলমানদের নিয়োগ করেছেন। যার জন্য তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন। আমি সুভাষচন্দ্রের বিবৃতিও পড়েছি। তার এই কাজ সত্যিই প্রশংসনীয়।’- (ইয়ং ইন্ডিয়া- ৩১ জুলাই– ১৯২৪)। উল্লেখ্য, স্বাধীন ভারতের প্রশাসন কেমন হওয়া উচিত- এ সম্পর্কে সুভাষচন্দ্র বারবার তাঁর সুচিন্তিত মতামত ব্যক্ত করেছেন তার বিভিন্ন লেখায়। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রধর্ম বলে কিছু থাকবে না, রাষ্ট্র সমস্ত ব্যক্তির, গোষ্ঠীর ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংস্কৃতি স্বাধীনতাকে রক্ষা করবে। দেশের সর্বস্তরের মানুষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার সমানভাবে ভোগ করবে।- (নির্বাচিত ভাষণ সংগ্রহ-১ম খন্ড/সুভাষচন্দ্র বসু— সূত্রঃ ঐ মঞ্জু চট্টোপাধ্যায়- পৃঃ ১৯০)।


সিরাজদৌল্লা বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব। স্বামী বিবেকানন্দ তরুণ নবাবের স্বাধীনতা স্পৃহার প্রশংসা করেছিলেন। সুভাষচন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল? আমরা জানি নবাবের চরিত্র কলঙ্ক লেপনের জন্যই ইংরেজ ‘হলওয়েল মনুমেন্ট’ স্থাপন করেছিল। নেতাজি একে জাতীয় অপমান বলে মনে করেছিলেন। তিনি ঘোষণা করেন, ১৯৪০ সালের ৩ জুলাই এই হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ করা হবে। ২৯ জুনের ‘ফরওয়ার্ড’ পত্রিকায় এক স্বাক্ষরিত প্রবন্ধে সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন, ‘ঢাকার প্রাদেশিক সম্মেলন হলওয়েল মনুমেন্ট উৎখাত করার সংকল্প গ্রহণ করেছে। সে সংকল্প কার্যে পরিণত করার দায়িত্ব আমাদের। ১৯৪০-এর তেসরা জুলাই সমগ্র বাংলায় ‘সিরাজদৌল্লা দিবস’ পালিত হবে। 


বাংলার শেষ স্বাধীন নরপতি সিরাজদৌল্লার স্মৃতি আমরা ওইদিন পুজো করব। হলওয়েল মনুমেন্ট শুধু নবাব সিরাজদৌল্লার স্মৃতিকেই মসিলিপ্ত করেনি, পরন্তু বিগত দেড়শত বৎসর ধরে সমগ্র জাতির অবমাননার সাক্ষ্য হয়ে কলকাতার বুকের উপর দাঁড়িয়ে আছে সগৌরবে। আজ আমাদের এর চিহ্ন পর্যন্ত মুছে ফেলতে হবে। আমাদের অভিযান শুরু হচ্ছে আগামী তেসরা থেকে। আমি সিদ্ধান্ত করেছি, প্রথম দিনের বাহিনী পরিচালনা করব নিজে।’ (‘সুভাষ ঘরে ফেরে নাই’- শ্যামল বসু, পৃঃ-৪৯)। ২ জুলাই সুভাষচন্দ্রকে গ্রেফতার করা হয়, আন্দোলন স্থগিত হয়ে যায়। পরে অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হক ঘোষণা করেন, ‘হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারিত করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অবিলম্বে ওটাকে অন্য কোথাও সরিয়ে দেওয়া হবে।’’- (ঐ, পৃঃ- ৫১)। 


এখানে আর একটি বিষয় উল্লেখ্য, যা তাঁর অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের পরিচয়বাহী। সুভাষচন্দ্র কংগ্রেসের সভাপতি থাকার সময়ে (১৯৩৮) কংগ্রেস সদস্যদের হিন্দু মহাসভা ও মুসলিম লিগের সদস্য হওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। কারণ ওই সংগঠনগুলি তখন আগের থেকে বেশি সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে শ্যামাপ্রসাদের লক্ষ্য ছিল হিন্দু মানসিকতার ভিতরে রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদী চিন্তার অনুপ্রবেশ ও সেই চেতনাকে মুসলিম বিদ্বেষে পরিণত করা। ফলে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর তীব্র নীতিগত বিরোধ বাধে। তিনি শ্যামাপ্রসাদ এবং হিন্দু মহাসভার সাম্প্রদায়িক রাজনীতির তীব্র বিরোধিতা করেন। সেটা এতটাই আপসহীন ছিল যে, শ্যামাপ্রসাদ তাঁর ডাইরিতে লিখছেনঃ ‘সুভাষচন্দ্র আমার সঙ্গে দেখা করেন এবং বলেন, হিন্দু মহাসভা যদি বাংলায় রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে মাথাচাড়া দিতে চায়, তবে সেটা জন্মের আগেই গুঁড়িয়ে দিতে বাধ্য হব। যদি বলপ্রয়োগ করতে হয়, তবে সেটাই করব। ‘(দ্রঃ সম্পাদক সমীপেষু- ‘নীতিগত বিরোধ’- ইন্দ্রজিৎ মিত্র/ আনন্দবাজার- ৭.৭.২০২০)।


আজাদ হিন্দ ফৌজের ভিত্তি ছিল অনুপম স্বদেশ প্রেম ও উদার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। এখানে আমার আইএনএ-র মেজর জেনারেল শাহনওয়াজ খানের স্মৃতিচারণ স্মরণ করিঃ ‘‘ধর্ম সম্বন্ধীয় বা প্রাদেশিক ভেদাভেদ কিছুমাত্র ছিল না। এসব তিনি আমলই দিতেন না। হিন্দুু, মুসলমান, শিখ--- সবাইকে তিনি সমচোখে দেখতেন এবং তাঁর এই ভাবই সমগ্র আদাজ-হিন্দ-ফৌজকে অনুপ্রাণিত করেছিল। প্রত্যেকেরই নিজ নিজ ধর্মমত অনুসারে উপাসনা করার অধিকার ছিল। আমরা উপলব্ধি করেছিলাম ভারতের ধর্মগত বা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বিদেশিদেরই সৃষ্টি। নেতাজির শ্রেষ্ঠ অনুরাগীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন মুসলমান। জার্মান থেকে টোকিও আসার বিপদসঙ্কুল পথে তাঁর সঙ্গী ছিলেন এক মুসলিম তরুণ আবিদ হাসান। তাঁর দু’জন ডিভিশনাল কমান্ডারই ছিলেন মুসলিম--- মেজর জেনারেল এম জেড কিয়ানি এবং আমি। ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে তিনি যখন শেষবার টোকিও যাত্রা করেন, তখন তাঁর সঙ্গী ছিলেন কর্নেল হাবিবুর রহমান।’ (নেতাজিকে যেমন দেখেছি’- শাহনওয়াজ খান/ সুভাষ স্মৃতি’- বিশ্বনাথ দে– পৃঃ ৮৪-৮৫)। 


ভারত বিভাগ নেতাজি কখনও সমর্থন করেননি। তাঁর বিভিন্ন বক্তৃতায় এবং রচনায় তিনি এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। এখানে তাঁর একটি ভাষণের অংশ বিশেষ উদ্ধৃত করছিঃ ‘বন্ধুগণ ও স্বদেশবাসীগণ, আপনারা সকলেই জানেন যে, গান্ধিজি ও মি. জিন্না বোম্বাইতে হিন্দু-মুসলমান সমস্যা লইয়া আলোচনা করিতেছেন এবং এমনকী লিগের পাকিস্তানের দাবি মানিয়া লইয়া গান্ধিজী লিগের সহিত সমঝোতায় আসিতে প্রস্তুত। ইহা নিবারণ করিতে হইলে আমাদিগকে এই মুহূর্তে কাজে নামিতে হইবে। পূর্ব এশিয়ায় আমরা ভারতীয়রা আজ স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ ভারতের জন্য সংগ্রাম করিতেছি। সুতরাং আমরা ভারতকে বিভক্ত করার ও তাহাকে টুকরো টুকরো করার সকল প্রয়াসের বিরোধিতা করব। আমি লিগ কিংবা তাহার খ্যাতকীর্তি নেতার বিরোধী নই। কিন্তু আমি আমাদের মাতৃভূমি দ্বিখণ্ডিকরণের পাকিস্তান পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করি। আমি ভারতের লক্ষ লক্ষ মুসলমান যুবককে প্রশ্ন করি– আপনারা কি মাতৃভূমি দ্বিখন্ডিকরণের শরিক হইবেন? বিভক্ত ভারতে আপনাদের অবস্থা কি হইবে? আমাদের দেবতাস্মা মাতৃভূমিতে খন্ডিত করা চলিবে না।’’--- ১২ সেপ্টেবর– ১৯৪৪ ব্রহ্মদেশ হতে প্রদত্ত বেতার ভাষণের অনুবাদ)।


আমাদের দুর্ভাগ্য, স্বাধীন ভারতে আমরা, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব ভারতবাসীর বরেণ্য নেতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মূর্তিমান আদর্শ সুভাষচন্দ্র বসুর গতিশীল নেতৃত্বের অমৃত পরশ পেলাম না! 

লেখকঃ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ   

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only