সোমবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২০

করোনা-যুদ্ধে অনন্য ভূমিকায় রাজ্য সরকার



জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে লকডাউন পর্ব চলছে দেশজুড়ে। অনেক আগে থেকেই মারণ ভাইরাসের প্রকোপ দেখা দেওয়ার পর বয়সের কারণে বাইরে বের হওয়া একেবারেই কমিয়ে দিয়েছিলাম। বাইরে বের হলেও সরকারি নির্দেশ মেনে মাথা, নাকমুখ ঢাকা দিয়ে প্রায় মহাকাশচারীর মতো সেজে বের হতাম। অত সাবধানতা অবলম্বন করেও পরিবারের অন্য সদস্যের মাধ্যমে সংক্রামিত হয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলাম। 


গত ১৬ জুলাই বুকে সিটি স্ক্যান করতে বললেন চিকিৎসক। যে রিপোর্ট এল তাতে দেখা গেল, মাত্র ২৪ ঘণ্টাতেই ফুসফুসে ভালোরকম ছড়িয়ে পড়েছে ভাইরাস। ১৭ জুলাই করোনা টেস্ট করে ফল এল পজিটিভ। চিকিৎসককে পরীক্ষা করাতে গিয়ে ধরা পড়ল, অক্সিজেনের মাত্রাও ঈষৎ কম, নিম্নগামী। চিকিৎসক বললেন, বাড়িতে থাকা ঝুঁকির হয়ে যাবে, হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যাওয়াই ভালো।  সেই সময় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে হাসপাতালের করোনা-চিকিৎসা নিয়ে নানারকম নেতিবাচক খবর বের হচ্ছিল, ইতিবাচক খবরও ছিল। 


কী করব, এমন চিন্তার মাঝেই রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্যবিভাগ থেকে ফোন এল বাড়িতে। নিয়মমতো কেউ করোনা পরীক্ষা করালে তার রিপোর্ট সরকারি পোর্টালেও চলে যায়। স্বাভাবিকভাবেই কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্যবিভাগের কাছেই খবর চলে যায়, কার রিপোর্ট পজিটিভ হয়েছে। স্বাস্থ্যভবন থেকেই বলা হল, অবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে আপনাকে। তারপরই এল কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যবিভাগের ফোন। তাঁরা জানতে চাইলেন, হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা হচ্ছে কিনা। রাজ্য স্বাস্থ্যভবনের ফোনের কথা তাদের জানানো হল।


পরমুহূর্তেই বাড়িতে ফোন এল স্থানীয় বিধায়ক এবং মন্ত্রী অর‍ূপ রায়ের। তিনি স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে তাঁকে আশ্বস্ত করে জানিয়ে দিলেন যে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফুলেশ্বরের সরকার অধিগৃহীত কোভিড হাসপাতাল সঞ্জীবনে আমার ভর্তির ব্যবস্থা হচ্ছে এবং সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে করেই সেখানে নিয়ে যাওয়া হবে। তখনও বাড়িতে আশঙ্কা করা হচ্ছে, হাসপাতালে সিরিয়াস করোনা রোগীর সংস্পর্শে গিয়ে হিতে বিপরীত হবে না তো? 


এইসব কথা ভাবতে ভাবতেই অ্যাম্বুলেন্স এসে গেল বাড়ির দোরগোড়ায়। হাসপাতালে গিয়ে দেখলাম, গিজগিজ করছে আক্রান্ত, অসুস্থ রোগী, যাদের ৯৫ ভাগ সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। তাঁদের সুস্থ করতে ডাক্তার এবং নার্সরা যেন যুদ্ধ করে চলেছেন। ডাক্তাররা সারারাত জেগে বেডে বেডে রোগীদের হাল-হকিকতের খোঁজ নিচ্ছেন। আমার বেডের সামনে অক্সিজেন সিলিন্ডার দাঁড় করিয়ে রাখা হল রাতভর। আর একজন নার্স বারবার এসে জিজ্ঞাসা করছিলেন, আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে কিনা।


করোনা আক্রান্ত রোগীদের পুষ্টির বিষয়টি নজর দিতে সকালে প্রত্যেক রোগীকে পাউরুটি, কলা এবং সিদ্ধ ডিম, চা, বিস্কিট, দুপুরে ভাত, ডাল, সবজির তরকারি, মাছ এবং দই, বিকেলে মুড়িছোলা বা ঝালসুজি, চা-বিস্কিট, রাতে ভাত বা রুটি, ডাল, তরকারি, মাছ বা চিকেন বা ডিমের ঝোল দেওয়া হত। আক্রান্ত হয়ে বুকটা অসম্ভব ভারী লাগছিল, কাশি হলেই ভয় লাগত, শরীরের তাপমাত্রাও ছিল বেশি। ওই হাসপাতালে ওষুধের গুণে পঞ্চম দিনেই মনে হলে বুকের সেই ভার একেবারেই উধাও। জ্বরও চলে গেল। হাসপাতালে সবচেয়ে ভালো লেগেছিল ডাক্তার এবং নার্সদের আন্তরিকতা। 


সব ডাক্তারই তরুণ এবং কেউ করোনা রোগীদের অচ্ছুৎ মনে করে দূর থেকে চিকিৎসা করেননি। বরং প্রত্যেকের গায়েপায়ে হাত দিয়ে বারবার পরীক্ষা করতেন, বন্ধুর মতো সকলের সঙ্গে কথা বলতেন। যার যা জিজ্ঞাস্য তার সমুচিত উত্তর দিতেন। তাঁরা বলতেন, গত তিনমাস কেউ বাড়ি যাননি, হাসপাতালেরই আবাসনে থেকে করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে শামিল হয়েছেন।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only