বুধবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২০

দেশভাগে বন্ধ হয়ে যাওয়া ৫৫০ বছরের পুরনো মসজিদ মুসলিমদের ফিরিয়ে দিলেন শিখরা



পুবের কলম প্রতিবেদকঃ১৯৪৭ সাল। হিন্দুস্থান বিভক্ত হল ভারত ও পাকিস্তানে। অনেকেই খুশওয়ান্ত সিংয়ের ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’ হয়তো পড়েছেন। তাতে রয়েছে সেই খণ্ডচিত্রগুলি, যেখানে ভারতীয় পঞ্জাব থেকে লক্ষ লক্ষ মুসলমান সব কিছু ছেড়ে শুধুমাত্র প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন পাকিস্তানে। ট্রেনই একমাত্র পরিবহণ। কারণ কেউ যে হেঁটে বা গাড়িতে করে সীমান্তের ওপারে যাবে তার জো নেই। কারণ তলোয়ার ও বন্দুক হাতে দাঙ্গাকারীরা সব সময় এই অসহায় মানুষগুলির ওপর হত্যালীলা চালানোর জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে। প্রহরী পুলিশ থাকলেও ট্রেনেও হামলার হাত থেকে রেহাই পায়নি। 

অন্যদিকে, আবার ওপার থেকেও হিন্দু ও শিখরা বাঁচার তাগিদে হাজারে-হাজারে চলে আসে এপারে। এদের ক্ষেত্রেও সেই একই মর্মন্তুদ কাহিনি। ভারত ভাগ হওয়ায় সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় পঞ্জাব ও বাংলা। হরিয়ানাও তখন পঞ্জাবের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভারতের পঞ্জাব থেকে প্রায় সমস্ত মুসলমানরাই ওপারে চলে যেতে বাধ্য হন। 

এই দেশান্তরের ঘটনায় হাজার-হাজার মসজিদ পঞ্জাব ও হরিয়ানায় বিরান হয়ে পড়ে। শত-শত মসজিদ দখলও করে নেওয়া হয়। সেখানে পবিত্র এই মসজিদগুলিতে বসবাস, দোকান বা অন্য কাজে ব্যবহার করা হতে থাকে। কোথাও কোথাও বর্ষীয়ান শিখরা আল্লাহ্র ঘর মসজিদের মর্যাদা বিবেচনা করে সেখানে তালা লাগিয়ে দেন, যাতে অন্য কেউ মসজিদের বেহুরমতি করতে না পারে। 

এরপর কেটে গেছে বহু বছর। দাঙ্গার আঁচ, ঘৃণা বিদ্বেষ,পারস্পরিক খুনখারাবির স্মৃতি ক্রমশ বিলিন হচ্ছে। যা হয়েছে তা নিয়ে এখন অনেকে মর্মাহত। 

লক্ষ্য করা গেছে, এ-ব্যাপারে ভারতের শিখ ধর্মাবলম্বীরা পুরনো দুঃখদায়ক ঘটনার যথাসম্ভব প্রতিকারে সবথেকে এগিয়ে। এমনকী, এ-বিষয়ে মুসলমানদেরও তারা বহু যোজন পিছিয়ে দিয়েছে। 

যদিও একমাত্র মালের কোটলা ছাড়া পঞ্জাবের আর কোথাও গণহারে মুসলিমরা নেই। সকলেই পাকিস্তানে চলে গেছেন কিন্তু ভারতের অন্যান্য প্রদেশ থেকে গত বিশ-পঁচিশ বছরে বহু মুসলিম পঞ্জাব ও হরিয়ানার শহরগুলিতে চাকরি, ব্যবসা বা মজদুরিতে ফিরে এসেছেন। 

কিন্তু এখন বিগত কয়েকবছর ধরে দেখা হচ্ছে, পঞ্জাবের শিখরা ওয়াকফ বোর্ড কিংবা স্থানীয় মুসলিমদের হাতে দখলকৃত মসজিদ ফিরিয়ে দিচ্ছেন। 

সম্প্রতি এমনই এক ঘটনায় সুলতানপুরের লোধিটাউনে ৫৫০ বছর পুরনো একটি ঐতিহাসিক মসজিদ স্থানীয় মুসলিমদের হাতে তুলে দিয়েছে শিখ সম্প্রদায়। ১৯৪৭ সালের পর থেকে এই মসজিদটি খুবই জরাজীর্ণ অবস্থায় বিরান পড়ে ছিল। শুধু ফিরিয়ে দেওয়াই নয়। শিখ সম্প্রদায় এই মসজিদটিকে পুরোপুরি মেরামত করে দিয়েছে। 

অগ্রণী পদক্ষেপ নিয়ে শিখ সম্প্রদায় সংস্কার করায় মসজিদটিতে নামায আদায় করার জন্য স্থানীয় মুসলিম, আলেম ও সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দকে আমন্ত্রণ করেন যে, ‘আপনারা মসজিদটি পুনরায় উদ্বোধনের দিনটিতে এখানে আসুন এবং আল্লাহর কাছে ‘শুকরানা’ নামায আদায় করুন।’ সুলতানপুরের এই মসজিদটি নানা দিক থেকে ইতিহাস বিখ্যাত। শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরু নানক এই মসজিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন এবং লোধিটাউনের এই মসজিদের সঙ্গে তাঁর বেশ কিছু স্মৃতি রয়েছে। তৎকালীন স্মৃতিকথা থেকে জানা যায় যে, গুরু নানকদেব স্বয়ং এই মসজিদে নামায আদায় করেছেন। গুরু নানকের ৫৫০ বছর জন্মপূর্তি উদ্যাপন উপলক্ষে শিখ সম্প্রদায় এই মসজিদটিকে মুসলিমদের প্রার্থনার জন্য খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। শিখ ও মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এই মসজিদের ভেতরে বসে ধর্মীয় ঐক্যর বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেন। শুক্রবার মসজিদটি পুনরায় খুলে দেওয়ার পর এখানে জুম্মার নামায অনুষ্ঠিত হয়। এই নামাযকে ‘শুকরানা নামায’ বলে অভিহিত করা হয়।

যারা এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন শিখদের ধর্মীয় নেতা সন্ত সুখদেব সিং এবং সন্ত বলবিন্দর সিং। মুসলিমদের থেকে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামি হিন্দের পঞ্জাব শাখার প্রেসিডেন্ট আবদুস শাকুর। পঞ্জাবের মুসলিম প্রধান শহর মালেরকোটলা থেকেও বহু মুসল্লি নামাযের জন্য এখানে উপস্থিত হন। মালেরকোটলা গুরদোয়ারার জ্ঞানী অবতার সিং বলেন, ‘একটি সুন্দর অনুষ্ঠানে হাজির হলাম। এই অনুষ্ঠানটি শিখ এবং মুসলিম সকলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মসজিদটি এজন্য খোলাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, স্বয়ং গুরু নানকদেব এখানে নামায পড়েছিলেন।’ জামায়াতে ইসলামি হিন্দের আবদুস শাকুর বলেন, ‘এই মসজিদটি ছিল স্থানীয় একটি দুর্গের ভেতর। আর ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর এটি বন্ধ হয়ে যায়। গুরু নানকদেব এই শহরে ১৪ বছর কাটিয়েছিলেন। তাঁর মুসলমানদের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। মুসলিম এবং শিখদের রয়েছে অভিন্ন বন্ধুত্বপূর্ণ ইতিহাস। 

পঞ্জাবের মুসলিম নেতৃবৃন্দ বলছেন, শিখরা বিগত বেশ কয়েকবছর ধরে মুসলিমদের প্রার্থনাস্থল মসজিদগুলো যেভাবে ফিরিয়ে দিচ্ছেন, তা আন্তঃধর্মীয় সম্পর্কের উন্নতি করবে এবং তা অশেষ প্রশংসার দাবি রাখে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only