শনিবার, ২১ নভেম্বর, ২০২০

কথাশিল্পী আবদুর রাকিবের স্বতন্ত্রতার সৌরভ

 

কথাকার আবদুর রাকিব শুনিয়েছিলেন শাশ্বত জীবনের মরমী গল্প৷ গ্রাম-বাংলার জীবনের দৈনন্দিন যাপনের প্রকৃত আলেখ্য তিনি তুলে ধরেছিলেন পাঠকের সামনে৷ পার্থিব কোনও সম্মানের কাছে মাথা নোয়াননি৷ আপস করেননি অন্যায়, অশ্লীলতার সঙ্গে৷ আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে স্মরণ করছেন  পাভেল আখতার 


যেকোনও সৃজনশীল কর্মের সার্থকতা কোথায় ?সাহিত্য, সঙ্গীত, অঙ্কন কিংবা চলচ্চিত্র---সৃষ্টিপ্রবাহের বহুবিধ ধারা কোন খাতে বইলে তা নান্দনিক ও অর্থপূর্ণ হতে পারে ? এককথায় বলতে গেলে, যা মানুষের হৃদয়কে আন্দোলিত, রোমাঞ্চিত ও অনুপ্রাণিত করে তোলে, সেই সৃষ্টিই নান্দনিক, অর্থপূর্ণ ও সার্থক । কবি-সাহিত্যিক বা শিল্পী তো আর তাদের সৃষ্টিকর্মকে একান্ত গোপনীয়তায় মুড়ে রাখেন না, তাকে সর্বসমক্ষে প্রকাশ করেন, মৃত্যুর পর প্রকাশিত হলেও সৃষ্টির নেপথ্যে প্রচ্ছন্ন থাকেই মানুষের সানন্দ-সমাদর প্রত্যাশা ! অতএব, যিনি তাঁর মেধা ও প্রতিভার আলোয় একান্ত আত্মগত অনুভূতি ও ভাবনা বিচ্ছুরিত করছেন, তা মানুষের মনে প্রভূত আনন্দ দেয় ও হৃদয়ে আলোড়ন তোলে কেবল তখনই যখন তার সাথে মানুষ নিবিড় একাত্মতা অনুভব করে । 'আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে'--ভারতচন্দ্র লিখিত অমর এই পংক্তিটি আপাত-সারল্যে গুরুগম্ভীর গবেষকের চিত্তকে হয়তো তৃপ্ত করবে না, কিন্তু আপামর সাধারণ মানুষের চোখ দুটি অশ্রুসজল হয়ে ওঠে এর শাশ্বত ও অমলিন আবেদনে । এখানেই সার্থক সৃষ্টির সাধনা ।



বাংলা সাহিত্যের বর্তমান অঙ্গনে চোখ মেলে তাকালে আজ যে কথাটি অনিবার্য হয়ে ওঠে তা হ'ল, উপন্যাস, ছোটগল্প ইত্যাদি কম তো লেখা হচ্ছে না ; কিন্তু, পাঠকচিত্তকে সেসব কতটা মুগ্ধ-অভিভূত ও আন্দোলিত করতে পারছে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায় । সেসব 'কালোত্তীর্ণ' হওয়া তো দূরের কথা । এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন ওঠে, 'কালোত্তীর্ণ সাহিত্য' বলতে ঠিক কী বোঝায় ? তারাশঙ্কর তাঁর সাহিত্যকর্মে তৎকালীন যে সমাজব্যবস্থার ছবি তুলে ধরেছেন, তার অস্তিত্ব কি এখন আর বর্তমান আছে ? বিভূতিভূষণ যে প্রেক্ষাপটে অপু-দুর্গার অমলিন শৈশবকে এঁকেছিলেন, সেই প্রেক্ষাপট কি আর দৃশ্যমান ? তবুও, তারাশঙ্করের 'কবি', 'হাঁসুলিবাঁকের উপকথা', কিংবা বিভূতিভূষণের 'পথের পাঁচালি' পাঠকের হৃদয়কে আজও আবেগমথিত করে তোলে । উদাহরণ বাড়িয়ে লাভ নেই । এই যে কালের সীমা অতিক্রম করে পাঠকের হৃদয়কে জয় করতে পারা, সেটাই খুব সহজভাবে বললে কালোত্তীর্ণ সাহিত্যের অভিজ্ঞান । বস্তুত, সাহিত্যের মধ্যে অন্তর্লীন হয়ে থাকা মানবিক আবেদন কিংবা শুভ চেতনার কোনও মৃত্যু নেই--এই আবেদন ও চেতনার অবিনশ্বরতাই সাহিত্যকে কালোত্তীর্ণ করে । নইলে, ধরা যাক অপুর কথাই--কতকাল আগে তার অমর সৃষ্টি হয়েছিল, নিশ্চিন্দিপুরের মতো এক প্রত্যন্ত গ্রামে, যে নিশ্চিন্দিপুর আর নেই, তার মতো আর গ্রামই হয়তো নেই, নেই সেই অবিকৃত গ্রামীণ জীবনচর্যা, তবুও বাঙালি আজও অপুর মধ্যেই খুঁজে ফেরে তার আত্মার প্রতিধ্বনি ! এ কোনও ঘোর নয়, অকারণ মোহ বা আসক্তি নয়, এ হ'ল সাহিত্যিকের গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখার ফসল হিসেবে মানুষের সুকুমার হৃদয়টিকে যুগ ও কালের সীমা ছাড়িয়ে চিনতে পারা, যার সাথে মানুষ একাত্ম হতেই থাকবে--যুগ-যুগান্তরে, কাল-কালান্তরে ! মূলত, সামন্ততান্ত্রিক গ্রামবাংলার সমাজ-প্রতিবেশে আবর্তিত শরৎচন্দ্র বা তারাশঙ্করের গল্প-উপন্যাস তো আজ অপাঠ্য হওয়া উচিত ছিল, সেই সমাজ-পরিকাঠামো আর বর্তমান না-থাকায় ; কিন্তু, বিস্ময়করভাবে আজও তাদের সাহিত্য সম্ভবত বিপুলভাবে পাঠ্য । এর কারণই হল, সাহিত্যের সজীব উপাদান যে মানুষ, তার মানবিক আবেদনটুকু পরিবর্তিত যুগ ও সমাজ-পরিকাঠামোকেও অতিক্রম করে যায় ! আর, ওইখানেই তাঁরা 'কালজয়ী' !



'দাবি' করা হয়--আজকের সাহিত্য নাকি 'নগ্ন বর্তমান'কে একেবারে জীবন্ত করে তোলে--সেখানে নাকি কোনও 'আড়াল' নেই ; যদিও এই দাবির সারবত্তা নিয়ে বা তাকে জনপ্রিয়তার মাপকাঠি মনে করা নিয়ে অনেক প্রশ্ন ওঠে । তবুও কিছুক্ষণের জন্য সেই প্রশ্নকে সরিয়ে রেখে জিজ্ঞেস করা যায়---তাহলে, তা ব্যাপক পাঠপ্রিয়তা বা পাঠকপ্রিয়তা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে কেন ? শুধুই মানুষের পাঠাভ্যাসের ঘাটতির কথা বললে, সেটা হবে এক সরল সমীকরণ । বরং, এর পরিবর্তে ভাবা উচিত যে, ঠিক কোন উপাদানের অভাবে এই করুণ পরিস্থিতি । তবে হ্যাঁ, একথাও ঠিক যে, 'সময়'-কে ছুঁতে না-পারলে প্রকৃত 'লেখক'ও আবার হয়ে ওঠা যায় না । 'সাহিত্যিক' হতে গেলে তো তার চেয়েও আরও কিছু 'মহিমা'র প্রয়োজন হয় । অথচ, কত অনায়াসে চারপাশের অনেক লেখকই 'সাহিত্যিক' পরিচয়ে পরিচিত হয়ে ওঠেন ! তো, 'সময়কে ছোঁয়া' বলতে কী বোঝায় ? মানুষ যখন কাঁদছে তখন তার পাশে দাঁড়াতে বলেছিলেন এক কবি । একজন লেখক কীভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াবেন ? তার শব্দ দিয়ে, বাক্য দিয়ে ; যে শব্দ-বাক্য কিন্তু নিদারুণ বাস্তবকে এড়িয়ে সুখময় কল্পরাজ্যের শব্দ-বাক্য নয়, একেবারে 'মূর্তিমান সময়'-কে কেটে-ছেনে হাজির করা শব্দ-বাক্য । বস্তুত, সমাজের প্রতি, মানুষের প্রতি, সর্বোপরি ওই সময়ের প্রতি দায়বদ্ধতা ছাড়া সত্যিকারের লেখক হওয়া যায় না । তবে, সময়কে ছুঁতে গিয়ে যে 'আড়াল' না-রাখার কথা শ্লাঘার সঙ্গে বলা হয়, সেকথাটি নিতান্ত অসার । কারণ, আড়াল রাখা কিংবা না-রাখা প্রকাশভঙ্গির অন্তর্গত, তার সঙ্গে সময়ের অনুরণনের কোনও সম্পর্ক নেই । অবশ্য প্রকাশভঙ্গিকে শৈল্পিক ও ধ্রুপদী করতে গেলে, যা কালোত্তীর্ণ সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য, উল্লিখিত 'আড়াল'টি যে রাখতেই হবে তা অনস্বীকার্য । 



সময়ের অনুরণন আর কালোত্তীর্ণ লেখা যা-ই বলা হোক-না-কেন, লেখার জন্য পড়তে হয়--এই কথাটিও নতুন নয় । কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প যা-ই হোক । উদীয়মান লেখকদের এই কথাটি বিশেষভাবে মনে রাখা বাঞ্ছনীয় । অতীতের বিখ্যাত লেখক থেকে সমকালীন প্রতিষ্ঠিত লেখকদের লেখাও পড়তে হবে । ইদানিং একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, অল্প কিছুদিন লিখেই বই প্রকাশের তীব্র ইচ্ছে । অর্থাৎ, নিদারুণ প্রচারপ্রিয়তা । এই 'অপগুণ'টা একজন  উদীয়মান লেখককে একথা ভুলিয়ে দেয় যে, 'সাহিত্য' হ'ল একটি শ্রমনিবিড় সাধনা । প্রয়াত কথাশিল্পী আবদুর রাকিব ( জন্ম : ১৬ মার্চ, ১৯৩৯ ; প্রয়াণ : ২১ নভেম্বর, ২০১৮ )-এর কথা মনে পড়ে । কী অসম্ভব শ্রম ও সাধনার কথা শুনিয়েছিলেন তিনি ! নিজেকে নিজেই কীভাবে 'গড়ে' নিতে হবে সেকথা অপূর্ব ভঙ্গিতে বলেছিলেন, তাঁর অসামান্য সব ছোটগল্পের মতোই । মনে রাখতে হবে, অল্প আয়াসে বাজিমাত করতে চাইলে অল্প দিনেই ফুরিয়ে যেতে হবে ! আবদুর রাকিবের কথা যখন উঠলই তখন বলা যাক, 'সাহিত্যে মুসলিম সমাজের ছবি'--এই কথাটিকে যদি সঠিক তাৎপর্যসহ মূল্যায়ন করতে হয় তাহলে বলতে হবে, সেই ছবি যে মুষ্টিমেয় কয়েকজন সাহিত্যিক যথার্থরূপে এঁকেছেন তাঁরা হলেন--সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ, আবদুল আজীজ আল-আমান, আবদুল জব্বার, আবদুর রাকিব এবং সোহারাব হোসেন । অধুনা যে কয়েকজন লিখছেন তাঁদের অবস্থানটা অনেকটা এই সমাজের ভিতরে 'বহিরাগত অতিথি'র মতো ; সে যতই তাঁরা মুসলিম সমাজেরই সদস্য হোন-না-কেন । তাঁরা শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মানসিকতা থেকে বৃহত্তর গ্রামীণ মুসলিম সমাজকে যেভাবে দেখার চেষ্টা করছেন, সেই দেখার ফলশ্রুতি হিসেবে তাঁদের সাহিত্যে আরোপিত, অতএব অনেকটাই কৃত্রিম ও খণ্ডিত মুসলিম সমাজজীবন চিত্রিত হচ্ছে । প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের দ্বারা দূর থেকে মুসলিম সমাজকে দেখার যে প্রবণতা তার প্রভাব থেকে মুক্ত হতে না-পারার জন্যেও এই করুণ পরিণতির যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে । নিজের চোখ দিয়ে নিজের সমাজকে দেখতে না-পারলে এবং সততার সঙ্গে যথার্থ সমাজচিত্র অংকন করতে না-পারলে অন্তত এই দাবি করা উচিত নয় যে, সেখানে 'মুসলিম সমাজ' চিত্রিত হয়েছে ! উদীয়মান মুসলিম সাহিত্যিকদের জন্য যথেষ্ট 'পথের সম্বল' আছে উপরে উল্লিখিত খ্যাতনামা মুসলিম সাহিত্যিকদের সৃজনশীলতার মধ্যে । 



আবদুর রাকিব শুধু সাহিত্যিক ছিলেন না, ছিলেন একজন কথাশিল্পী । কথাটিকে একটু ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন । বস্তুত, একটু আগে যে 'সময়ের অনুরণন'-এর কথা বলা হচ্ছিল, তাকে আরেকটি শব্দবন্ধে প্রকাশ করা যায়, তা হ'ল--'চলমান জীবনের ধারাভাষ্য'। সঠিক হলেও অবশ্য কথাটা অসম্পূর্ণ । তার সঙ্গে যোগ করতে হবে, চলমান জীবনের ধারাভাষ্য বর্ণনা এবং প্রদীপ্ত ভবিষ্যতের স্বপ্ন-নির্মাণের এক শৈল্পিক প্রক্রিয়ার নাম সাহিত্য । হ্যাঁ, ঠিক তাই । কুয়াশায় দিকভ্রষ্ট পথিকের কথাই শুধু লেখার মাধ্যম সাহিত্য নয়, বরং সেই কুয়াশা সরিয়ে তার সামনে উদ্ভাসিত আলোর সংকেত রচনা করাই সাহিত্য । বাস্তবের কঠিন মাটি থেকে সাহিত্য রসদ সংগ্রহ করলেও তার দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে আকাশের বিস্তৃত পটভূমিকায় । পাথরের বুক চিরে জলধারা বের করে আনতে তো সাহিত্যই পারে ! শব্দচয়ন ও বাক্যগঠনের ধ্রুপদী সুষমায় সংশ্লেষিত হয় গভীর ও মরমী জীবনবোধের সেইসব আখ্যান । আর এতসব যিনি করেন তাঁকে আমরা 'সাহিত্যিক' বা আরও প্রসারিত ব্যঞ্জনায় 'কথাশিল্পী' বলি । এই প্রেক্ষাপটে আবদুর রাকিবকে অনায়াসেই একজন সার্থক কথাশিল্পী বলা যায় । তারাশঙ্করের জন্মভূমি বীরভূমের প্রত্যন্ত একটি জনপদে ( এদরাকপুর, মুরারই ) আমৃত্যু জীবন অতিবাহিত করা প্রচারবিমুখ এই কথাশিল্পী'র সৃষ্টিপ্রবাহ সম্পর্কে অনেকেই হয়তো খবর রাখেন না । কারণ, প্রতিষ্ঠিত ও বৃহৎ সাহিত্যগোষ্ঠী বা সাহিত্য-প্রতিষ্ঠান তাঁর প্রতি কোনও দিনই 'সুবিচার' করেনি । কেন করেনি সে প্রসঙ্গে পরে আসছি । কিন্তু এই যে উপেক্ষা, তার ফলে বৃহত্তর পাঠকসমাজ তাঁর অসামান্য ও হৃদয়গ্রাহী সব ছোটগল্পে পরিবেশিত অনন্য জীবনরসের তুমুল সুখকর পাঠ-অভিজ্ঞতা ও ঋদ্ধ হওয়া থেকে বঞ্চিত হলেন ! তিনি ছিলেন মূলত গ্রামের প্রান্তজনের কথাকার, যাদের বিত্ত নেই, কিন্তু চিত্তের সৌন্দর্য আছে ; তিনি সেই সৌন্দর্যকে শিল্পরূপ দিয়েছেন তাঁর ছোটগল্পে । শুধুই ছোটগল্প ( 'প্রতিকূলে একজন', 'বাদশাহ ও বাবুই বৃত্তান্ত' ) নয় ; যারা তাঁর অনুবাদ, মৌলিক প্রবন্ধ ( 'সংগ্রামী নায়ক মওলানা আবুল কালাম আজাদ', 'আল কুরআনের উপমা ব্যঞ্জনা' ) আত্মজৈবনিক রচনা ( 'পথ-পসারীর পত্রোত্তর' ), জীবনচরিতরচনা ( 'চারণকবি গুমানী দেওয়ান' ) ইত্যাদি নানা স্বাদের বর্ণময় গদ্যপাঠের সৌভাগ্য অর্জন করেছেন তারা জানেন যে, কী অপূর্ব মরমী, মায়াময় ও শৈল্পিক তাঁর গদ্য ! ফুলের সুবাস মেশানো তাঁর শব্দচয়ন ও বাক্যগঠন এত অমোঘ ও সুনির্বাচিত যে, সত্যিই অভিভূত না-হয়ে পারা যায় না ! বাহুল্যবর্জিত নির্মেদ গদ্য তো বটেই, তাঁর শৈলীও একেবারে স্বতন্ত্র ও মৌলিক ! তাঁর গদ্যকে অবলীলায় 'রাকিবীয় গদ্য' বলা যায় । আর ওই যে ভূমিকায় সাহিত্যের ধ্রুপদী স্বরূপ সম্পর্কে যা বলছিলাম, তার প্রতি সারা জীবন নিবিষ্ট ছিলেন এই 'সাধক' গদ্যশিল্পী । ব্যক্তিগত জীবনে ইসলামের শাশ্বত মূল্যবোধে বিশ্বাসী এবং তার নিষ্ঠাবান অনুসারী আবদুর রাকিব তাঁর সমগ্র সাহিত্যকর্মে যে মানবিক মূল্যবোধ প্রোথিত করতে চেয়েছেন, তার প্রেরণার উৎসও মূলত ইসলামের চিরন্তন ও বিশ্বজনীন আদর্শ । তাঁর সৃজনশীলতা একটিও অশ্লীল শব্দে কখনও কলুষিত হয়নি । সুন্দরের পূজারী এই কথাশিল্পী সম্ভবত তাঁর ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস নিয়ন্ত্রিত জীবনচর্যার জন্যই বৃহৎ সাহিত্য-প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্রাত্য ছিলেন ! নইলে বহু লেখক-লেখিকা, যাদের লেখা সমাজ ও সভ্যতাকে আরও সুন্দর, আরও পরিচ্ছন্ন করার পরিবর্তে ধ্বংস করার উপাদানে ভরপুর এবং শেষ বিচারে সেসব সাহিত্য-পদবাচ্য না-হয়েও, তারপরও তারা বৃহৎ সাহিত্য-প্রতিষ্ঠানের বদান্যতায় কীভাবে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন ? আজ এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে সোচ্চারে 'সৎ ও সৃজনশীল সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক'(?) বলে প্রচারক তথাকথিত বৃহৎ সাহিত্য-প্রতিষ্ঠানগুলিকে । পাশাপাশি, সেইসব মুসলিম লেখকদেরও এই আত্মসমীক্ষা করতে হবে যে, জাগতিক খ্যাতির মোহে তাঁরা যেভাবে 'আত্মবিসর্জন' দিচ্ছেন, তা কতটা আত্মসম্মানের ? আবদুর রাকিবকে তাঁর প্রত্যয় বিলুপ্ত করে 'আত্মবিসর্জন' দিতে হয়নি । কারণ, তিনি সাহিত্যকে আপনমনে সৃষ্টির আনন্দে পরিতৃপ্ত হওয়ার নিছক একটি উৎস হিসেবে দেখতেন, যা কেবল শিল্পীর গভীর আত্মমগ্নতার বোধ থেকে উঠে আসে । তখন জাগতিক খ্যাতির মোহও তার কাছে তুচ্ছ হয়ে যায় । তিনি সামান্য পার্থিব মূল্যে তাঁর 'আত্মসম্মান' বিক্রি করতে চাননি । 

আবদুর রাকিব পেশায় ছিলেন স্কুলশিক্ষক । একজন শিক্ষকের ভূমিকা কখনও তাঁর সত্তাকে অতিক্রম করে যায় না ; তিনি যা-ই করেন সেখানেই শিক্ষার একটি ধারা বহমান থাকে । আবদুর রাকিব সেই বিরল প্রজাতির কথাশিল্পী, যিনি সুন্দর মানুষ ও সুন্দর সমাজের নির্মাণে সেইসব চিরন্তন শিক্ষার দিকে আমাদের আরেকবার আহ্বান করে গিয়েছেন, আমাদের ঘুমন্ত বিবেক ও চেতনার সমুদ্রে ঢেউ তুলে, অসাধারণ মমত্ববোধ থেকে । নির্মোহ বা নৈব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাংলা কথাসাহিত্যের সামগ্রিক মূল্যায়ন যেদিন হবে, সেদিন আবদুর রাকিবকে কোনওভাবেই দূরে সরিয়ে রাখা যাবে না--সাহিত্যমূল্যের দিক থেকেও, স্বতন্ত্র ও মৌলিক গদ্যশৈলীর দিক থেকেও । আমরা 'বঙ্কিমী-গদ্য'র কথা বলি, তাঁর লেখাকেও অনায়াসে 'রাকিবীয় গদ্য ' বলা যায় । লেখক তো অনেক আছেন, কিন্তু ক'জন এভাবে নিজস্ব স্টাইল তৈরি করতে পেরেছেন ? কালোত্তীর্ণ সাহিত্যের স্রষ্টা কথাশিল্পী আবদুর রাকিব-এর জীবন ও সৃষ্টিসাধনা শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার বস্তু ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only