শনিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২০

মুসলিমদের ঘর ও ফ্ল্যাট না দেওয়া প্রসঙ্গে কী বললেন বিশিষ্টজনেরা ? পড়ুন



বিশেষ প্রতিবেদনঃমুর্শিদাবাদ জেলার সদর শহর বহ্রম্পুর।শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত জর্জকোট।তার পাশেই রয়েছে কিষাণ ঘোষ লেন।এখানে নির্মাণ হচ্ছে একটি আবাসন।সেখানে মুসলিমদের কাছে ফ্ল্যাট বিক্রি এবং ঘর ভাড়া দেয়া যাবেনা বলে 'ফরমান জারী' করেছে এক শ্রেণীর প্রোমোটর এবং একটি স্থানীয় ক্লাব।এই ঘটনার তীব্র নিন্দা এবং ঘটনায় দোষীদের উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানিয়েছেন রাজ্যের বিশিষ্টজনেরা।বিশিষ্টজনদের মতামত নিয়েছেন সাংবাদিক আবদুল ওদুদ।

 

ছোটন দাস, মানবাধিকার কর্মীঃ



মানুষের মনে বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। আরএসএস এবং সংঘ পরিবার এবং দিল্লি ওয়ালারা পরিকল্পিতভাবে পশ্চিমবাংলায় এই বিদ্বেষকে হাতিয়ার করে ভোটে জিততে চাইছে। তারা বিভিন্ন ক্লাব, ধর্মীয় সংগঠন, গণসংগঠনকে কাজে লাগাচ্ছে। মানুষকে ঘৃণা শেখাচ্ছে। এর বিরুদ্ধে ধর্ম নিরপেক্ষ মানুষদের রুখে দাঁড়াতে হবে। বহরমপুরে মুসলিমদের ফ্ল্যাট ভাড়া কিংবা কেনা নিষেধ নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে তা অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ। যে ক্লাবটি সামনে আছে, খোঁজ নিয়ে দেখুন সেটি ক্লাব নয়। বিদ্বেষ ছড়ানোর জন্য ওই ক্লাবটিকে ব্যবহার করছে দিল্লি ওয়ালারা। মুর্শিদাবাদ সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা। এখানে বিদ্বেষ ছড়িয়ে মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করতে চাইছে বিজেপি, আরএসএস, সংঘ পরিবার। এখানে দীর্ঘদিন ধরে সকলে মিলে মিশে বসবাস করে আসছেন এতদিন কোনও সমস্যা হয়নি। আজ কেন হঠাৎ এমন অভিযোগ উঠছে? আমি মনে করি সমস্যা তৈরি করা হচ্ছে, পরিকল্পিতভাবে।  আমাদের স্পষ্ট করতে হবে, পরিকল্পিত মদদ ছাড়া স্থানীয় ক্লাব এই কাজ করতে পারে না। আমি মনে করি সাধারণ মানুষকে এই বিষ গেলানো হচ্ছে। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য যে, বিজেপিকে নির্বাচনে জেতানোর জন্য কোনও মুসলিম নেতা, সংগঠন বিজেপির হয়ে কাজ করে চলেছে। এটা লজ্জার কথা। 

ওয়ায়েজুল হক, সভাপতি, বঙ্গীয় সংখ্যালঘু বুদ্ধিজীবী মঞ্চঃ



বহরমপুরের ঘটনা কোনও অবস্থাতেই ফেলে দেওয়া যায় না। স্বাধীন ভারতে যেকোনও জায়গায় বসবাস করার অধিকার রয়েছে। এটা সংবিধান স্বীকৃত অধিকার। এই অধিকার হরণ করার ক্ষমতা কারও নেই। এই বাংলার বুকে এই ধরনের ঘটনা ভাবতেই পারি না। তার পরেও বলব সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলা মুর্শিদাবাদে কোনওমতেই ফেলে দেওয়া যায় না। এর বিরুদ্ধে আমাদের সংগঠন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে অভিযোগ জানাবে। তিনি জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের জন্য কাজ করেন। যারা এই ঘটনায় জড়িত তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাব। 

সুবোধ সরকার, বিশিষ্ট কবিঃ



গত বৃহস্পতিবার পুবের কলম পত্রিকায় বহরমপুরে মুসলিমদের ফ্ল্যাট ও ঘরভাড়া দেওয়া নিয়ে যে খবর প্রকাশিত হয়েছ্‌ তা দেখে হতাশ হলাম। আমি মনে করি এই ঘটনা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। আমি স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করব। মুর্শিদাবাদ জেলার মতো জায়গায় এই ধরনের ঘটনা কখনোই কাম্য নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে এটি গুজরাত কিংবা যোগীর রাজ্য উত্তরপ্রদেশ না এটি বাংলা। এখানে হিন্দু-মুসলিম এক সঙ্গে বসবাস করে আসছে। আর তার জন্যই সম্প্রীতির বাংলা। আমি প্রশাসনের কাছে দাবি জানাবো, এই ঘটনাকে ইস্যু করে অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে। এই বাংলায় সকলের বসবাসের অধিকার রয়েছে। কাজেই বলব, বহরমপুরে যে ঘটনাটি ঘটেছে, তা কোনওমতেই কাম্য নয়।

সুজাত ভদ্র, মানবাধিকার কর্মীঃ



যারা এই ধরনের কাজ করছে তা অত্যন্ত ঘৃণ্যজনক। হিন্দু-মুসলিম বলে নাগরিকত্ব হয় না। এ দেশের প্রত্যেকের বসবাস করার অধিকার রয়েছে। কোনও নাগরিককে এইভাবে কেউ বঞ্চিত করতে পারেন না। দেশে যে ঘৃণ্য ও বিদ্বেষের রাজনীতি শুরু হয়েছে তারই এটি প্রতিফলন। একজন নাগরিক যেখানে খুশি বসবাস করতে পারেন। যা খুশি খেতে পারেন। তার এই দেশে অধিকার রয়েছে। আমি মনে করি, এ ব্যাপারে পুলিশের হস্তক্ষেপ করা উচিত। যে সমস্ত প্রোমোটার বা ক্লাব মুসলিমদের ফ্ল্যাট কিনতে বাধা দিচ্ছে তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করুন রাজ্য প্রশাসন। আর বলব, এই ধরনের ঘটনা আরও জনমতে প্রচার করা উচিত। এর ফলে মানুষ জানতে পারবে দেশে কী ধরনের ঘৃণ্য রাজনীতি চলছে। আমি একজন মানবাধিকার কর্মী হিসেবে বহরমপুরে মুসলিমদের ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়া কিংবা মুসলিমরা ফ্ল্যাট কিনতে পারবে না, যে ফরমান জারি হয়েছে তার তীব্র নিন্দা জানিয়ে উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।

মাওলানা সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরিঃ



বহরমপুরে প্রোমোটর এবং স্থানীয় ক্লাব যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার তীব্র বিরোধিতা করছি। এই ঘটনা গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত লজ্জার। বহরমপুরে যে প্রোমোটর এই সিদ্ধান্ত নিয়েছ্‌ তার এটি ভুল পদক্ষেপ। যদি এই রকম চালু হয়, তাহলে হিন্দুরাও ও মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় ফ্ল্যাট পাবে না। মুসলিমরা এই দাবি তুলবে, এটাই স্বাভাবিক। এরফলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ তৈরি হবে। যদি বহরমপুরে এই ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে দোষীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তি দাবি করছি। 


খাজিম আহমেদ, বিশিষ্ট লেখকঃ



২০১৪ সালের পর থেকে তামাম হিন্দুস্থানি অপ্রতিরোধ্য এক ব্রাহ্মণবাদী সাম্প্রদায়িকতা পুরো শাসনতন্ত্র গোটা দেশকে গ্রাস করেছে। তার ফলশ্রুতিতে মুর্শিদাবাদ জেলায় যেহেতু কঠোরভাবে একেশ্বরবাদী ইসলামধর্মীদের বসবাস, তাই ঘোরতর সাম্প্রদায়িকবাদীরা সেই জেলায় অপেক্ষাকৃত কিঞ্চিত অর্থনীতিক ক্ষেত্রে উন্নত মুসলমানদেরকে শহরের জীবনযাপনে সুযোগ দিতে চায় না। তারা চায় এই মুসলমান সম্প্রদায় নিম্নশ্রেণির গ্রামীণ পরিবেশে বসবাস করুক এবং গ্রামীণ পরিবেশে কাজকর্ম করে বেঁচে থাকুক। শহরের জীবনের স্বাচ্ছন্দে, শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞানবিজ্ঞানের শিক্ষার সুযোগ তারা দিতে চায় না। এই সমস্ত প্রোমোটরকে ব্যবহার করছে আরএসএস। তাদের স্পষ্ট কথা, ইসলাম ধর্মী লোকদের কাছে ফ্ল্যাট বিক্রি কিংবা ঘর ভাড়া দেওয়া যাবে না। আমি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানাচ্ছি। 

মুহাম্মদ সেলিম, সিপিএম নেতাঃ



আগে মুম্বই,হরিয়ানা,বেঙ্গালুরুতে দেখা যেত মুসলিমদের ঘরভাড়া দেওয়া হচ্ছে না। পশ্চিমবাংলায় এই ধরনের ঘটনা ভাবনার মধ্যে ছিল না। বর্তমানে কলকাতায় এই ধরনের ঘটনা সামনে আসে। এখন সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলায় খোদ বহরমপুরের মুসলিমদের ফ্ল্যাট পেতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এই ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি বলব, জেলা প্রশাসনের উচিত এ ব্যাপারে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ কর। জেলা প্রশাসনের উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা। ঘৃণা এবং বিভাজন কোন স্তরে যাচ্ছে? আজকে যারা বলছে, ভাড়া দেব না, কালকে তারা বলবে রোগী দেখব না। তারপরে বলবে পড়াব না। আমি মনে করি এটি বিভাজনের রাজনীতি। সম্প্রীতিকে নষ্ট করে ঘৃণা ভরে দিচ্ছে। ভীতি সঞ্চার করা হচ্ছে পরস্পরের মধ্যে। এখনও যাঁরা সম্প্রীতি বিশ্বাস করে সেই সমস্ত মানুষদের এগিয়ে আসতে হবে। এই ধরনের নষ্টামি গোড়ায় মারতে হবে। 

মাওলানা শফিক কাসেমী, ইমাম নাখোদা মসজিদঃ



বহরমপুর শহরের মুসলিমদের ফ্ল্যাট এবং ঘরভাড়া নিয়ে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে এই ঘটনার আমি তীব্র নিন্দা জানচ্ছি। যেসব প্রোমোটার এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের সকলকে গ্রেফতার করা উচিত। এদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিক জেলা প্রশাসন। আমি জেলা প্রশাসনের কাছে দাবি জানাচ্ছি কেবলমাত্র এই বিষয়টি নয়, যারা এই ধরনের বিদ্বেষী কাজ করবে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা প্রয়োজন। মুর্শিদাবাদ জেলা প্রশাসনের কাছে আমার অনুরোধ এই ঘটনার তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only