রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২০

দিল্লি দাঙ্গার জের ? ৮ মাস পরেও প্রতিবেশীদের হেনস্থায় অল্প দামে বাড়ি বিক্রিতে বাধ্য হচ্ছেন মুসলিমরা



বিশেষ প্রতিবেদনঃ প্রায় আট মাস আগে উত্তর-পূর্ব দিল্লির ভয়ংকর দাঙ্গায় পরিকল্পিতভাবে মুসলিম নিধন তাদের বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়। সেই দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্তরা পরবর্তীতে ধ্বংসস্ত(পে পরিণত হওয়া বাড়িতে ফিরে এলেও ফের তাদের বাড়ি ছাড়তে হচ্ছে। নানাভাবে প্রতিবেশী হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজন তাদের উত্ত্যক্ত করছে সাম্প্রদায়িক কটূক্তির মাধ্যমে অপদস্থ করা হচ্ছে প্রকাশ্যে। তাই তারা বাধ্য হয়ে বাড়ি ছাড়ছেন। একমাস আগে ১৪ বছর বয়সি ফিজার পরিবার শিব বিহারে থাকা তাদের বাড়ি বিক্রি করতে বাধ্য হয় নিরাপদ স্থানে সরে যাবার জন্য। কোভিড-১৯ অতিমারির মধ্যেও তারা অন্য জায়গায় পালিয়ে গেছে তা-ই নয় শুধু সম্পত্তি বিক্রি করার সময়ও তারা ন্যায্য মূল্য পায়নি। হাতে ও ভাতে মারার পরিকল্পনা করা হয়েছে তাদের। ২০১০ সালে কেনা বাড়িটির বাজার মূল্য প্রায় ২০ লক্ষ টাকা। অথচ তারা পরিস্থিতির চাপে পড়ে মাত্র ১২ লক্ষ টাকাতেই বাড়িটি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। শিব বিহারে তারা নিজেদের জীবনকে নিরাপদ মনে করছেন না বলেই ৮ লক্ষ টাকা কমে তারা বাড়িটি বিক্রি করেছেন।

ফিজার মা নাসরিন (নাম পরিবর্তিত) জানাচ্ছেন দাঙ্গার পর থেকে আশপাশের প্রতিবেশীরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেও তারা সমস্যা সৃষ্টি করছে। রাস্তায় মুসলিমদের দেখলেই ওরা ‘করোনা ভাইরাস’ বলে বিদ্র*প করছে ও মুখ ঢাকছে। আমাদেরকে ‘দাঙ্গাকারী’ বলে উত্ত্যক্ত করছে এবং বিরিয়ানি খাওয়া নিয়েও অবমাননামূলক কথাবার্তা বলছে। ফিজা শিব বিহারের ওই বাড়িতেই বড় হয়েছে। তার পরিবার বাড়ি ছাড়ায় সে হতাশ হয়েছে। কারণ এখানেই তার বন্ধুরা রয়ে গেল। অথচ সে যখন চলে যাচ্ছিল বাড়ি ছেড়ে কেউ তাকে বিদায় জানাতে এগিয়ে আসেনি। ফিজার কথায় ওরা এমনভাবে আচরণ করছিল যেন আমাদের চেনেই না। আমরা একসঙ্গে হোলি খেলেছি। ঈদ পালন করেছি। টিউশন গিয়েছি একসঙ্গে। কীভাবে ওরা সবকিছু ভুলে গেল। ওরা আমাদের মুখের সামনে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। আসলে সাম্প্রদায়িকতা যে কত ভয়াবহ তা নিষ্পাপ মনে ঠাহর করতে পারেনি ফিজা। দিল্লির দাঙ্গার পর সেটাই দেখল সে।          

ফিজার পরিবারের মতো ৩৬ বছর বয়সি ইরফান ৪ লক্ষ টাকা ক্ষতিতে তার সম্পত্তি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। দাঙ্গার সময় এই বাড়িটিও লুঠ করেছিল উন্মত্ত দাঙ্গাবাজরা। শিব বিহার থেকে পালিয়ে গিয়ে তারা এখন প্রাণে বেঁচে থাকতে চাইছেন শুধু। বাড়ির শিশুরা দাঙ্গার পর থেকেই আতঙ্কগ্রস্ত। বাড়ির বাইরেও আসতে ভয় পায় তারা। দাঙ্গার পর থেকে শিব বিহারের প্রায় ৫০টি পরিবার বাড়ি বিক্রির চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন এস্টেট এজেন্ট মুহাম্মদ রিজওয়ান। মূল্য কম হলেও কিছু করার থাকছে না দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলির। তবে শিব বিহার ছেড়ে মুসলিমদের চলে যাওয়ার প্রবণতাকে বন্ধ করতে চাইছেন ফারহানা খান। তিনি নিজেও একজন ভিকটিম। ফারহানারা কয়েকজন মিলে চেষ্টা করছেন প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার। মাগরিবের আযানের পর স্থানীয় কিছু ছেলে ‘জয় শ্রীরাম’ বলে চিৎকার করত। স্থানীয় পুলিশকে এ নিয়ে অভিযোগ জানালে এটি বন্ধ হয়েছে। এ ছাড়াও বেশকিছু গলির মুখে দরজার ব্যবস্থা করেছে হিন্দুরা। প্রায়শই দরজা বন্দ করে দিয়ে হিন্দু গেটকিপাররা মুসলিমদের আসা-যাওয়ায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। আমরা নিজেদের এলাকায় নিজেরাই ঢুকতে পারছি না অভিযোগ করছিলেন ফারহানা। হেনস্থা সত্ত্বেও তিনি এলাকার মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। মুসলিমদের বোঝাচ্ছেন আমরা নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে চলে যাব কেন? আমরা কী করেছি? এভাবে ভয় পেলে শিব বিহার একদিন মুসলিম-শূন্য হয়ে পড়বে আশঙ্কা ফারহানার।         


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only