রবিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২০

ভিন্ন উদাহরণও কিন্তু রয়েছে বাংলায়, নজির রয়েছে বহরমপুরেও

পাঁশকুড়া:শাহনাজ বেগমের বাড়ি



রাবিয়া বেগম, বহরমপুর:­ যে বহরমপুর শহরে শুধুমাত্র মুসলিম হওয়ার কারণে ফ্ল্যাট বিক্রির আগাম টাকা নিয়েও হুমকির মুখে তা ফেরত দিতে বাধ্য করার ঘটনা সামনে এসেছে। সেই বহরমপুর শহরে কিন্তু ভিন্ন চিত্রও রয়েছে। বাড়ির মালিক মুসলিম হয়েও হিন্দু পরিবারকে ভাড়া দিতে আপত্তি করেন না। এমনকী, ব্যবসার জন্য অমুসলিমদের ভাড়া দেন নির্দ্বিধায়।

শুধু বহরমপুর নয়, পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র এমন চিত্র দেখতে পাওয়া যাবে। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পাঁশকুড়া শহরের কনকপুর এলাকায় মুসলমি বাড়িতে শান্তিতে ভাড়া থাকেন এক অমুসলিম আইনজীবী। এমনকী সেই বাড়িতে ঠাকুরঘর প্রতিষ্ঠা করে ঠাকুর স্থাপন করা হয়েছে। নিয়মিত শঙ্খ বাজিয়ে পুজো করা হয়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নজির তৈরি করেছেন এই মুসলিম বাড়িওয়ালা এবং হিন্দু আইনজীবী। 

পাঁশকুড়া থানার পাঁশকুড়া শহরের কনকপুর এলাকায় রয়েছে দোতলা বাড়ি। নিচের তলায় ভাড়া থাকেন কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী মধুসুদন রথ। দোতলায় থাকেন বাড়ির মালিক শাহনাজ বেগম, তার ছেলে, পুত্রবধূ। দুই তলাই দুই ধর্মের দু’টি বাঙালি পরিবার দু’বছর ধরে এক সঙ্গে বাস করছেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কোনও অশান্তি নেই। বরং দুই পরিবারের মধ্যে আত্মীয়তা তৈরি হয়েছে। মধুসুদন বাবু তাঁর ভাড়া করা বাড়িতে একটি ঘরে কুলদেবতাকে রেখে ঠাকুরঘর বানিয়েছেন। শঙ্খ বাজিয়ে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালিয়ে নিয়মিত পুজো করেন। দোতলায় থাকা বাড়ির মুসলিম মালিকের তাতে বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী মধুসুদন রথ নিজেই জানিয়েছেন, ‘একসঙ্গে আমরা দু’টি পরিবার বাস করি। আমাদের কারো কোন অসুবিধা, আপত্তি নেই। বরং দু’বছর ধরে একসঙ্গে বাস করায় আত্মীয়তা তৈরি হয়েছে।’ এই বাড়ির বর্তমান মালিক শাহনাজ বেগম। শাহনাজ বেগমের স্বামী প্রয়াত হাবিবুর রহমান কৃষি দফতরে চাকরি করতেন। ওনার ছেলে স্কুলশিক্ষক এবং জামাই কলেজ শিক্ষক। শাহনাজ বেগম বলেন, ‘ভাড়া নিয়ে বাস করছেন মধুসূদনবাবু। তিনি তাঁর ধর্ম পালন করবেন তাতে আমি কেন আপত্তি করবো? আমাদের মধ্যে কোন সমস্যা নেই। 

বহরমপুর বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং জেলা-আদালতের সিনিয়র আইনজীবী আবু বাক্কার সিদ্দিকী। আবু বাক্কার সিদ্দিকী সাহেবের বাড়ি গোরাবাজার নিমতলার কাছে মহেন্দ্র মুখার্জি রোডে। শহরের ব্যস্ততম জায়গায় এই বাড়ির নিচের তলায় হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক ডা. আর এন ভট্টাচার্যের চেম্বার। বাড়ির মালিক জনাব আবু বাক্কার সিদ্দিকী। এদের মধ্যেও কোনও সমস্যা নেই। বরং রয়েছে মধুর সম্পর্ক। আবু বাক্কার সাহেবের অপর একটি তিনতলা বাড়ি বহরমপুরের মেছুয়া বাজারে। এই বাড়ির তিনতলায় সপরিবারে ভাড়া থাকেন অর্ধেন্দু ঘোষ। এখানেও মালিক মুসলিম, ভাড়াটিয়া হিন্দু। কিন্তু এদের মধ্যে কোনও সমস্যা নেই।

খোদ বহরমপুর শহরে মুসলিমদের ভাড়া বা ফ্লাট কেনার সময় শুধুমাত্র মুসলিম হওয়ার কারণে বায়না নেওয়ার পর টাকা ফেরত দেওয়া হয়। কোনও অমুসলিম বাড়িতে মুসলিমকে ভাড়া দেওয়া। কিন্তু বিপরীত নজির অর্থাৎ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উদাহরণ যেখানে মুসলিমরা অবলীলায় হিন্দুদের বাড়িভাড়া দিচ্ছেন রয়েছে এই বহরমপুরেই। আছে এই বাংলার অনেক জায়গায়।

কিন্তু মুসলিমদের ঘরভাড়া কিংবা হাউজিংয়ে ফ্লাট না দেওয়ার ঐতিহ্য বহরমপুর শহরে বহুদিন থেকে রয়েছে। ছিল কংগ্রেস আমলে এবং বাম শাসনেও। কিন্তু বহরমপুরের সাংসদ, লোকসভায় কংগ্রেস দলের নেতা অধীর চৌধুরির মতে, বহরমপুরে এই ধরনের কোনও সমস্যা নেই। বোধহয় ভুল বোঝা হচ্ছে। 

কিন্তু বহরমপুর-সহ বাংলার বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, ধর্মনিরপেক্ষ ভারত, বিশেষ করে পশ্চিমবাংলায় এই ধরনের ঘটনাকে ‘শাস্তিযোগ্য অপরাধ’ বলে বিবেচনা করতে হবে। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only