শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২০

আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে উত্তরবঙ্গের বক্সা পাহাড়ে ব্রিটিশ আমলের ডাকঘরটি



রুবাইয়া জুঁই,আলিপুরদুয়ারঃ­ রানার ছুটেছে তাই ঝুম ঝুম ঘণ্টা বাজছে রাতে/রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে ।সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার মতোই রানার আজও ছুটে চলছে খবরের বোঝা হাতে তবে তা উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ারের বক্সা পাহাড়ে। যেখানে ইতিহাস আজও ফিসফিস করে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মৃতিচারণে। নিউ আলিপুরদুয়ার স্টেশন থেকে মাত্র ৩৫ কিমি দূরত্বে অবস্থিত এই ব্রিটিশ আমলের ১১৩ বছরের ডাকঘরটি। চারিদিকে শাল,সেগুন,পাইনের বন আর অবিশ্রান্ত ঝিঁ-ঝিঁ’র ডাক। গাছের ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে লাজবন্তী মেঘ,আকাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ধুপি,ওক,বার্চ গাছের দল। আর নানান ধরনের অজস্র প্রজাপতির ঝাঁক তিরতির করে উড়ছে ওদের কোনও শধ নেই আছে শুধু মনমাতানো রঙ। উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলার বক্সা পাহাড়ের ডরাগাঁও গ্রামে অবস্থিত ১১৩ বছরের পুরনো হেরিটেজ ডাকঘরটি এই উন্নত প্রযুক্তির যুগেও চলছে রানারের ভরসায়। বক্সাদুয়ার মহকুমা গঠনের পর প্রশাসনিক কাজের সুবিধার জন্য ব্রিটিশরা এই ডাকঘর গড়ে তুলেছিলেন ১৯০৫ সালে। 

জানা গিয়েছে হেরিটেজ এই ডাকঘরের কর্মী বলতে মাত্র দুইজন। এদের মধ্যে পোস্টমাস্টার শ্রীজনা থাপা দেওগাঁও, নামনা,ডরাগাঁও,সেওগাঁও ও চলুং সহ ২৮ মাইল জুড়ে অবস্থিত বক্সার প্রায় ১৩টি গ্রামে চিঠি পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেন রানারের মতোই। গ্রামগুলোও তাকিয়ে থাকে কবে জন্ম,মৃত্যু,সুখ,দুঃখ তথা নতুন খবর নিয়ে আসবেন পোস্টমাস্টার দিদিমণি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় আড়াই হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই ডাকঘরের রানার চিঠি বোঝাই ব্যাগ কাঁধে নিয়ে পৌঁছে যায় বিভিন্ন পাহাড়ি গ্রামে। পাহাড় থেকে নামতে কষ্ট না হলেও চিঠির বোঝা কাঁধে নিয়ে পাহাড়ে উঠতে কষ্ট হয় খুব। তবে বর্ষাকালে সেই কষ্ট বেড়ে যায় আরও। 

ইংরেজ আমলে এই এলাকার বাসিন্দা বাটা ডুকপা, তাঁর ছেলে ছিড়িং ডুকপা এখানে রানারের কাজ করেছেন। ছিড়িং ৩৯ বছর ধরে এই পেশায় ছিলেন। দুইজনেই প্রয়াত হয়েছেন। ছিড়িংয়ের ছেলে পাশাং ডুকপা ৬ মাস কাজ করার পরে শ্রীজানা থাপার বাবা পুষ্পরাজ থাপা এই পোস্ট অফিসের পোস্ট মাস্টার হিসেবে নিযুক্ত হন। বাবার মৃত্যুর পরে ২০১১ সালের এপ্রিল মাস থেকে কালিম্পঙ সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক তরুণী শ্রীজানা থাপা এই পদে চাকরি পান। পাহাড়ি এই এলাকায় রানার ছাড়া কোনও গতি নেই, ফলে রোজ চিঠির বোঝা কাঁধে নিয়ে রানারকেই ছুটতে হয়। 

স্থানীয় বাসিন্দা হেমন্ত থাপা বলেন পাহাড়ের বাসিন্দাদের একমাত্র ভরসা এই ডাকঘর। বক্সা ডাকঘরের পিছনেই রয়েছে বক্সা দুর্গ ও বক্সা মিউজিয়াম। তিন হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ের মাথায় দুর্গম এই দুর্গটির ইট পাথরের পাঁজরে আজও জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস। ব্রিটিশ আমলে এই দুর্গেই বন্দি করে রাখা হত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের। বক্সা দুর্গের বন্দিদের উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একসময় চিঠি লিখেছেন। সেই চিঠি প্রথমে বক্সা ডাকঘরে আসে তারপর দুর্গে বন্দিদের কাছে পৌঁছায়। আজও দুর্গের প্রবেশপথে জ্বলজ্বল করছে সেই চিঠি। খাড়া পাহাড় ও গভীর জঙ্গলে ঘেরা দুর্গম বক্সা ফোর্ট একসময় পরিণত হয় কুখ্যাত জেলে। আন্দামানের সেলুলার জেলের পরে এটিই ছিল ব্রিটিশ ভারতের সব চেয়ে বড় কারাগার। ভুটান রাজা ভুটানের মধ্যে দিয়ে তিব্বত যাওয়ার প্রাচীন রেশম পথের পাহারায় কাঠ আর বাঁশের তৈরী এই আস্তানাটি ব্যবহার করতেন। পরবর্তীকালে কোচবিহারের রাজা এটিকে বৃটিশের হাতে নজরানা হিসেবে সমর্পণ করেন । ব্রিটিশরা কাঠ বাঁশের বদলে দুর্ভেদ্য পাথরের দেওয়াল তৈরি করে আর এটিকে জেলখানা হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে। সে কালে আন্দামানের সেলুলার জেলের মতই কুখ্যাত ছিল এই বক্সা ফোর্ট জেলখানা। প্রাকৃতিক অবস্থানজনিত কারণেই কয়েদিদের এখান থেকে পালানো ছিল দুঃসাধ্য। ১৯৩০-এর দশকে কৃষ্ণপদ চক্রবর্তীর মতো অনুশীলন সমিতি বা যুগান্তর গোষ্ঠীর বহু বিপ্লবী এখানে বন্দি ছিলেন। এমনকি লোকমুখে শোনা যায় পঞ্চাশের দশকে কমিউনিষ্ট কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কেও কিছুকাল এখানে বন্দি করে রাখা হয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only