শুক্রবার, ২০ নভেম্বর, ২০২০

‘আজাদি সংগ্রামের নায়ক তিতুমীরের মর্যাদাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে’: নারকেলবেড়িয়ায় শহিদ তিতুমীরের স্মরণে ঐতিহাসিক সভায় বক্তারা



ইনামুল হক, বসিরহাট­: সাইয়েদ মীর নিসার আলির শাহাদত-ভূমি হচ্ছে নারকেলবেড়িয়া। এই মহান বীর,আজাদি সংগ্রামের অগ্রনায়ক ও শহিদ,কৃষক নেতা ও সমাজ সংস্কারক তিতুমীরকে  এপার বাংলায় ক্রমশ বিস্মরিত হচ্ছে মানুষ। তাঁর ও তাঁর সহযোগীদের শাহাদত দিবস ১৯ নভেম্বর, ১৮৩১-এর দিনটিকে কেউই তেমনভাবে পালন করেন না। স্মরণ করেন না তিতুমীর ও তাঁর সহযোগীদের অসামান্য আত্মত্যাগকে। 

তবে ২০২০-র ১৯ নভেম্বর ছিল এই উপেক্ষার ইতিহাসকে ছাড়িয়ে একটু ভিন্ন ধরনের। 

এ দিন নারকেলবেড়িয়ায় মসজিদ সংলগ্ন মাঠে মন্ত্রী মাওলানা সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরির নেতৃত্বাধীন রাজ্যের জমিয়তে উলেমায়ে হিন্দের পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয়েছিল তিতুমীরের শাহাদত দিবস উপলক্ষে এই বিশাল জনসভার। উত্তর ২৪ পরগনার শুধু নারকেলবেড়িয়া বা হায়দারপুর নয়, বরং সমগ্র জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হন তিতুমীরের শাহাদত দিবস উপলক্ষে। 

মাওলানা সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরি ছাড়াও  উপস্থিত ছিলেন, পুবের কলম পত্রিকার সম্পাদক ও প্রাক্তন সাংসদ আহমদ হাসান ইমরান, বেলুড় মঠের স্বামী পরমানন্দ মহারাজ,বসিরহাটের বিশিষ্ট সমাজসেবী অসিত মজুমদার,ড. কুমারেশ চক্রবর্তী, পার্থ সেনগুপ্ত প্রমুখ। এই সভায় সভাপতিত্ব করেন উত্তর ২৪ পরগনার জমিয়তে উলেমায়ে হিন্দের সভাপতি মাওলানা দাউদ হাসান কাসেমী সাহেব। উপস্থিত ছিলেন তিতুমীরের বংশধরদের নবম পুরুষ সাইয়েদ মীর গুফরান আলিও। 

বৃহস্পতিবার তিতুমীরের স্মরণে নারকেলবেড়িয়ায় যে জমায়েত হল,তা সম্ভবত স্বাধীনতার পর আর দেখা যায়নি। আর স্বাধীনতার আগে তো ছিল ইংরেজ শাসন। তারা নিশ্চয় তিতুমীরের শাহাদত দিবস পালনকে উৎসাহিত করেনি। 

‘বীরকে বীরের সম্মান দিতে এসেছি। আমরা যখন ধরেছি, একটা কিছু হবে। এর আগে কোনও মন্ত্রী এই পুণ্যভূমিতে এসেছে কিনা জানি না। তবে আমরা বিনয় বাদল,দীনেশ,ক্ষুদিরামকে যেমন শ্রদ্ধা করি তেমনি শহিদ তিতুমীরকেও আমরা শ্রদ্ধা করি। তাঁরা যেমন স্মরণীয় হয়ে আছেন তিতুমীর কেন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন না?’ বৃহস্পতিবার উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়ার নারকেলবেড়িয়াতে শহিদ তিতুমীরের ১৯০তম শাহাদত দিবস উপলক্ষ্যে এক সভায় এমনই প্রশ্ন তোলেন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের রাজ্য  সভাপতি ও রাজ্যের গ্রন্থাগার ও জনশিক্ষা প্রসার মন্ত্রী মাওলানা সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরি। 

তিনি বলেন ‘যে জাতি ইতিহাসকে ভুলে যায়, ইতিহাসও তাদের ভুলে যায়। আর যারা ভোলে না তাদেরই জয় হয়। নির্যাতিত কৃষকদের জীবন ও জীবিকা রক্ষার জন্য নীলকর ইংরেজ ও জমিদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ছ’দিন ধরে বীরবিক্রমে লড়াই করে ১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর বীরের মতো মৃত্যুবরণ করেন তিতুমীর। তিনি জানতেন ইংরেজদের কামানের সামনে হয়তো জিতেতে পারব না। কিন্তু বাংলার মানুষকে এই শিক্ষা দিতে চেয়েছেন লড়াই করেই জিততে হয়। নিকট অতীতে তিতুমীরের এই আদর্শকে সামনে রেখে নন্দীগ্রামের জমিতে নেমে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ আন্দোলন করে জয়লাভ করেছে। সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরি বলেন, ‘জেলাশাসক থেকে প্রশাসন,শিক্ষা জগৎ কি পারে না তিতুমীরের আদর্শকে স্মরণীয় করে রাখতে? তিনি বলেন, এ বিষয়ে অবশ্য আমাদেরও দায়িত্ব পালন করতে হবে।’  তিনি দাবি তোলেন, ‘তিতুমীরের ওপর পাঠ্য বই রচিত হোক আমরা তা মক্তব-মাদ্রাসা ও স্কুলে পড়ানোর ব্যবস্থা করব। রাস্তার নামকরণের পাশাপাশি তাঁর জীবনী স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হোক।’

 এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য স্কুল পাঠ্য বইতে তিতুমীর সম্পর্কে অপ্রীতিকর বিষয় নিয়ে শহিদ তিতুমীর মিশন যে ভূমিকা নিয়েছিল, তা পূর্ণ সমর্থন করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। সরকার তরফে ওই বিতর্কিত অংশ বাদ দেওয়াার জন্য নির্দেশ জারি করা হয়। 

এ দিন ‘পুবের কলম’ পত্রিকার সম্পাদক আহমদ হাসান ইমরান বলেন ‘শাহাদত বরণের দিনটিতে তিতুমীরের শহিদ ভূমি নারকেলবেড়িয়ার হাজির হতে পারা আমার কােছ এক ঐতিহাসিক দিন। সাইয়েদ মীর নিসার আলি তিতুমীর ছিলেন ইসলামি স্কলার ও পবিত্র কোরআনের হাফেজ। তিনি ‘তরিকায়ে মোহাম্মদিয়া’ আন্দোলন শুরু করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন শির্ক-বিদায়ত বাদ দিয়ে মুসলিম সমাজ প্রকৃত নবী-প্রচারিত ইসলামের দিকে ফিরে আসুক। তিতুমীর যুদ্ধ চাননি। তৎকালীন জমিদার কৃষ্ণদেব রায়কে চিঠি লিখেছিলেন কৃষকদের ওপর অত্যাচার না করার জন্য এবং দাড়ি-কর, মসজিদ নির্মাণে কর,আরবি নাম রাখলে কর,জমিদারের তীর্থকর সহ নানা অন্যায় ট্যাক্স ও প্রথা তুলে দেওয়ার জন্য। এই জুলুমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য তিনি কৃষক ও নমঃশূদ্রদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেন। তিনি ডাকাত বা সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। সেই সময়কার গণমাধ্যম যে মিথ্যা ও কল্পিত কথা লিখে গেছে, তার ওপর ভিত্তি করে বর্তমান সময়েও শহিদ তিতুমীরের বিরুদ্ধে কুৎসা চলছে।’

আহমদ হাসান ইমরান আজাদি সংগ্রামের এই বিপ্লবী বীর শহিদকে পূর্ণ মর্যাদা দানের পাশাপাশি রাজধানী কলকাতায় তিতুমীরের নামে রাস্তা,নারকেলবেড়িয়ায় মিউজিয়াম,বাঁশেরকেল্লার মডেল ইত্যাদি স্থাপনের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। 

অধ্যাপক ড. কুমারেশ চক্রবর্তী বলেন ‘তিতুমীরের ইতিহাসকে বিকৃত করে দেওয়া হয়েছে। তাঁকে উপযুক্ত স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। ইসলাম প্রচারের পাশাপাশি তিনি সংগঠন করেছিলেন কৃষক দের দুঃখ দারিদ্র্য দূর করার জন্য। ’ 

বক্তব্য রাখেন বিশ্বকোষ পরিষদের সম্পাদক পার্থ সেনগুপ্তও। তিনি বলেন, ‘বাঁশেরকেল্লা যেন বুকের পাঁজর কেটে তৈরি হয়েছিল। ব্রিটিশ আমল থেকেই তিতুমীর সম্পর্কে ইতিহাস-বিকৃতি চলছে। এখন আবার নতুন করে তা শুরু হয়েছে। তিতুমীরের ইতিহাসকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। মানুষ তা মানবে না।’ এ দিন বক্তব্য রাখেন তিতুমীরের নবম বংশধর সৈয়দ গুফরান আলি। 

তিনি বলেন, ‘তিতুমীরের লড়াই থেকে শিক্ষা নিতে হবে। মানুষের ইনসাফের জন্য তিনি শহিদ হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর জন্মস্থান শাহাদত ভূমি এবং বংশধরেরা আজও অবহেলায় রয়েছে।’

এ দিন স্থানীয় শহিদ তিতুমীর মিশনের পক্ষ থেকে সম্পাদক রবিউল হকের নেতৃত্বে মুখ্যমন্ত্রীকে লেখা একগুচ্ছ দাবি দাওয়া সম্বলিত স্মারকপত্র মন্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। দেওয়া হয় ‘বঙ্গবীর তিতুমীর’ নামে একটি স্মারক গ্রন্থও। মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লাহ আশ্বাস দেন, নারকেলবেড়িয়ায় গ্রন্থাগার এর জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হবে। তিতুমীরের নামে নারকেলবেড়িয়া গ্রামে ঢোকার মুখে একটি স্থায়ী তোরণ,গবেষণাগার,মিউজিয়াম ইত্যাদি স্থাপনের দাবি আমরাও সমর্থন করি। শহিদ তিতুমীর মিশন সহ এলাকাবাসীর এই দাবি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পাঠানোর আশ্বাস দেন তিনি। প্রতিবছর নারকেলবেড়িয়ার পুণ্যভূমিতে তিতুমীরের শাহাদত দিবস পালন করার অঙ্গীকার করা হয় জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের পক্ষ থেকে। 

এ দিন সংগঠনের পক্ষ থেকে জেলার প্রায় ৫৪টা শাখা থেকে শত-শত কর্মী-সমর্থক নারকেলবেড়িয়ার এই সভায় উপস্থিত হয় বলে জানান সংগঠনের জেলা সম্পাদক মাওলানা কাজী আরিফ রেজা। 

উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সমাজসেবী হারুন মণ্ডল,রামচন্দ্রপুর উদয় গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান নুর ইসলাম লস্কর,তথ্যচিত্র নির্মাতা মুজিবুর রহমান,সমাজসেবী নীলু ঘোষ,আমিনুল ইসলাম প্রমুখ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only