রবিবার, ২২ নভেম্বর, ২০২০

‘কথিত লাভ জিহাদ নিয়ে আইন অসাংবিধানিক’, পড়ুন আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত

                                           
বিশেষ প্রতিবেদন,পুবের কলমঃআন্তঃধর্মীয় বিয়েকে লাভ জিহাদ নাম দিয়ে শুধু রাজনীতি করতে চাইছে বিজেপি। প্রতিটি প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ব্যর্থতা ঢাকতে লাভ জিহাদের মুখোশের আড়ালে মুখ লুকোতে চাইছেন মোদি-অমিত শাহেরা। পুবের কলমের জন্য এই প্রতিবেদনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তৃণমূলের সাংসদ ও বরিষ্ঠ আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বলেন, বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্য লাভ জিহাদের বিরুদ্ধে যে আইন করার কথা বলছে তা ভারতের সংবিধানের মূল চেতনার বিরোধী। বিজেপির আন্তঃধর্মীয় বিয়েকে লাভ জিহাদ নাম দেওয়া ভারতীয় সংবিধানের ১৪, ২১ এবং ২৫ ধারা ভঙ্গের সমান। এই সব ধারায় সমতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা, ধর্মের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা হয়েছে ভারতীয় সংবিধানে। ব্যক্তি স্বাধীনতার আওতায় পড়ে নিজের পছন্দ মতো প্রাপ্তবয়স্কদের প্রেম ও বিবাহ করার অধিকার। যেখানে ধর্ম, ভাষা কিংবা বর্গ কোনও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না বলে মন্তব্য করেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। লাভ জিহাদ নিয়ে বিজেপির গর্হিত মন্তব্য ভারতীয় সংবিধানের উপর আক্রমণ। এ ধরনের আন্তঃধর্মীয় বিয়ের বিরুদ্ধে বহু মামলা হয়েছে কিন্তু হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট তাদের একাধিক রায়ে আন্তঃধর্মীয় বিয়ের বিরুদ্ধে যায়নি বলে জানান কল্যাণবাবু। প্রসঙ্গত, শাফিন জাহান বনাম অশোকান কে এম এবং অন্যান্য মামলায় (২০১৮) সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় তাঁর বিখ্যাত ‘হাদিয়া রায়ে’ মন্তব্য করেছিলেন নিজের পছন্দমতো কাউকে বিয়ে করা তাঁর নিজস্ব ব্যাপার, যাকে স্বীকৃতি দিয়েছে ভারতীয় সংবিধানের ২১ নং ধারা। সংবিধান যে কোনও ধর্মীয় মতবাদে বিশ্বাসী এবং নাস্তিক উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। একজন ব্যক্তি কীভাবে তাঁর জীবনযাপন করবেন সেটা তার ইচ্ছের উপর নির্ভরশীল। বিচারপতি চন্দ্রচূড়ের রায়ে আরও বলা হয়েছিল যে ব্যক্তির পোশাক, খাদ্য কী হবে কিংবা সে কাকে তার জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেবে এই সব ব্যাপারে সমাজের কোনও ভূমিকা নেই।

আনিস হামিদ বনাম কেরল (২০১৭) মামলায় কেরল হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ নিজেদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছিল ‘আমরা সম্প্রতি সমাজে একটি বিপজ্জনক মানসিকতা লক্ষ্য করছি যেখানে আন্তঃধর্মীয় বিয়েকে লাভ জিহাদ-এর নাম দিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উদ্বেগজনক সব খবর আসছে যে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ-মহিলা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হয়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন এবং তাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমনকী তাদের বিরুদ্ধে হিংসার ঘটনাও ঘটছে। আদালত মনে করে গোটা বিষয়টা বেআইনি। যারা হিংসা ছড়ানোর কাজ করছে, তাদের কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত। ভারত একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। কোনও পুরুষ বা মহিলা যদি প্রাপ্তবয়স্ক হন, তাহলে তাঁর পছন্দমতো মানুষকে বিয়ে করার অধিকার আছে।’

এ প্রসঙ্গে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, এই সাংবিধানিক কিংবা আইনি বিষয়গুলি বিজেপি যে জানে না তা নয়। কিন্তু এটা এখন সর্বজনবিদিত যে বিজেপিকে নির্বাচনে জিততে হলে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন ঘটিয়ে ধ্রূবিকরণের রাজনীতি ছাড়া গতি নেই। কল্যাণবাবু বলেন, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির জন্য বড় শক্ত মাটি। এখানে ধর্মের নামে বিভাজন মানুষ মেনে নেয় না। তিনি জানান, ২০২০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারী সংসদে লাভ জিহাদ নিয়ে একটি প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জি কিষেণ রেড্ডি সংবিধানের ২৫নং ধারায় মানুষকে যেকোনও ধর্ম মানার স্বাধীনতা দিয়েছে বলে জানিয়েছিলেন। তারপরও বিজেপি লাভ জিহাদ নিয়ে জঘন্য রাজনীতি করছে। আরও এক বরিষ্ঠ আইনজীবী ও সিপিএম সাংসদ বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য পুবের কলমকে বলেছেন, বিজেপি যে লাভ জিহাদ-এর জিগির তুলেছে সেটি একটি ফ্যাসিবাদী চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। গেরুয়াবাহিনী ভারতকে মধ্যযুগে নিয়ে যেতে চাইছে। বিকাশবাবু বলেন, ভারতীয় সংবিধানে কোথাও আন্তঃধর্মীয় বিয়েকে বেআইনি বলেনি, বরং ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার দিয়েছে। পাশাপাশি, ইউনিভার্সাল ডিক্লেয়ারেশন অব হিউম্যান রাইটসের ১৬ নং ধারায় বলা হয়েছে, বিয়ের মূল গুরুত্ব হল মানুষের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের বহিঃপ্রকাশ। জাতি,ধর্ম,দেশ,ভাষা নির্বিশেষে প্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ে করার অধিকার আছে। বিকাশবাবু বলেন, কেউ যদি আন্তঃধর্মীয় বিয়ের জন্য সমস্যায় পড়েন তাদের আমি সবসময় আইনি সাহায্য দিতে প্রস্তুত। প্রসঙ্গত, লাভ জিহাদ শধ বন্ধের নিন্দায় সরব হয়েছে অল ইন্ডিয়া লয়ারর্স অ্যাসোসিয়েশন ফর জাস্টিস। একটি বয়ানে অ্যাসোসিয়েশন মন্তব্য করেছে, যে বিজেপি বেআইনিভাবে লাভ জিহাদ শধবন্ধ তৈরি করেছে সংঘ পরিবারের বিভেদমূলক নীতির প্রচার ও প্রসারের জন্য।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only