বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০

নিউটাউনে দুই অধ্যাপক পরিবারের মারামারি, পিছনে কি হাউসিং সোসাইটিতে বেনিয়ম?

হাসপাতালে ভর্তি আহত মাসুদ আলম


পুবের কলম প্রতিবেদকঃনিউটাউনে নূর কো-অপারেটিভ হাউসিং সোসাইটিতে  মারামারি। জড়িত রয়েছেন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের অধ্যাপক অঙ্কুর রায় ওরফে আমান রহমান, তাঁর শ্বশুর বঙ্গবাসী কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ আবদুর রহিম। আর অন্যদিকে গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবির বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মেহেদি হাসানের দুই ভাই। মেহেদি হাসান ওই সময় মুর্শিদাবাদে থাকলেও অঙ্কুর রায়ের স্ত্রী নিউটাউন থানায় যে  এফআইআর করেন, তাতে  তাঁরও নাম যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মেহেদি হাসানের ভাই মাসুদ আলমের ওপর অধ্যাপক অঙ্কুর রায় ও তাঁর সহযোগীরা যে প্রবল হামলা চালিয়েছিলেন বলে অভিযোগ, সে কথা কিন্তু মিডিয়ায় একেবারে আসেনি। তিনি এখন একটি সরকারি হাসপাতালে অপারেশনের অপেক্ষায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এই তথ্যটি কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও  প্রশাসনের কানে পৌঁছয়নি। 

কিন্তু কেন হয়েছিল দুই শিক্ষিত অধ্যাপক পরিবারের মধ্যে এই মারামারি   অন্তর্তদন্তে জানা যাচ্ছে, এর পেছনে রয়েছে জনাব আবদুর রহিমের হিডকোর অধীন দুই কো-অপারেটিভ সোসাইটিতে অবৈধ ডবল মেম্বারশিপ। এছাড়া সম্পাদক হিসাবে তাঁর মেয়াদ অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার এক বছর পরেও নূর কো-অপারেটিভ সোসাইটির সাবেক সম্পাদক অঙ্কুর রায় টাকা পয়সার হিসাব না দিয়ে, চেক বই ও সোসাইটির গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র হস্তান্তর করেননি। ফলে নতুন সম্পাদক ড. মেহেদি হাসানের সোসাইটি পরিচালনা করতে গিয়ে অকুল পাথারে পড়েছেন বলে অভিযোগ। বিষয়টি সম্পূর্ণ বেআইনি। এই অবৈধ কাজের কথা হিডকোরও নজরে রয়েছে।  আর মেহেদি হাসান ও তাঁর ভাইদের বক্তব্য একে ভিত্তি করেই মারামারি। যদিও অঙ্কুর রায় মিডিয়াকে বলেছেন, পার্কিং করা নিয়ে নাকি দু’পক্ষের বিবাদের শুরু। 
কী ঘটেছিল ১৭ নভেম্বর? 
ঘটনাটি ঘটে নূর হাউসিং সোসাইটিতে। এবিষয়ে দু’পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মেহেদি হাসানের দুই ভাই বলছেন, তাঁরা সোসাইটির হাউসিং কমপাউন্ডে লিফটের একপাশে সন্ধ্যায় দুটি চেয়ারে বসে গল্প করছিলেন। তার আগে অবশ্য ওই দিন অধ্যাপক অঙ্কুর রায় তাঁদেরকে ধমকি দেন। বলেন, ‘তোমরা কমপাউন্ডের দেওয়ালে থুতু ফেলেছো, ধুয়ে দিতে হবে।’ অঙ্কুর রায়-এর কথা অনুযায়ী, মাসুদ আলম ও তাঁর ভাই দেয়ালের একাংশ ধুয়ে দেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সন্ধ্যা রাতে অঙ্কুর রায় তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে বাইরে থেকে হাউসিংয়ে ফিরে আসেন। সে সময় তারা লিফটের কাছে বসেছিলেন। এদিকে অঙ্কুর রায় বাড়িতে গিয়ে রড বা লোহার পাইপ হাতে নিচে নেমে আসেন। সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী ও কিশোর পুত্র। তারা এই দু’জনকে আক্রমণ করেন। মাসুদ আলম ও তাঁর ভাইও আত্মরক্ষার খাতিরে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এই সময় সেন্ট জেভিয়ার্সের অধ্যাপক অঙ্কুর রায়ের আক্রমণের কাছে পেরে না ওঠায় তারা দু’জনে পালিয়ে যান। আহত মাসুদ আলম হাওড়ায় এক সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যান। তারা তাঁকে ভালো অস্থি বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, এমন কোনও হাসপাতালে যেতে বলেন। মাসুদ আলম শিয়ালদার কাছে একটি বড় হাসপাতালে আসেন। তাঁর শারীরিক অবস্থা দেখে হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাঁকে ভর্তি করে নেন। এসব করতে গিয়ে তাদের নিউটাউন থানায় এসে এফআইআর দায়ের করতে দেরি হয়ে যায়। অপেক্ষাকৃত সুস্থ ভাইটি নিউটাউন থানায় এফআইআর করতে যাওয়া মাত্রই তাঁকে থানার অফিসার গ্রেফতার করে নেন। তাদের অবশ্য একটি ত্রুটি ছিল যে, তারা মারামারির পরই স্থানীয় নিউটাউন থানায় যাননি। এ সম্পর্কে মাসুদ আলম আমাদের প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি তখন যন্ত্রণায় উঠে দাঁড়াতে পারছি না। তাই নিউটাউন থানায় যেতে পারিনি।’ যেহেতু ড. মেহেদি হাসান ও তাঁর ২ ভাইয়ের বিরুদ্ধে অঙ্কুর রায়ের স্ত্রী ড. সাবিনা খান এফআইআর দায়ের করেছেন, তাই এক ভাইকে গ্রেফতার করার পর অন্য অধ্যাপক মেহেদি হাসান ও তাঁর আরও এক ভাইকেও হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে নিউটাউন থানার পুলিশ অফিসাররা। গুরুতর আহত মাসুদ আলম যে বড় সরকারি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন, তাঁকেও পুলিশ সেখানে গ্রেফতার করেছে এবং তাঁর বেডের সামনে ২জন পুলিশকে পাহারায় বসিয়েছে। জানা গেছে, নিউটাউন থানার পুলিশ অধ্যাপক ড. মেহেদি হাসান ও তাঁর ভাইদের কাছ থেকে কোনও ধরণের এফআইআর গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। আর যে ভাই (মোরশেদ) গ্রেফতার হয়েছে, নিউটাউন থানার পক্ষে সরকারি আইনজীবী বারাসত কোর্টে তাঁর জামিনের প্রবল বিরোধিতা করেছে।  ফলে প্রথমে মোরশেদ আলমকে পুলিশ হেফাজতে ও পরে বিচার বিভাগীয় হেফাজতে রাখা হয়েছে। ছেলেটি ভদ্র বলে তাঁর এলাকায় পরিচিত। সে ইংরেজিতে অনার্স এবং বিএড পাশ করেছে। মোরশেদ আলমের আইনজীবী ‘পুবের কলম’ কে বলেন, এটি শিক্ষিত প্রতিবেশিদের মধ্যে বিবাদ ও মারামারির একটি ঘটনা। দু’পক্ষেই আহতের ঘটনা রয়েছে। মোরশেদ কোনও সমাজবিরোধী নয়। কেন পুলিশ জামিনের এতো তীব্র বিরোধিতা করছে, তা বেশ রহস্যময়। আহত মাসুদ আলমও যাকে পুলিশ হাসপাতালের ভেতরেই গ্রেফতার করেছে, সেও ডাবল এম.এ। অর্থাৎ দু’পক্ষই শিক্ষিত হলেও রাগের মাথায় পরস্পরকে আক্রমণ করেছিল।’ 
তবে একথা ঠিক অঙ্কুর রায় ও তাঁর শ্বশুরমহাশয় এবং অন্য আত্মীয়রা মিডিয়াকে ভালো ভাবেই ব্যবহার করেছেন। অঙ্কুর রায়ের স্ত্রী সাবিনা খানের এক বোন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘প্রার্থনা করলে তার ফল পাওয়া যায়। কিছু আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। একজন অপরাধী (কনভিক্ট !) গ্রেফতার হয়েছে এবং সে আরও কিছুদিন হেফাজতে থাকবে। আমার বোন সাবিহা খানের আগামীকাল ভাঙা হাতের জন্য অপারেশন হবে। সুবিচার এবং শান্তি অপেক্ষা করে আছে।’
তাঁর বোন ট্যাগ করেছেন জাস্টিস ফর কোরাইয়ান ও সাবিহা খান, শকুন্তলা চন্দা, নুসরত হুসেন, পশ্চিমবাংলা পুলিশ ইত্যাদি ইত্যাদি। অবশ্য অঙ্কুর রায়ের স্ত্রী যিনি এফআইআর দায়ের করেছেন তিনি নিজে তাঁর নাম লিখেছেন সাবিনা খান। আর তাঁর বোন নাম লিখেছেন সাবিহা খান! মিডিয়ার প্রচারণা অবশ্য এক তরফা হয়েছে। কারণ তাতে ড. মেহেদি হাসান ও তাঁর ভাইদের পক্ষের বক্তব্য নেই। 
এ সম্পর্কে অবশ্য প্রাক্তন অধ্যক্ষ আবদুর রহিম সাহেবেরও পাল্টা বক্তব্য রয়েছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only