রবিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২০

প্রয়াত কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়



 পুবের কলম ওয়েব ডেস্কঃ প্রয়াত কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। করোনা আক্রান্ত হয়ে দিন চল্লিশেক আগে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন।পরে মাল্টি অর্গান ফেলিওর হয়।এক মাসেরও বেশি সময় ধরে তিনি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়াইয়ে অবশেষে ইহ লোক পরিত্যাগ করলেন। রেখে গেলেন বাংলা চলচিত্র জগতে 'অপু' কিংবা ওই 'ফেলুদার' ছাপ। টলিপাড়া আজ যেন অভিভাবক শূন্য হল। সারা দেশ, অনুরাগীকূলের প্রার্থনাও শেষ পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরাতে পারল না সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে ।জীবদ্দশায় সত্যজিতের 'অপু' ছিলেন 'অপরাজিত'। তবে জীবনের শেষ লড়াইয়ে পরাজিত হয়েই ফিরতে হল 'ফেলুদা'-কে। রবিবার বেলা ১২টা বেজে ১৫ মিনিট নাগাদ হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। প্রবীণ অভিনেতার প্রয়াণের খবর প্রকাশ্যে আসতেই শোকের ছায়া বিনোদন জগতে। অভিনেতার প্রয়াণে বেলভিউ হাসপাতালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। 
শনিবার রাতেই সৌমিত্রবাবুর চিকি‍ৎসার দায়িত্বে থাকা ডাঃ অরিন্দম কর জানিয়ে দেন, চিকিত্সাকদের বিভিন্ন রকম চেষ্টা সত্ত্বেও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। গত প্রায় ৪০ দিন ধরে তাঁরা চেষ্টা চালিয়েছেন। বিভিন্ন রকম চিকিত্সা পদ্ধতিতে অভিনেতার চিকিত্সা করা হয়েছে। স্টেরয়েড, প্লাজমা থেরাপি, করা হয়েছে। চিকিত্সাকদের বড় দল তাঁকে সুস্থ করে তোলার জন্য কাজ করেছে। স্নায়ু, নেফ্রোলজি, কার্ডিওলজি, সংক্রমণ রোগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হয়েছে। সরকার এবং বেসরকারি- সব স্তরের চিকি‍ৎসকদের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। গভীর দুঃখের সঙ্গে জানানো হচ্ছে তাঁর শরীর চিকিত্সায় সাড়া দিচ্ছে না। পরিবারের সদস্যদেরও এ ব্যাপারে জানানো হয়েছে। সৌমিত্রবাবুর শারীরিক অবস্থা নিয়ে সবাই চিন্তিত, উদ্বিগ্ন। তাঁরা বুঝতে পেরেছেন পুরো বিষয়টি। তবে আমরা শেষ চেষ্টা করছি। এই অবস্থায় মিরাকেলও কার্যত অসম্ভব বলে জানিয়েছেন চিকিত্সকরা। তবু সকলের মানে একটা ক্ষীণ আশা ছিল হয়তো বাড়ি ফিরে আসবেন অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু শেষমেষ মৃত্যুর কাছে হার মানলেন অপু। চলে গেলেন না ফেরার দেশে। কিন্তু তিনি রেখে গেলেন স্ত্রী দীপা চট্টোপাধ্যায় ও দুই পুত্র কন্যা সৌগত এবং পৌলমীকে।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, আজ, রবিবার বেলভিউ হাসপাতাল থেকে সৌমিত্রবাবুর পার্থিব শরীরকে দুপুর ২টোর সময় গল্ফগ্রিনের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হবে টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে।তারপর নিয়ে যাওয়া হবে রবীন্দ্র সদনে। সেখানে ২ ঘণ্টা তাঁর পার্থিব শরীর রাখা থাকবে। সন্ধে সাড়ে ৫টার পর পদ্যাত্রা করে তাঁকে কেওড়াতলা
মহাশ্মশানে নিয়ে যাওয়া হবে। সন্ধে ৬টা ১৫ নাগাদ গান স্যালুট দেওয়ার পর তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।
উল্লেখ্য,গত ৬ অক্টোবর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে বেলভিউ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এক মাসের বেশি সময় ধরে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন অভিনেতা। যখন অভিনেতাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল তখন তিনি করোনা আক্রান্ত ছিলেন। যদিও পরবর্তীকালে করোনা মুক্ত হন অভিনেতা। তবে বেশ কয়েকদিন ধরেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের শারীরিক অবস্থা সংকটজনক হয়ে পড়ে । ক্রমাগত অবস্থার অবনতিও হয় তার। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকবার ডায়ালিসিস হয়েছে অভিনেতার। বুধবারই অভিনেতার ট্র্যাকিওস্টোমি করা অভিনেতার। অভিনেতাকে সুস্থ করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে বেলভিউ হাসপাতালে চিকি‍ৎসকরা। কিন্তু অভিনেতার বয়স ক্রমাগত চিন্তা দিয়েছে চিকি‍ৎসকদের। শুক্রবার থেকেই শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের।

অভিনেতা হিসেবে তিনি কিংবদন্তি, তবে আবৃত্তি শিল্পি হিসেবেও তাঁর নাম অত্যন্ত সম্ভ্রমের সাথেই উচ্চারিত হয়। তিনি কবি এবং অনুবাদকও। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের ৩৪টি সিনেমার ভিতর ১৪টিতে অভিনয় করেছেন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমহার্স্ট স্ট্রীট সিটি কলেজে, সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্রথম সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় অপুর সংসার ছবিতে অভিনয় করেন। পরবর্তীকালে তিনি মৃণাল সেনতপন সিংহঅজয় করের মত পরিচালকদের সঙ্গেও কাজ করেছেন। সিনেমা ছাড়াও তিনি বহু নাটকযাত্রা, এবং টিভি ধারাবাহিকে অভিনয় করেছেন। অভিনয় ছাড়া তিনি নাটক ও কবিতা লিখেছেন, নাটক পরিচালনা করেছেন। তিনি একজন খুব উচ্চমানের আবৃত্তিকারও বটে।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পিতামহের আমল থেকে চট্টোপাধ্যায় পরিবারের সদস্যরা নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরে থাকতে শুরু করেন।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন কৃষ্ণনগরের সেন্ট জন্স বিদ্যালয়ে।বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করেন হাওড়া জিলা স্কুল থেকে। তারপর কলকাতার সিটি কলেজ থেকে প্রথমে আইএসসি এবং পরে বিএ অনার্স (বাংলা) পাস করার পর পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজ অফ আর্টস-এ দু-বছর পড়াশোনা করেন।

সত্যজিৎ রায় সহ নানান গুণীজনের সাথে তার সিনেমার কাজ চলতে থাকে। সমানে তিনি নাটকও করতেন। তার অভিনয় রাজ্য,দেশ,বিদেশের লোকমুখে চর্চিত হয়। তার ঝুলিতে দেশের 'পদ্মভূষণ' থেকে শুরু করে 'দাদা সাহেব ফালকে' আবার তিনি ফ্রান্স সরকারের 'লিজিয়ন অব অনার' সম্মানেও সম্মানিত হন। তার এই প্রয়াণে বঙ্গ সিনেমাজগতে নেমে এসেছে যেন আজ শোকের ছায়া।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only