শনিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২০

২২০ বছর বয়সি হোয়াইট হাউসের জানা-অজানা গল্প



মুদাস্সির নিয়াজঃ রাজনীতি, কূটনীতি,প্রতিরক্ষা তথা ক্ষমতার দম্ভ ও অহমিকার প্রতীক হোয়াইট হাউস। এই সাদাবাড়িটি হল আমেরিকার অহঙ্কারের অলঙ্কার। কারণ, এখান থেকেই প্রায় সমগ্র পৃথিবীর ভূ-রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি নির্ধারিত হয়। এই বাড়িতে বসেই দূরবীণ দিয়ে বিশ্বদর্শন করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ধবধবে সাদা রঙের বাড়িটাকে ঘিরে রয়েছে হরেক রকম আকর্ষণীয় তথ্য। যার পোস্টাল অ্যাড্রেস বা ঠিকানা হল ১৬০০ পেনসিলভানিয়া এভিনিউ,ওয়াশিংটন ডিসি, পিনকোড ২০৫০০। ১১৯ বছর আগে এই ইমারতের নাম বদলে হয় হোয়াইট হাউস। আগামী ২০ জানুয়ারি শপথ নিয়ে এই বাড়িতেই পা রাখবেন জো বাইডেন। তাঁকে স্বাগত জানাতে এখন নতুন সাজে সেজে উঠছে এই ঐতিহ্যবাহী ভবন। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হেনরি ট্র$ম্যান এই বাড়িকে বলতেন ‘সাদা জেলখানা’। প্রাক্তন ফার্স্টলেডি জুলি নিক্সনের অভিযোগ ছিল, তাঁদের জন্য বরাদ্দ এই সরকারি বাসভবনে গোপনীয়তা রক্ষা করা খুব কঠিন। এ জন্য তিনি দায়ী করেন, দিনভর পুলিশ, নিরাপত্তারক্ষী ও সাংবাদিকদের আনাগোনা। ২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি এই বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে ফার্স্টলেডি মিশেল ওবামা বলেছিলেন, হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। যেন দম বন্ধ হয়ে আসছিল। ৮ বছর এই বাড়িতে থাকাকালে এক মুহূর্তের জন্য কোনও রুমের জানালা খুলতে দেওয়া হয়নি। এর বাসিন্দাদের প্রতি মুহূর্তে মানবিক ও যান্ত্রিক নজরদারির আওতায় রাখা হয়। নিরাপত্তা রক্ষীদের সম্মতি ছাড়া কেউ এই বাড়ির বাইরে এক পা-ও রাখতে পারেন না।

জন্মসূত্রে আইরিশ নাগরিক জেমস হোবান হোয়াইট হাউসের স্থপতি। প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন কাম কার্যালয় হিসেবে ব্যবহারের প্রায় ১০০ বছর পরেও এর নাম ছিল ‘এক্সিকিউটিভ রেসিডেন্স’। ১৯০১ সালে প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের আমলে নাম বদলে হয় ‘হোয়াইট হাউস’। এই বাড়ির জন্য জমি কেনা থেকে নকশা অনুমোদন সবই করেন প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন। অথচ তিনি জীবদ্দশায় এই বাড়িতে প্রবেশ করার সুযোগ পাননি। তাঁর মেয়াদ শেষ হয় ১৭৯৭ সালে। দু-বছর পর মারা যান তিনি। ১৭৯২ থেকে হোয়াইট হাউসের নির্মাণকাজ শুরু হয়ে সমাপ্ত হয় ১৮০০ সালে। সেই আমলে এই বিশালাকার বাড়ি বানাতে খরচ হয়েছিল ২ লক্ষ ৩২ হাজার ৩৭২ ডলার। ৬ তলা ভবনের মধ্যে রয়েছে ১৩২টা রুম। জর্জ ওয়াশিংটনই একমাত্র প্রেসিডেন্ট যিনি হোয়াইট হাউস বা এক্সিকিউটিভ রেসিডেন্সে থাকেননি। দেশটিতে এ পর্যন্ত মোট ৫৯বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়েছে। বাইডেনকে ধরলে মোট ৪৫জন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। ৪৩জন হোয়াইট হাউসে থেকে কাজ করেছেন। ব্যতিক্রম একমাত্র জর্জ ওয়াশিংটন। ২০ জানুয়ারি ২০২১ এই বাড়ির চাবিকাঠি হাতে পাবেন বাইডেন।   

১৮০০ সালের ১ নভেম্বর দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট জন অ্যাডামস সর্বপ্রথম এই বাড়িতে ঢোকেন। ১৮১২ সালে গ্রেট ব্রিটেন ও তার সহযোগী দেশগুলোর সঙ্গে আমেরিকার যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধের জেরেই ১৮১৪ সালে হোয়াইট হাউসে আগুন লাগিয়ে দেয় ব্রিটিশ সেনাবাহিনী। পুড়ে ছাই হয়ে যায় অন্দরমহলের সাজসজ্জা, বহুমূল্যবান সব আসবাবপত্র। অগত্যা আবার ডাক পড়ে আইরিশ স্থপতি জেমস হোবানের। তাঁর পরিকল্পনা মতো ফের নবকলেবরে সেজে ওঠে হোয়াইট হাউস। সেই মেরামত ও নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৮১৭ সালে। তারপর হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করেন প্রেসিডেন্ট জেমস ম্যাডিসন। ১৯০৯ সালে প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম হাওয়ার্ড ট্যাফট সাদাবাড়ির দক্ষিণ অংশ সম্প্রসারণ করেন এবং সেখানে তৈরি হয় ওভাল অফিস। পরম্পরা মেনে প্রত্যেক প্রেসিডেন্ট বিদায় নেওয়ার আগে পরবর্তী নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের পছন্দ মাফিক নতুন করে সাজানো হয় এই সাদাবাড়ির অন্দরমহল।

নবম প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম হেনরি হ্যারিসন, দ্বাদশ প্রেসিডেন্ট জ্যাকারি টেইলর এই বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দশম ফার্স্টলেডি লেটিটিয়া টাইলার, ২৩তম ফার্স্টলেডি ক্যারোলিনা হ্যারিসন এবং ২৮তম ফার্স্টলেডি অ্যালেন উইলসন প্রমুখের দেহাবসানও হয় হোয়াইট হাউসে থাকাকালীন। সবথেকে আশ্চর্যজনক বিষয় হল, নির্মাণের পরেও সুদীর্ঘ ৯০ বছর এই বাড়ি ছিল বিদ্যুৎ সংযোগহীন। ১৮৯১ সাল পর্যন্ত গ্যাসবাতির আলোয় আলোকিত হত হোয়াইট হাউস। ২৩তম প্রেসিডেন্ট বেঞ্জামিন হ্যারিসনের আমলে প্রথম বিদ্যুৎ সংযোগ হয়। কিন্তু তিনি ইলেকট্রিককে এতটাই ভয় পেতেন যে, নিজে কখনও সুইচ বোর্ডে হাত দিতেন না।

আমেরিকার খ্যাতনামা সেফ বা রন্ধন শিল্পীদের তত্ত্বাবধানে দু’বেলা নিয়ম করে হাঁড়ি চড়ে হোয়াইট হাউসে। এই বাড়িতে একসঙ্গে ১ হাজারেরও বেশি অতিথিকে খাদ্য পরিবেশন করা যায়। দৈনন্দিন মেনু ও রেসিপি যাবতীয় হয় প্রেসিডেন্ট বা ফার্স্টলেডির পছন্দের ফর্দ অনুযায়ী। সারা বছরই চলতে থাকে এই বাড়ির মেরামতির কাজ। সবথেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় রঙের দিকে। সাদা রং হওয়ায় বেশি নোংরা হয়। আর সাদা রংটাই এই বাড়ির প্রধান বৈশিষ্ট্য, ঐতিহ্য এবং আকর্ষণ। ৫৫ হাজার বর্গফুট দেওয়ালের রং দুধের মতো সাদা রাখতে প্রয়োজন হয় ৫৮০ গ্যালন রং। শুধু সাদা রং ধরে রাখতে ফি-বছর ১৬ লক্ষ ডলার ব্যয় হয়।

অন্যান্য সব হাইপ্রোফাইল ভবনের মতোই এই বাড়িতেও গোপন প্রবেশপথ রয়েছে। বেসমেন্ট থেকে সেই গোপন সুড়ঙ্গপথ গিয়ে মিশেছে রাজধানী শহর ওয়াশিংটন ডিসি-র এইচ স্ট্রিটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) সময় এই গোপন সুড়ঙ্গপথ তৈরি করা হয়। এ ছাড়াও হোয়াইট হাউসের নীচে রয়েছে সুরক্ষিত বম্ব স্কোয়াড ও বম্ব শেল্টার। তবে প্রেসিডেন্ট হলেও এত সবকিছু পুরোপুরি ফ্রিতে মেলে না। প্রেসিডেন্টের পরিবারকে খাই-খরচা বাবদ গাঁটের কড়ি দিতে হয়। পাশাপাশি লন্ড্রি, কেশচর্চা, রুপচর্চার জন্যও বিল মেটাতে হয়। এ ছাড়াও এর ভিতর কোনও পার্টি দেওয়া হলে সেই দিনের জন্য বিশেষ সাজসজ্জা, অতিথি আপ্যায়ন ও রান্নাবান্না-সহ যাবতীয় আয়োজনের ব্যয়ভার বহন করতে হয় সংশ্লিষ্ট প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্টলেডিকে।   


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only