শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২০

পায়ে লিখে স্নাতকের ছাত্রী পিতৃহারা শাবানার স্বপ্ন চাকরি পাওয়া

 


রফিকুল হাসান, শাসন: কথায় বলে ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। সেই ইচ্ছা মনের জোর এই দুইকে সম্বল করে পায়ে লিখে মাধ্যমিকের পর উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে 'কন্যাশ্রী' সাবানা ইয়াসমিন এখন স্নাতকের ছাত্রী। উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাত দু'নম্বর ব্লকের খড়িবাড়ির কৃষ্ণমাটি গ্রামের মরহুম শেখ মোস্তাকিন আলির ছোট মেয়ে সাবানা ইয়াসমিন। পায়ের দুই আঙ্গুল দিয়ে কলম ধরে লেখাপড়া শিখছে শাবানা। শাবানার মা মমতাজ বেগমের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, " জন্মের পর থেকে ওর হাতের সমস্যা।যখন ৩-৪ বছর বয়স ছিল নিজে থেকেই পা দিয়ে কলম ধরার চেষ্টা করত। এমনকি পা দিয়ে কলম ধরে বইতে থাকা বিভিন্ন ছবি যেমন পাখি, বাড়ি, মানুষ আঁকার চেষ্টা করত। থেকেই আমাদের আগ্রহ বেড়ে যায় এবং ওকে আমরা প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করে দেই। সে থেকেই পায়ে লিখে ওর বেড়ে চলা "। ২০১৪ সালে স্থানীয় কীর্তিপুর নবীন চন্দ্র হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে ৪৫% নাম্বার পায় সাবানা ইয়াসমিন। এর পরপরই ২০১৬ সালে ওই একই স্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক দিয়ে ৫৫% নাম্বার পায় সে। কলা বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর মধ্যমগ্রাম বিবেকানন্দ কলেজে ভর্তি হয় সে কিন্তু দুঃখের বিষয় ওই বছরই শাবানার বাবা শেখ মুস্তাকিন আলি মৃত্যুবরণ করেন। সংসারের ভার এসে পড়ে শাবানার বড় ভাইয়ের উপর। পরিবারের একমাত্র রোজগেরে শাবানার বড় ভাইয়ের পক্ষে কোনোরকমে সংসার চালানো সম্ভব হলেও শাবানার উচ্চশিক্ষার খরচ যোগাতে হিমশিম খেতে হয় তাঁকে। বিভিন্ন স্কলারশিপ এর টাকা কন্যাশ্রীর টাকাকে সম্বল করে শাবানার পড়াশোনা চালানো হয় বলে জানান তার মা মমতাজ বেগম। মমতাজ বেগমের কথায়, "ওর বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদেরকে খুব কষ্ট পেতে হচ্ছে। এমনকি আমার বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনদের থেকে সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে ওর পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না। তার উপর আবার নিজের শরীর খারাপ, আমার কিছু হয়ে গেলে ওকে কে দেখবে এমনই দুশ্চিন্তা শাবানার মা মমতাজ বেগমের। তাই তাঁর আবেদন রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ৯০ শতাংশ প্রতিবন্ধী আমার মেয়েকে একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিলে আমরা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে কৃতজ্ঞ থাকব। একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি আমার মেয়ের কথা ভাবেন তাহলে অন্তত ওর রুটি-রুজির ব্যবস্থা হবে এবং আগামী দিনে ওর ইচ্ছা অনুযায়ী এম পড়াশোনা করাতে পারবো "। শাবানা আরো জানায়, মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার পর ছুটিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যুব কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে কম্পিউটার শিখেছে। এছাড়া বিএ প্রথম বর্ষে সে ৪৮% নাম্বার পেলেও বিএ দ্বিতীয় বর্ষে ৫১% নাম্বার তুলেছে।কলেজে বাসে যাতায়াত করতে আমার অসুবিধা হতো বলে আমি তেমন কলেজে ক্লাস করতে পারতাম না। তাই রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সাপ্লি হয়ে গেছে এবছর রাষ্ট্রবিজ্ঞান পরীক্ষা দিয়ে বিএ পাস করে আগামী দিনে এমএ কমপ্লিট করতে চাই বলে ইচ্ছা প্রকাশ করেন শাবানা। কিন্তু কতটা পূর্ণ হবে শাবানার এই বাসনা, কারণ অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা শাবানার উচ্চশিক্ষায় এখন বাধার মুখে। 

ব্যাপারে স্থানীয় বিধায়ক হাজী নুরুল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, "বিষয়টি আমার জানা ছিল না সত্যি খুব আনন্দের বিষয়। অনেকে হাতে লিখতে পারলেও পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। আর একটা মেয়ে হয়ে পায়ে লিখে সে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয়ে আজ কলেজের ছাত্রী। সত্যিই সমস্ত কন্যাশ্রীরা আমাদের গর্ব। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কন্যাশ্রীদের জন্য যা করেছে তা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আমি ওই মেয়েটির জন্য কিছু করতে পারলে আনন্দ পাব। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে যাতে কিছু করা যায় তার জন্য সব রকমের চেষ্টা করব" বলে আশ্বাস দেন বিধায়ক হাজী নুরুল। পাশাপাশি বারাসাত ২ ব্লকের বিডিও অর্ঘ্য মুখোপাধ্যায় জানান, "একটা মেয়ে পায়ে লিখে পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছে সত্যি খুব দারুন ব্যাপার। বারাসাত ২ ব্লক প্রশাসন সর্বদা ওর পাশে থাকবে। উচ্চশিক্ষার জন্য বা ওর চাকরির জন্য যদি কোন ব্যবস্থা করা যায় কিনা তার জন্য আমরা সব রকমের প্রচেষ্টা গ্রহণ করব বলে আশ্বাস দেন তিনি"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only