বুধবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২০

ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে ‘কার্জন গেট’



অদিতি চট্টোপাধ্যায়

কার্জন গেট বলতেই এককথায় যেমন পূর্ব বর্ধমানের ঐতিহ্যকে বোঝায় ঠিক তেমনই আগামীর উত্তরসূরিকেও বোঝায়। আর সে কারণেই চেনা-জানা সহ যেকোনও ইতিহাসপ্রেমীর কাছে ‘কার্জন গেটের’ গুরুত্ব এককথায় অপরিসীম। শহরের মাঝ বরাবর বয়ে গিয়েছে জিটি রোড তথা গ্রান্ড ট্যাংক রোড। তারই গা ঘেঁষে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে, একদা বর্ধমানের গর্ব তথা জেলাবাসীর অন্যতম আকর্ষণ শতা‍ব্দী প্রাচীন এই গেট। কথিত আছে, ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন বর্ধমানরাজ বিজয়চাঁদ মহতাব গভর্নর জেনারেল তথা ভাইসরয় লর্ড কার্জনের অভ্যর্থনা উপলক্ষ্যে এই তোরণ তৈরি করান। 


কার্জন সাহেব যেদিন শহরে পা রাখেন সেদিন সাজো সাজো রব, কার্জনগেট থেকে রাজবাড়ির মহতাব মঞ্জিল পর্যন্ত সমগ্র রাস্তাই লাল কার্পেটে মুড়ে ফেলা হয়। তৎকালীন ভাইসরয় হেঁটে সেই পথ পরিক্রম করেন। রাজা লর্ড কার্জনকে সন্মান জাননোর উদ্দেশে তার নামানুসারে গেটের নাম দেন ‘স্টার অফ ইন্ডিয়া গেট’ অর্থাৎ ‘কার্জন গেট’ যা স্বাধীনতা পরবর্তীকালে জনসাধারণের কাছে ‘বিজয় তোরণ’ বা দ্বারণ নামে পরিচিতি লাভ করে।


দ্বারণের মাথায় তিনটি পরীর অবস্থান। গেটের গা বেয়ে সিঁড়ি আছে যা দিয়ে মাথায় ওঠা যায়, যদিও বেশ কয়েক বছর আগে পুরসভার তরফে তালা বন্ধ করে দেওয়া হয়।  চুন, সুরকির মোটা ইঞ্চির গাঁথনি হওয়ায় আজও স্বমহিমায় এটি মাথা উঁচু করে টিকে রয়েছে বলা যায়। দিনের ক্লান্তি শেষে রাতে একঝাঁক পায়রা আশ্রয় নেয় পরীদের পদতলে। গেটকে ঘিরে তৈরি হয়েছে হাজারো দোকান-পসারি, যাঁদের কলকাকলিতে মুখরিত থাকে সবসময় এলাকাচত্বর। উল্লেখ্য, ওই বছরই লর্ড কার্জনের বর্ধমান আগমন উপলক্ষ্যে বিজয়চাঁদ মহারাজ দুটি মিষ্টির প্রচলন করেন  যা পরবর্তীকালে ‘সীতাভোগ-মিহিদানা’ নামে পরবর্তীকালে জগৎ বিখ্যাত হয়ে পড়ে। 


বয়সের ভারে জর্জরিত হলেও কার্জনগেট কিন্তু একফোঁটা ক্লান্ত হয়নি, সে তার দুচোখ ভরে বহু ইতিহাসের সাক্ষী থেকে গিয়েছে। দেখেছে ভাঙাগড়ার খেলা, রাজনৈতিক পালাবদল, সভ্যতার অদলবদল, ব্যবসায়ীদের গলা ফাটানো চিৎকার, তরুণ-তরুণীদের কফি কাপে চুমুক থেকে সাম্প্রতিক লকডাউন। অপলক দৃষ্টিতে সবই যেন গোগ্রাসে গিলেছে। শহরের বিশিষ্ট ইতিহাস গবেষক নীরদবরণ সরকার বলেন, এটি প্রাচীন এই ঐতিহ্যকে হারালে চলবে না। আগামীদিনেও পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের দরকার আছে বলে তিনি মন্তব্য প্রকাশ করেন। 


কতসব ইতিহাসের গন্ধ পাওয়া যায় এই গেটকে ঘিরে, কত সব আঁকিবুকি! তাই শহর ঘুমিয়ে গেলেও শহরবাসী ঘুমিয়ে গেলেও তিন রাতপরী যেন কখনই ঘুমায় না। স্থানীয়রা তো বটেই, আগন্তুক থেকে শুরু করে কর্মসূত্রে যাঁরা বাইরে থাকে তাঁরাও বারে বারে ছুটে আসে তাঁদের এই প্রিয় কার্জন গেটের বুকে। গেটের নিচে বসা বই বিক্রেতা আসাদুল হক জানান, ছোট থেকেই আব্বার সঙ্গে বসে এখানে কাগজ সহ অন্যান্য পরীক্ষার ফর্ম ও বই বিক্রি করি। আজ আমারই বয়স ষাটের ওপর হয়ে গেল। বাচ্চা ছেলেমেয়েরা তো বটেই, বিভিন্ন বয়সিরাও ভিড় জমায় এখানে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only