রবিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২০

লাভ জিহাদ ভুয়ো মামলা ! দু'পক্ষের সম্মতি থাকা স্বত্বেও গ্রেফতারি

  

আহমেদের বাবা মুহাম্মদ রফিক

পুবের কলম প্রতিবেদকঃ­ গত ফেব্রুয়ারিতে দিল্লি দাঙ্গার সময় স্বরাস্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের অধীনস্থ দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ উঠেছিল। একের পর এক মুসলিমদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, মুসলিমদের খুন করা হচ্ছিল পরিকল্পিতভাবে। তবু তারা নীরব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। ঠিক উলটো ঘটনা ঘটছে এবার উত্তরপ্রদেশে। সেখানে কোনও দাঙ্গা ঘটছে তা নয়। কারও প্রাণ যাচ্ছে সেটাও নয়। তাদের অতিসক্রিয়তা তথাকথিত লাভ জিহাদের বিরুদ্ধে। লাভ জিহাদ নিয়ে সম্প্রতি ইউপি সরকার অর্ডিন্যান্স জারি করেছে। জোরপূর্বক বা বিয়ের কারণে ধর্মান্তরণ করলেই তাকে গ্রেফতার করে পাঁচ বছর বা দশ বছর যেমন জেলের ব্যবস্থা করা হয়েছে, সঙ্গে রয়েছে জরিমানাও। এ অবস্থায় যোগীর পুলিশ অতিসক্রিয় হয়ে গ্রেফতারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ভালোবাসা শুনলেই তাদের মধ্যে লাভ জিহাদের ঘটনা মাথায় চলে আসছে এবং তারা গ্রেফতার করতে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ, পুলিশের সক্রিয়তা নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে দেশে। এর মাধ্যমে আরেকবার মুসলিমদের টার্গেট করা হল উত্তরপ্রদেশে। 

উত্তরপ্রদেশের ধর্মান্তরণ বিরোধী আইনে প্রথম গ্রেফতার করা হয়েছে ২১ বছর বয়সি এক মুসলিম যুবককে। তার পরিবারের সদস্যদের দাবি, যে মেয়েটির সঙ্গে তাদের ছেলের সম্পর্ক ছিল, তার পরিবারকে দিয়ে পুলিশ জোরপূর্বক মামলা দায়ের করিয়েছে। তারপর তাকে গ্রেফতার করেছে। ২৮ নভেম্বর রাজ্যে অর্ডিন্যান্স লাগু হয়েছে। তার ১২ ঘণ্টার মধ্যেই প্রথম কেস ফাইল হয়। বিষয়টি একদমই কাকতালীয় নয়। পুলিশ এ কাজে জোরপূর্বক বাধ্য করেছে মেয়েটির পরিবারকে। বেরিলি গ্রামের বহু বাসিন্দা জানাচ্ছেন যে ওই যুবক এবং মেয়েটির মধ্যে যে ঘটনা ঘটেছিল সেটি দুই পরিবারের মধ্যে রফা হয়ে গিয়েছিল। এমনটাই জানাচ্ছেন গ্রামপ্রধান ধ্রুব রাজও। গত এপ্রিলে ওই মেয়েটির সঙ্গে অন্য একটি হিন্দু ছেলের বিয়েও সম্পন্ন হয়েছে ভালোভাবেই। দুই পরিবারের মীমাংসায় যে সমস্যার নিষ্পত্তি হয়েছিল সেখানে এবার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পুলিশ সেখানে বাধ সেধেছে। যুবক আহমেদের ৭০ বছর বয়সি বাবা মুহাম্মদ রফিক জানিয়েছেন, পুলিশ আহমেদকে খুঁজতে এসে তাকে প্রচুর মারধর করে। গত বুধবার আহমেদকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি আরও জানান, এখানে লাভ জিহাদ কোনও অভিযোগই নয়। এটা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে। ওই মেয়েটির পরিবারের লোকজন সজ্জন। তাদের সঙ্গে আমাদের কোনও বিতর্ক নেই। আমি এটাও জানি যে তারা কোনও এফআইআর দায়ের করেনি আমার ছেলের বিরুদ্ধে। মেয়েটির বাবা আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিল এবং এ মামলাতে সে আমাকে সমর্থন জানিয়েছে। পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জোরপূর্বক এফআইআর নথিভুক্ত করেছে যাতে তারা প্রশংসা পায় এবং পদোন্নতি ঘটে। যোগীর নজরে পড়ার জন্যই তাদের এই অতি সক্রিয়তা। ওই মেয়েটির পরিবার আহমেদের বাড়ি থেকে ১০০ মিটার দূরে থাকে। তারা নিজেদের বাড়ির বাইরে তালা লাগিয়ে দিয়েছে এবং নিজেদের ঘরবন্দি করে রেখেছে।  যোগাযোগের সমস্ত পথ বন্ধ করে দিয়েছে, মিডিয়াও যোগাযোগ করতে পারছে না। 

ইনাম কামানোর জন্য জোরপূর্বক এই প্রথম লাভ জিহাদ মামলাটি দায়ের করা হয়েছে, এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন বেরিলির ডিআইজি রাজেশ পান্ডে। তিনি জানান যে খুব তাড়াতাড়ি হয়তো কেসটি দায়ের করা হয়েছে কিন্তু এটি নিছক দুর্ঘটনা। আমরা যদি এই অভিযোগ আরও আগে পেতাম, আমরা আগেই কেস ফাইল করতাম। পুলিশ জানিয়েছে যে ওই যুগল গত বছর অক্টোবরে পালিয়ে গিয়েছিল এবং মেয়েটির পরিবার আহমদের বিরুদ্ধে তাকে জোরপূর্বক অপহরণ এবং চাপ প্রয়োগের উপর একটি মামলা দায়ের করে। পরবর্তীতে যখন পুলিশ তাদের খুঁজে পায় এবং তাদের গ্রামে নিয়ে আসা হয়। ওই মেয়েটি আহমদের বিরুদ্ধে যে অপহরণের অভিযোগ ছিল সেটি অস্বীকার করে এবং বলে যে সে তাকে বিয়ে করতে চায়। তখন মেয়েটির বয়স ছিল ১৭ বছর। পরবর্তীতে এই সমস্যাটা মিটে যায় দুই পরিবারের সম্মতিতে। গ্রামপ্রধান ধ্রুব রাজ এক্ষেত্রে পুলিশকে সন্দেহ করছেন। তার মতে, পুলিশের চাপের জন্যই এ মামলাটি নতুনভাবে দায়ের করা হয়েছে। তিনি দুই পরিবারকে সামনা-সামনি বসিয়ে গতবছর বিষয়টির সুরাহা করেছিলেন। ওই গ্রামপ্রধান ছাড়াও জেলা বিজেপি সভাপতির পিতা নাভাল কিশোর, গ্রামের স্বনামধন্য ব্যক্তি নারায়ণ দাস এ ব্যাপারে পুলিশকেই সন্দেহ করছেন। তাদেরও মত, পুলিশের চাপেই মেয়েটির পরিবার মামলা দায়ের করেছে। নাভাল কিশোর জানাচ্ছেন যে এফআইআর নথিভুক্তকরণের কয়েকদিন আগে মেয়েটির বাবাকে পুলিশ তুলে নিয়ে যায়। গত সপ্তাহে ওই মেয়েটির ভাই আমার কাছে আসে এবং বলে যে পুলিশ তার বাবাকে তুলে নিয়ে গেছে। আমি জানাই, আমি এ ব্যাপারে নাক গলাতে চাইছি না। এর পরের দিন জানতে পারি যে লাভ জিহাদের অভিযোগ আনা হয়েছে এবং একটি এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। আরও জানতে পারি যে, আহমেদের বাবা রফিককে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এখন কেন মেয়েটির বাবা এফআইআর করতে যাবে? এ সমস্যা তো মিটে গেছে আগেই! সবিস্ময় জিজ্ঞাসা তার। 

এই পিছড়ে বর্গা গ্রামের প্রায় ১০ শতাংশ পরিবার মুসলিম। স্থানীয় স্কুলের এক শিক্ষক জানাচ্ছেন, এখানে সব সময় আমরা সম্প্রীতির মধ্যে সুখে-শান্তিতে বসবাস করি। কোনও রকম অশান্তি ছিল না। ওই মেয়েটি এবং আহমদের মধ্যে সম্পর্ক তাদের স্কুলে পড়ার সময় থেকেই। এটাকে কেউ লাভ জিহাদ হিসেবে দেখেনি। ২৮ নভেম্বর পুলিশ স্টেশনে গিয়ে যে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে তাতে মেয়েটির বাবা অভিযোগ জানিয়েছে (আসলে তার উপর জোর করে এটা করানো হয়েছে), তার মেয়েকে আহমেদ নাকি ফের ধর্মান্তরণ করাতে চাইছে লোভ দেখিয়ে এবং হুমকি দেওয়া হচ্ছে। যে মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে অন্য এক ছেলের সঙ্গে, তাকে এ ধরনের হুমকি কেন দেওয়া হবে, বুঝতে পারছেন না কেউই। 

গ্রামের সজ্জন ব্যক্তি নারায়ণ দাস এ ব্যাপারে জানিয়েছেন, পুলিশ এটা করে খুব ভুল করল। এর ফলে শুধু যে আহমেদের জীবনটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তা-ই নয়, মেয়েটির শ্বশুরবাড়িও ক্ষেপে উঠেছে। তারাও আর তাদের বাড়িতে মেয়েটিকে রাখবে না। ওর সংসার ভাঙল। মেয়েটির বাবা আমাকে জানিয়েছে যে পুলিশ তাকে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করিয়েছে এবং এখন মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলতে দিচ্ছে না। 


ওই মেয়েটির এপ্রিলে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। তবে পুলিশ দাবি করেছে যে, সে যখন গ্রামে আসে তখন আহমেদের সঙ্গে দেখা করে। তারা নাকি কলকাতায় পালিয়ে যাওয়ার একটা পরিকল্পনা করেছিল। জানিয়েছে, সে ছেলেটিকে বিয়ে করতে চায়। পুলিশের দাবি, আহেদের পরিবার মেয়েটিকে গ্রহণ করবে যদি সে ইসলামে দীক্ষিত হয়। মেয়েটি এতে রাজি হলেও তার পরিবার নাকি রাজি ছিল না। তার ফলে ব্যাপারটি পঞ্চায়েত পর্যন্ত গড়ায় এবং সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, আহমেদের সঙ্গে মেয়েটির বিয়ে তো হবেই না, কোনও ধর্ম পরিবর্তনও হবে না। এর ফলে সেখানেই বিষয়টি মিটে যায়। তারপর পুলিশের এই অতিসক্রিয়তা এবং গ্রেফতারি। পুলিশের দাবি, ওরা দু’জন যোগাযোগ রেখে চলেছে এবং ধর্মান্তরণের জন্য আহমেদ মেয়েটির উপর চাপ দিয়ে চলেছে। মেয়েটির বাবাকে পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়েছিল এবং ছেলেটির বাবা রফিককে প্রহার করা হয়েছে এ বিষয় নিয়ে পুলিশ জানিয়েছে যে মেয়েটির বাবা স্বেচ্ছায় থানায় এসেছিল মামলাটি নথিভুক্তকরণের জন্য। আর রফিককে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে আহমেদের ব্যাপারে। কাউকে মারধর করা হয়নি। তবে পুলিশের সাফাইয়ে বিশ্বাস করছেন না গ্রামের বাসিন্দারা।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only