সোমবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০২০

জানুয়ারি মাস থেকে এ রাজ্যে শরণার্থীদের নাগরিকত্ব প্রদান, ভোটের আগে ধোঁকাবাজি বিজেপির! পড়ুন বিশিষ্টজনদের মত


বিশেষ প্রতিবেদনঃবিজেপির এ রাজ্যের পর্যবেক্ষক কৈলাস বিজয়বর্গীয় বারাসতে বলেছেন, ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে সকল শরণার্থীকে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। কৈলাস বিজয়বর্গীয় এই ঘোষণায় রাজ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার কর্মীরা প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁরা বলছেন, এখানে যারা বসবাস করছেন, তাঁরা সকলেই এদেশের নাগরিক। তাহলে কাদের নাগরিকত্ব দেবেন ? নাগরিকত্ব সংশোধিত আইন সংসদে পাস হলেও তার রুলস তৈরি হয়নি। এ সম্পর্কে রাজনৈতিক ও মানবাধিকার কর্মীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবদুল ওদুদ।


সুজাত ভদ্র


সুজাত ভদ্র ,মানবাধিকার কর্মী ঃ আমার প্রথম প্রশ্ন, দেশের কেন্দ্রীয় সরকার নাগরিকত্ব দেওয়া নিয়ে যে আইন পাস করেছে,ক তার রুলস এখনও পাস হয়নি। আইন পাস হওয়ার ৬ মাসের মধ্যেই রুলস পাস করতে হয়, তা এখনও হয়নি। পরে আবার তিন মাস সময় বৃদ্ধি করা হয়ে ছিল সেটাও পেরিয়ে গেছে। আমাদের দেশের সংবিধান অনুযায়ী, এভাবে কখনও কাউকে নাগরিকত্ব দেওয়া যায় না। কাকে দেবে তো পরের কথা। এ রাজ্যের কাকে নাগরিকত্ব দেবে, তার কোনও তালিকাও নেই। অন্যদিকে, মতুয়ারা চেঁচাচ্ছে হয়তো তাদের লোক দেখানোর জন্য কিছু দেবে। কেন না ভোটের আগে তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এখনো কেসটা পূরণ হয়নি। যদিও মতুয়াদারে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড সবই রয়েছে। তারা একটি আই কার্ড চাইছে, হয়তো সেটা দেওয়ার কথা বলছেন, বিজেপি রাজ্য পর্যবেক্ষক বিজয়বর্গীয়। 

আমি মনে করি, এটা ভোটের একটি স্ট্যান্ডবাজি। একটি দল ভোটের নামে সম্পূর্ণ মিথ্যাচার করে চলেছে। মানুষকে নাগরিকত্ব দেওয়ার নামে ভাওতাবাজি দিচ্ছে। ভোটের আগে ‘হিন্দুভোট’ তাদের দিকে চলে আসে সেই উদ্দেশ্যে মানুষকে ভূল বোঝাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে যারা অত্যাচারিত হয়ে এখানে চলে এসেছে তাদের মন জয় করার জন্য বলছে। বিজয়বর্গীয়রা মুসলমানদের উইপোকার মতো মারার জন্য এই কাজ করছে । তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে গোটা দেশজুড়ে আন্দোলন চলছে আগামী দিনেও চলবে। করোনা ভাইরাসের কারনে কিছুটা কম হলেও আগামীতে আরও জোরদার আন্দোলন শুরু হবে। 

তবে একটা কথা, দেশে কৃষকরা যে আন্দোলন শুরু করেছে, তাতে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার বাধ্য হবে নয়া কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে। বিজেপি মানুষের অসুবিধের কথা চিন্তা করে না। তারা চায় মেরুকরনের রাজনীতি। নাগরিকত্ব নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছেন বিজয়বর্গীয়, এর ফলে নতুন করে অশান্তির সৃষ্টি হবে। 



অধীর রঞ্জন চৌধুরি


অধীর রঞ্জন চৌধুরি,প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতিঃবিজেপি নেতা কৈলাস বিজয়বর্গীয় ঘোষণা করেছেন, জানুয়ারি মাস থেকে নাগরিকত্ব দেওয়ার কাজ শুরু করবে কেন্দ্রীয় সরকার। বাংলাদেশ থেকে আগতদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। আমি মনে করি এটা বিজেপির আরও একটা গিমিক। কাকে দেবে নাগরিকত্ব। যাদের ভোটে বিজেপি এ রাজ্যে ১৮টা এমপি পেয়েছে, তাদের নাগরিকত্ব দেবে? বাংলার মানুষকে এত বোকা ভাববেন না। বিজেপির মিথ্যাচার এ রাজ্যে চলবে না। যাঁরা আগে বাংলাদেশ থেকে এসেছেন তাঁদের সবার নাগরিকত্ব আছে। সবার ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড, আধার কার্ড সবই আছে। তাহলে বিজেপি নেতারা নতুন করে কী দেবে? প্রত্যেকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা আসবে এই বিজেপি বলেছিল। আর নুতন করে মিথ্যাচার করবেন না। বাংলার মানুষ এসব ভালোভাবে বোঝে। এবার বাংলায় তৃতীয় শক্তি উদয় হবে। 






মুহাম্মদ সেলিম


মুহাম্মদ সেলিম,সিপিএম নেতাঃ এক বছর আগে থেকে নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য বলে আসছে বিজেপি। কিন্তু সেটা সম্ভব নয় তারাও ভালো করে জানেন। তারা কারও  নাগরিকত্বও দিতে পারবে না। আবার এ রাজ্য থেকে কাউকে তাড়াতেও পারবে না। ভোটের আগে এটা একটা ভাওতা বলে আমি মনে করি। বিজেপি মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোটকে ধরে রাূতে এই প্রচার চালাচ্ছে।এখন পর্যন্ত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের চূড়ান্ত রুলস তৈরি হয়নি। কাজেই বলা যেতে পারে এটা সম্পূর্ণ ধাপ্পাবাজি দিয়ে মানুষকে ভুল বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এ রাজ্যে নাগরিকত্ব নিয়ে কোন সমস্যা নেই। বিজেপি কিছু মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য এই অপপ্রচার শুরু করেছে। অসমে নাগরিকত্ব নিয়ে রাজনীতি ঘুঁটি সাজিয়েছে। ধর্ম ও ভাষাকে হাতিয়ার করে ক্ষমতায় এসেছে।সেখানকার মানুষ বুঝতে পারছে বিজেপি আসলে কি চায়। এ রাজ্যে বর্গী হানা দিচ্ছে, আমাদের সে ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। তাদের উদ্দেশ্য কখনো পূরণ হবে না।



প্রদীপ ভট্টাচার্য


প্রদীপ ভট্টাচার্য,সাংসদঃ বিজেপির রাজ্য পর্যবেক্ষক কৈলাস বিজয়বর্গীয় ইচ্ছে করলেই এ রাজ্যের মানুষকে নাগরিকত্ব দিতে পারেন না। এর একটি নিয়ম রয়েছে। সেই নিয়ম অনুযায়ী কাজ হবে। কিন্তু কেন্দ্রের বিজেপি সরকার সেই আইনই এখনও ঠিক করতে পারেনি। কাজেই জানুয়ারি মাসে যে নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন বিজয়বর্গীয় সেটা সম্পূর্ণ মিথ্যে কথা। ভোটের আগে নাগরিকত্বের প্রশ্ন তুলে কিছু মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চাইছে। আমরা বিজেপির সেই কাজকে সফল হতে দেব না। বিজেপির এটা খাস তালুক নয় যে, তারা যা ইচ্ছামতো করবে । আর তা আমাদের মেনে নিতে হবে। মানুষ সঠিক সময় এর জবাব দেবে।



হাফিজ আলম সাইরানি


হাফিজ আলম সাইরানি,ফরওয়ার্ড ব্লক নেতাঃ গত লোকসভা নির্বাচনের সময় বিজেপি মতুয়াদের নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতিগুলি পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাই নতুন করে নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রশ্ন তুলছে। মতুয়ারা এখন বিজেপি নেতৃত্বকে ধরেছে তাদের নাগরিকত্বের পরিচয়পত্রের জন্য। আর তার জন্যই নতুন করেই নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা সামনে আনছে বিজেপি। এটা কেবলমাত্র মানুষকে ধোকা দেওয়ার জন্য করা হচ্ছে। সামনে বিধানসভা নির্বাচন, সেদিকে লক্ষ রেূে বঙ্গ বিজেপি ভোটের রাজনীতি শুরু করেছে। মানুষকে বিপদে ফেলার রাজনীতি শুরু করেছে। নতুন করে নাগরিকত্ব দেওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই। যারা এই রাজ্যে বসবাস করে তাদের প্রত্যেকের ভোটার কার্ড, আধার কার্ড রয়েছে। সকলে এ দেশের নাগরিক। তবে একটা প্রশ্ন কেউ যদি নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেন, তার পর দেখা গেল ওই ব্যক্তি ইতিমধ্যেই এ দেশে জমিজমা কিনেছেন। তাহলে ওই ব্যক্তির জমিজমার কী হবে। যিনি বিক্রি করেছেন তিনি কোর্টের দ্বারস্থ হতেই পারেন। তিনি তাহলে কি বলবেন ভুল তথ্য দিয়ে এ দেশে জমি কিনেছেন? তাহলে আইনের চোখে ওই ব্যক্তি অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন। বিজেপি আসলে কাদের নাগরিকত্ব দিয়ে চাইছেন সেটাও ভেবে দেখার বিষয়।


 


ছোটন দাস


ছোটন দাস,মানবাধিকার কর্মীঃ আমরা সকলেই জন্মসূত্রে এ দেশের নাগরিক। এখানেই বসবাস করে আসছি। তাহলে নতুন করে কাদের নাগরিকত্ব দেবে বিজেপি? এ রাজ্যের যাঁরা বসবাস করেন তাঁদের প্রত্যেকের ভোটার কার্ড,আধার কার্ড, ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে পড়াশোনা করে কেউ চাকরি কেউ ব্যবসা করছেন। তা হলে বিজেপি হঠাৎ করে কাদের নাগরিকত্ব দেবে। আমি মনে করি এটা একটা বোকা বানানোর সহজ রাস্তা বানাতে চাইছে বিজেপি। বাংলায় মেরুকরণের রাজনীতি শুরু করছে বিজেপি। এখানে যাঁরা বসবাস করছেন, তাঁরা কেউ বিদেশি নন প্রত্যেকের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে। বিধানসভা ভোটের আগে নাগরিকত্ব প্রশ্ন তুলে কিছু মানুষকে ব্যস্ত করার কৌশল শুরু করেছে। বিজেপির এই অপচেষ্টা রুখবে বাংলার মানুষ।    


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only