বৃহস্পতিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২০

অখন্ড বাংলার নারী শিক্ষার দিশারী রোকেয়া, ইন্তেকাল দিবসের সভায় বললেন বিশিষ্টরা



আসিফ রেজা আনসারী,কলকাতাঃরোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন বা বেগম রোকেয়ার জন্ম ও ইন্তেকালের দিন। ১৯৩২ সালের এ দিনেই ৫২ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। এ দিন নারী জাগরণের অগ্রপথিক রোকেয়ার স্মরণে নানান অনুষ্ঠান ও আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়। দৈনিক ‘পুবের কলম’-এর তরফেও রোকেয়ার ১৪০তম মৃতু্যবার্ষিকী ও জন্মতিথিতে অনুষ্ঠিত হল বিশেষ আলোচনাসভা। সেই মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানে উঠে আসে নানান বিষয়।

প্রসঙ্গত, ইসলাম ধর্ম নারীকে অনেক মর্যাদা দিয়েছে। নবী ইব্রাহিমের পত্নী ‘মা হাজেরা’র সুন্নাহ অনুসারে আজও হজ ও উমরাহ’তে শায়ী (সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সাত বার দৌড়ানো) করতে হয়। প্রায় সব ধর্মেই অবক্ষয় থাকে,তেমনি এক সময় মহিলাদের ঘোমটা বন্দি করে রাখার চল শুরু হয়েছিল। সেই অবগুণ্ঠন ভেঙে প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নারী মুক্তির পথপ্রদর্শন করেন বেগম রোকেয়া। তিনিই বাঙালি নারী জাগরণের প্রতীক ও পথদ্রষ্টা। বুধবার বিকালে ১০০বি কড়েয়া রোডের চতুর্থ তলায় দৈনিক পুবের ‘কলম’ পত্রিকা আয়োজিত রোকেয়া স্মরণ অনুষ্ঠানে এমনই কথা উঠে এলো বিশিষ্টদের আলোচনায়। একজন নারী কীভাবে অনৈসলামি অবরোধ প্রথার বিরুদ্ধে মেয়েদের শিক্ষা ও সংস্কৃতি জগতে জায়গা দখলের পথ দেখিয়েছিলেন,সে কথাই এ দিন উঠে আসে। একইসঙ্গে আরও বেশি বেশি করে রোকেয়ার জীবনাদর্শ চর্চার কথাও ওঠে। স্কুল-কলেজের পড়ুয়াদের কাছে রোকেয়ার লেখা ও জীবন-ইতিহাস তুলে ধরার উপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।

এ দিন বেগম রোকেয়ার উপর বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট লেখক ও বিশ্বকোষ পরিষদের সম্পাদক পার্থ সেনগুপ্ত, পুবের কলম পত্রিকার সম্পাদক ও প্রাক্তন সাংসদ আহমদ হাসান ইমরান, বঙ্গীয় সংখ্যালঘু বুদ্ধিজীবী মঞ্চের সভাপতি ওয়ায়েজুল হক, আইনজীবী তন্ময় ঘোষ, শিক্ষাবিদ আবদুল ওহাব, মুহাম্মদ কামরুজ্জামান প্রমুখ। এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন, অধ্যাপক জাফর সাদেক আলি, নাসিমা হালিম, জিয়াউর রহমান, মোখতার আলি, রুমা পারভিনারা প্রমুখ।

এ দিন রোকেয়া স্মরণ অনুষ্ঠানে পুবের কলমের সম্পাদক আহমদ হাসান ইমরান প্রথমেই ইসলাম ধর্মে নারীর মর্যাদার উপর আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, সিরাজ উদ-দৌলা, টিপু সুলতানের পরাজয়,সিপাহী বিদ্রোহের পর ইংরেজদের অত্যাচার নেমে আসে। সেই সময়েই রোকেয়ার জন্ম হয়েছিল এক রক্ষণশীল পরিবারে। তাদের মাথায় কে ঢুকিয়ে দিয়েছিল যে, মেয়েদের শুধুমাত্র কোরআন শরীফ পড়তে হবে। অন্যকিছু চলবে না। তিনি উল্লেখ করেন, তিউনেশিয়ার দুই বোনের উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা। এরপরেই আহমদ হাসান ইমরান বলেন, বেগম রোকেয়া সেই রকমই একজন বহ্নিশিখা। অধুনা বাংলাদেশের রংপুরে জন্মগ্রহণ, বেড়ে ওঠা, বাংলা ও ইংরাজি শেখার দিকটি তুলে ধরেন তিনি। শিক্ষাবিস্তারের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা ও প্রতিকূল প্রতিস্থিতির পরও নারী-সমাজের মুক্তির জন্য তাঁর যেসব অসামান্য কাজ ছিল তা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, রোকেয়া ইসলাম অনুরাগী ছিলেন। তিনি মুসলিম মহিলাদের অবরোধ প্রথার বিরোধী ছিলেন। রোকেয়া হিজাব জাতীয় শালীন পোশাক পরতেন। ডিসেম্বর মাসে শীতের দিনে অযু করে নামাযের পাটিতেই তিনি ইন্তেকাল করেন। আহমদ হাসান ইমরান বলেন, বেগম রোকেয়াকে অনেক বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে কাজ করতে হয়েছিল। অনেক সমালোচনার মধ্যে দিয়েই কাজ করতে হয়েছে। রাজা রামমোহন রায় বা বিদ্যাসাগর কাজ করতে গিয়ে বহু মানুষের সাহায্য পেয়েছিলেন, কিন্তু কোনও সাহায্য পাননি রোকেয়া। আজকে পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও বাংলাদেশে যে নবজাগরণ এসেছে, তা রোকেয়ার হাত ধরেই এসেছে। রোকেয়াকে নিয়ে তেমন চর্চা হয়নি, পরে ১৯৮৬ সালে নতুন করে চর্চা শুরু হয়। আনন্দবাজারে গৌরী আয়ুবের একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল এবং কলম-এ রোকেয়া নিয়ে লেখা হয়। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, সোদপুরে আবদুর রহমানের বাগান বাড়িতে তাঁকে সমাহিত করা হয়েছিল, কিন্তু আজ সেই কবরের অস্তিত্ব নেই। আমি নিজে দেখানে গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারি, পানিহাটি বালিকা বিদ্যালয় নির্মাণের জন্য খোঁড়াখুঁড়ির সময় ওখানে কঙ্কাল পাওয়া গিয়েছিল। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সেই কঙ্কাল গঙ্গায় ফেলে দেওয়া হয়েছিল। মনে করা হচ্ছে সেটিই বেগম রোকেয়ার কঙ্কাল। তাঁর আক্ষেপ, বাংলাদেশ জ্যোতি বসুর শ্বশুরবাড়ি, সুচিত্রা সেনের পৈতৃক-ভিটা সংরক্ষণ করতে পারে, কিন্তু আমরা রোকেয়ার কবরস্থানের স্মৃতিচিহ্ন রাখতে পারিনি। 

অন্যদিকে, পার্থ সেনগুপ্ত দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ও সমাজ সংস্কারে মুসলিমদের অবদান বিষয়ে আলোকপাত করেন। তিনি নারী শিক্ষাবিস্তারের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা, লেখনীর মাধ্যমে সমাজ সচেতনতা তৈরি ও নারী ক্ষমতায়নে রোকেয়ার ভূমিকার দিকটি উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, মা রোকেয়া শুধু শিক্ষা প্রসার নয়, উনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়। সংসারের ঘানি টানা বা অলংকারের মধ্যে আবদ্ধ না থেকে মেয়েরা যে স্বাধীনতা চায়, রোকেয়া এমনটাই চেয়েছিলেন। 

ওয়ায়েজুল হক বলেন, বেগম রোকেয়া বাংলার মহিলাদের মুক্তির প্রথম কণ্ঠস্বর। তিনি শুধু মুসলিম মহিলাদের জন্যেই কাজ করেননি, সকলের জন্যেই কাজ করেছেন। তাঁর প্রশ্ন,বিদ্যাসাগর বা রামমোহনের ক্ষেত্রে তো আমরা হিন্দু সমাজ সংস্কারক বলি না,তবে রোকেয়াকে কেন শুধু মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত বলা হবে? বাংলার নবজাগরণে রোকেয়া যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছেন তা সকলের সামনে আরও বেশি বেশি করে তুলে ধরার কথা বলেন ওয়ায়েজুল হক। 

অধ্যাপক ও আইনজীবী তন্ময় ঘোষ, শিক্ষাবিদ মুহাম্মদ কামরুজ্জামান ও অন্যান্যরাও এ দিন রোকেয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। তাঁরাও রোকেয়া বিষয়ে আরও বৃহত্তর আলোচনা ও বর্তমান সমাজের কাছে তুলে ধরার উপর গুরুত্বারোপ করেন।

এ দিন কড়েয়া রোডে পুবের কলম আয়োজিত রোকেয়া স্মরণ অনুষ্ঠান আধুল ওহাবের পবিত্র কুরআন পাঠের মাধ্যমে শুরু ও দোয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কাজী নজরুল ইসলামের ‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা’ গানটি পরিবেশন করেন আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার সহায়িকা নাসিমা হালিম।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only