বৃহস্পতিবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২০

উত্তরপ্রদেশে পিঙ্কির বিয়ে, লাভ জেহাদ আইন, স্বামীকে গ্রেফতার ও ‘গর্ভপাত’



পুবের কলম প্রতিবেদকঃউত্তরপ্রদেশে বিবাহের জন্য ধর্ম পরিবর্তন করাকে অপরাধ ঘোষণাকারী আইন অনুযায়ী মোরাদাবাদে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে তা আইনের অপব্যবহারের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়। পিঙ্কি (নাম পরিবর্তিত) নামের এক তরুণীকে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ তার স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন করে মহিলা আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠিয়েছিল।  

উত্তরপ্রদেশে আন্তঃধর্মীয় বিবাহ রোধ করতে বিতর্কিত আইনের আওতায় পিঙ্কিই প্রথম যাকে তার স্বামী থেকে পৃথক করা হয়েছে। পিঙ্কির অভিযোগ, তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছিল এবং মহিলা আশ্রয়কেন্দ্রে একটি ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে তার গর্ভপাত হয়েছে।

মোরাদাবাদের পুলিশ এখনও ওই তরুণীর গর্ভপাতের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি। মোরাদাবাদের এসএসপি প্রভাকর চৌধুরি সংবাদ সংস্থা বিবিসিকে বলেন, আদালতে দেওয়া বিবৃতিতে মহিলা স্বেচ্ছায় বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার কথা বলেছেন। এর ভিত্তিতে তাকে শ্বশুরবাড়ির হাতে তুলে দেওয়া  হয়েছে।   

মোরাদাবাদের এসপি প্রভাকর চৌধুরির মতে,‘নারী নিকেতনে পেটে ব্যথার কথা বলেছিল, তারপরে তার চিকিৎসা করা হয়েছিল।’ গর্ভপাত সম্পর্কে প্রশ্নে মোরাদাবাদ পুলিশের মুখপাত্র বলেন, হাসপাতালের চিকিৎসকরা পুলিশকে বলেছিলেন যে গর্ভবতী নিরাপদ, পুলিশ এ সম্পর্কে নতুন কোনও তথ্য পায়নি। 

ওই তরুণীর স্বামীকে রাজ্যের নয়া আইনের ভিত্তিতে বিচার বিভাগীয় হেফাজতে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আদালতের আদেশের পরে তার মুক্তি পাওয়া নির্ভর করছে। 

২২ বছর বয়সি পিঙ্কি বলেন, তিনি সাত সপ্তাহ ধরে গর্ভবতী ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমাকে ৫ ডিসেম্বর রাত আড়াইটায় নারী নিকেতনে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে আমাকে ‘নির্যাতন’ করা হয়েছিল।’   

নারী নিকেতনে হঠাৎ আমার পেটে ব্যথা হয়েছিল। যখন আমার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে তখন আমাকে একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা আমাকে ইঞ্জেকশন দিয়েছিলেন। আমার খুব রক্তক্ষরণ হয়েছিল। আদালতে আমার জবানবন্দি ছিল। আমার স্বাস্থ্যের আবার অবনতি হলে আমাকে ফের হাসপাতালে ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়েছিল। এ সময়ে আমার গর্ভপাত হয়েছে। 

পিঙ্কিকে অবশ্য কোন ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়েছিল এবং ওই ইঞ্জেকশন গর্ভপাতের কারণ হতে পারে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পিঙ্কি বলে, ‘প্রথম আল্ট্রাসাউন্ডে আমার গর্ভাবস্থা ঠিক ছিল, তবে ইঞ্জেকশনের পরে আমার গর্ভপাত হয়েছিল।’ স্থানীয় আদালতের আদেশের পরে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ পিঙ্কিকে তার শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়েছে।  

মোরাদাবাদের এসপি প্রভাকর চৌধুরি বলেন,  ‘বিজনৌরের বালা দেবী কন্ট থানায় নতুন আইনের আওতায় ৫ ডিসেম্বর এফআইআর করেছিলেন। তিনি দু’জনের বিরুদ্ধে বিয়ের অভিপ্রায়ে মেয়েকে ধর্মান্তরিত করার অভিযোগ করেছিলেন। এফআইআর নথিভুক্ত হওয়ার পরে ওই দুই যুবককে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।’  

পুলিশের আধিকারিক প্রভাকর চৌধুরির মতে,  মেয়েটির সুরক্ষা বিবেচনায় তাকে নারী নিকেতনে পাঠানো হয়েছিল। ওই তরুণী আদালতের সামনে এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে তিনি স্বেচ্ছায় ধর্ম পরিবর্তন করে যুবককে বিয়ে করেছেন। তিনি তার শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। আদালতের আদেশের পরে তাকে তার শ্বশুর বাড়িতে পাঠানো হয়েছে।  

পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তে জানা গেছে, ওই তরণীর বয়স ২২ বছর এবং তিনি একজন প্রাপ্তবয়স্ক। তিনি পুলিশের সামনেও তার শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। 

পুলিশ জানিয়েছে, দুই অভিযুক্ত বর্তমানে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে রয়েছে এবং পুলিশের তদন্ত চলছে। সিআরপিসি ১৬৪ ধারার অধীনে দায়ের করা তরুণীর জবানবন্দি খতিয়ে দেখা হবে,তারপরে প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।  

পুলিশ আরও জানিয়েছে, পিঙ্কি গত জুলাইয়ে রশিদ নামে এক যুবককে বিয়ে করেছিলেন। 

রাজ্যে নতুন আইনের আওতায় দু’জনকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য পুলিশ সমালোচিত হয়েছে। কিছুদিন আগে মেয়ের শাশুড়ি নাসীম জাহানও তার গর্ভপাতের বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন। যদিও কর্তৃপক্ষ তখন তার অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। আধিকারিকরা জানান, তরুণীকে দু’বার হাসপাতালে নেওয়া হলেও তার গর্ভাবস্থা নিরাপদ।   

সোমবার মোরাদাবাদের জেলা হাসপাতালের ডাঃ বিমলা পাঠক সাংবাদিকদের বলেন, সকালে যখন তাকে প্রথমবারের জন্য আনা হয়েছিল তখন পুরোপুরি ঠিক ছিলেন। পরে যখন তাকে দ্বিতীয়বার আনা হয়েছিল, রক্তের দাগ পাওয়া গিয়েছিল। 

যখন তাকে ভ্রুণের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তিনি বলেন, শিশুর অবস্থা কী, আমরা বলতে পারছি না। হাসপাতালে তার রক্তক্ষরণ হয়নি। তবে তিনি জানিয়েছিলেন যে, নারী নিকেতনে তার রক্তক্ষরণ হয়েছে। আমরা পরীক্ষা করে দেখব। আমাদের কাছে এখনও পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট নেই। তিনি বলেন,  আল্ট্রাসাউন্ডে গর্ভটি দৃশ্যমান তবে এটি নিরাপদ কি না, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে, পিঙ্কি জানিয়েছেন, তিনি ২৪ জুলাই রশিদকে দেহরাদুনে বিয়ে করেছিলেন। তিনি নিজের বিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে ৫ ডিসেম্বর মোরাদাবাদে এসেছিলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিয়োতে পিঙ্কির উপরে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের হামলা করতে দেখা গেছে।  গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, হিন্দুত্ববাদী কর্মীরা আদালত প্রাঙ্গণে পৌঁছে ওই দম্পতিকে থানায় নিয়ে যায়।     

পরে ওই তরুণীর মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ রশিদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। উত্তরপ্রদেশ সরকার গত ২৯ নভেম্বর অবৈধ ধর্মান্তর নিষিদ্ধ অধ্যাদেশ পাশ করেছে। এর আওতায় আন্তঃধর্মীয় বিবাহ করা দম্পতিদের বিয়ের দু’মাস আগে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ওই অধ্যাদেশের অধীনে অবৈধ ধর্মান্তরিত হওয়ার ক্ষেত্রে দশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে এবং এটি একটি জামিনযোগ্য অপরাধ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only