শুক্রবার, ১ জানুয়ারী, ২০২১

গুরুদেবের প্রেরণার ফসল আলাপনী মহিলা সমিতি সিল করে বন্ধ করলো বিশ্ব ভারতী!




দেবশ্রী মজুমদার, শান্তি নিকেতন, ১ জানুয়ারি: ঐতিহ্যবাহী আলাপনী মহিলা সমিতি সিল করে বন্ধ করে দেওয়ায় ফের বিতর্কে বিশ্বভারতী। এই নতুন বিতর্কে বিশ্ব ভারতী কর্তৃপক্ষের অনমনীয় মনোভাবের আরেক নিদর্শন বলে মনে করছেন বিভিন্ন মহল। 

মূলতঃ ঠাকুরবাড়ির মহিলাদের নিয়ে গঠিত আলাপিনী মহিলা সমিতি। শুক্রবার তার ঘর কার্যত সিল করে দেয় বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ।  

প্রতিবাদে পাঠভবন ঢোকার মুখে ঘরের সামনে বসেই প্রতিবাদে মুখর হন বিশ্বভারতীর প্রাক্তনীরা।

শুক্রবার সকালে মহিলা সমিতির সদস্যরা বিশ্বভারতী ক্যাম্পাসে পৌঁছে দেখেন তাদের অধিবেশন কক্ষ টি দরজায় তালা দিয়ে সিল করে নোটিশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে বিশ্বভারতীর পক্ষ থেকে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে সকাল থেকেই বিশ্বভারতীর পাঠ ভবন গেটের সামনে অবস্থান বিক্ষোভ শুরু করেন মহিলা সমিতির সদস্যরা।

জানা গেছে, ১০ ডিসেম্বর ‘আলাপিনী মহিলা সমিতি’-কে ক্যাম্পাসের মধ্যে থাকা তাদের অধিবেশন কক্ষ ‘নতুন বাড়ি’ ছেড়ে দেওয়ার নোটিস দেয় বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ। আলাপনী মহিলা সমিতির ১০৪ বছরের ঐতিহ্যের উপর এই আঘাত শুধু অর্থনৈতিক কারণে বলে জানা গেছে। কিন্তু তা কতটা যুক্তিসঙ্গত সে ব্যাপারে মুখ খোলে নি বিশ্ব ভারতী। এর আগে ৩১ডিসেম্বরের মধ্যে অধিবেশন কক্ষ ছাড়ার নির্দেশ দেয় কর্তৃপক্ষ। যদিও তার পরেও, ঘর না ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয় আলাপিনী ।গোটা ঘটনায় হস্তক্ষেপ চেয়ে ইতিমধ্যেই বিশ্বভারতীর আচার্য তথা প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দেওয়া হয়েছে সমিতির পক্ষ থেকে। এমনকি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যপাল এবং রাষ্ট্রপতিকেও চিঠি দেওয়ার কথা ভাবছে বিশ্ব ভারতী কর্তৃপক্ষ। শান্তিনিকেতন থানাতেও গোটা ঘটনার উল্লেখ করে, অধিবেশন কক্ষে সমিতির নিজস্ব সম্পত্তির একটি তালিকা জমা দেওয়া হয়েছে, বলে জানা গেছে। তবে, সম্ভবত বহুমূল্য ছবিগুলি আর সমিতির ঘরে নেই।

জানা গেছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুপ্রেরণায় ও তাঁর দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহযোগিতার ১৯১৬ সালে বিশ্বভারতীতে গড়ে উঠেছিল "আলাপিনী মহিলা সমিতি" । কবিপত্নী, পুত্রবধূ, ভাতৃকন্যা থেকে শুরু করে অমর্ত্য সেনের মা-সহ বিশিষ্টরা এই সমিতির সদস্যা ছিলেন । 

 সমিতির উদ্যোগে "শ্রেয়শী" নামক একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়ে আসছে । এই পত্রিকাটির নামকরণ করেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর । তবে সমিতির নির্দিষ্ট কোনও ঘর ছিল না । বিভিন্ন জায়গায় সমিতির সভা বসত । সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেয়ে ইন্দিরাদেবী চৌধুরানি এই সমিতির সদস্যা ছিলেন ।1956 সালে তিনি বিশ্বভারতীর উপাচার্য হন । তখন আশ্রমের ভিতর পাঠভবনের গায়ে আলাপিনী মহিলা সমিতির জন্য একটি ঘর দিয়েছিলেন । সেই ঐতিহ্যবাহী মহিলা সমিতি কার্যত বন্ধ করে দিল বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ ।

মাটির বাড়ি, খড়ের ছাউনি । এই বাড়িতেই মাসে দু'বার করে বসে মহিলা সমিতির সভা । শান্তিনিকেতন আশ্রমের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত এই সমিতি ।

শুধু তাই নয়, সমাজকল্যাণ এবং সেবা মলক কাজে অংশগ্রহণ করেছেন আলাপিনীর সদস্যারা। আশ্রমের প্রথম দিকে গ্রেসন গ্রিন নামে এক বিদেশিনি আসেন শান্তিনিকেতনে, যিনি ধাত্রীবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি এসে এই ধাত্রীবিদ্যা ও প্রাথমিক চিকিৎসা শেখান আশ্রমের মেয়েদের। সেই সময় সমিতির সদস্যা কিরণবালা সেন ও ননীবালা দেবী ধাত্রীবিদ্যা শিখে আশ্রম ও আশ্রম সংলগ্ন এলাকার প্রসূতিদের সেবায় নিয়োজিত হন। বছর কয়েক আগে পর্যন্তও ফি বছর রবীন্দ্র সপ্তাহে একটি দিনের অনুষ্ঠানের আয়োজন ও পরিবেশনা এবং শারদোৎসবে নাটক পরিবেশন করতেন সমিতির সদস্যারা। 


সমিতির অভিযোগ, বর্তমান উপাচার্য আসার পরে সেই পরিসর বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতি বছর ৭ পৌষ দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেওয়া নাম অনুসারে তাঁরা 'শ্রেয়সী' নামে একটি সাহিত্য পত্রিকাও প্রকাশ করেন। পাঠভবনের ছাত্রীনিবাস ও ক্যান্টিনে গিয়ে ছাত্রীদের খাওয়াদাওয়া ও পোশাকেরও নিয়মিত তদারকি করেন সমিতির সদস্যারা। মেধাবী পড়ুয়াদের বইও উপহার দেওয়া হয়।



 সমিতির অন্যতম সদস্য শর্মিলা রায় পোমো বলেন, “এখনকার প্রশাসক আর্থিক দিকটা নিয়ে চিন্তা করেন বেশি। ১৯৫৩ সালে আলাপিনীর সদস্যারাই আনন্দ পাঠশালার সূচনা করেন, যা এখন ‘মৃণালিনী আনন্দ পাঠশালা’ নামে পরিচিত। এখান থেকে প্রতি বছর বিশ্বভারতীর একটা ভাল পরিমাণ টাকা আয় হয়।’’


আলাপিনী মহিলা সমিতির সদস্যা অপর্ণা দাস-মহাপাত্র ও জয়তী ঘোষ বলেন, "আমরা গুরুদেবের সংস্কৃতির ধারাকে ধরে রেখেছিলাম । হঠাৎ করে এই ঐতিহ্যবাহী আলাপিনী মহিলা সমিতির ঘর বন্ধ করে দেওয়ায় আমরা অবাক । কোনও উপাচার্য এতকাল এই ধরনের কাজ করেননি । বরং আমাদের সহযোগিতা করেছিলেন ।"


 যদিও এব্যাপারে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ মুখে কুলুপ এঁটেছে

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only