মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

সম্প্রীতির উজ্জ্বল প্রতীক ডেভিড ম্যাককাচন

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে ডেভিড ম্যাককাচন


বিশেষ প্রতিবেদনঃদীর্ঘ সময় বাংলায় বাস করে এখানকার পরিবেশের সঙ্গে দিব্যি মানিয়ে নিয়েছিলেন ডেভিড ম্যাককাচন। কোট-প্যান্ট নয়,পছন্দ করতেন পাঞ্জাবি-পায়জামা পরতে,বেলের পানা,অল্প মিষ্টি দেওয়া পায়েস,গরম গরম তালের বড়া খেতেন তৃপ্তি করে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের রিডার পদ ও ইংল্যান্ডের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিডিটিং লেকচারারের দায়িত্ব সামলে টেরাকোটা এবং ইটের তৈরি মন্দির-মসজিদের স্থাপত্য নিয়ে গবেষণার কাজ করেছেন তিনি। লিখছেন সুরঞ্জন মিদ্দে।

সুরঞ্জন মিদ্দে



ইংল্যান্ডের কভেন্ট্রিতে জন্ম, কেমব্রিজের ছাত্র হয়েও ভারতের প্রতি প্রবল কৌতূহল। বিলেতে থাকাকালীন ‘টেগোর সোসাইটি’র একজন সক্রিয় সদস্য। রবীন্দ্রনাথ ও ভারতবর্ষের প্রতি প্রবল প্রেম তাঁকে শেষপর্যন্ত, রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতীতে টেনে আনে। ১৯৫৭ খ্রিস্টাধে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার ডিগ্রি পাশ করেই ভারতে আসেন বিশ্বভারতীর ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। তিন বছরের মধ্যে ১৯৬০ খ্রিস্টাধে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে তাঁকে নিয়ে আসেন, সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু। ১৯৬০ থেকে ১৯৭২,মাত্র ১১ বছরের মধ্যে তিনি হয়ে উঠলেন বাংলার মন্দির-মসজিদ গবেষক। তিনি হলেন ডেভিড ম্যাককাচন (১৯৩০-১৯৭২)।

মাত্র ৪১ বছর ৫ মাসের জীবন সংগ্রামে,মন্দির ও পটচিত্র শিল্প নিয়ে যে গবেষণা করে গিয়েছেন,তা আজও প্রাসঙ্গিক ও আকরগ্রন্থের দিশারি। এদেশে অবহেলা,অনাদরে রক্ষিত বাংলার পোড়ামাটি অলঙ্কারযুক্ত মন্দিরের শিল্প-সুষমা তাঁকে গভীরভাবে আকর্ষণ করে। ১১ বছর ধরে তিনি উভয় বাংলার গ্রাম-গ্রামান্তরে ঘুরেছেন,মন্দিরের স্থাপত্য সন্ধানে। পদে পদে বিপদের ঝুঁকি নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে গিয়েছেন। পূর্ব বাংলার মন্দির-মসজিদ নিয়ে তিনিই প্রথম এক বিস্তারিত বিবরণও ব্যাখ্যা করেন। শুধু উভয় বাংলাই নয়,তুলনামূলক গবেষণার জন্য ডেভিড ভারতের অন্যান্য প্রদেশে সরজমিন গবেষণা চালিয়েছেন। তবে বাংলার পোড়ামাটির অলঙ্কারমণ্ডিত মন্দিরের দিকে তিনি বেশি ঝুঁকেছিলেন। বাংলার মন্দির নিয়ে এমন দুঃসাহসিক অভিযান,এর আগে কেউ করেনি। 

ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের মন্দির-মসজিদ নিয়ে এমন ‘ফটোগ্রাফিক ডকুমেন্টেশন’,আমাদের বিস্ময় জায়গায়। ডেভিডের বিপুল তথ্যসম্ভার,শুধু ভারত নয়,ইউরোপের সুধিমহলে আলোড়ন ওঠে। সরল অনাড়ম্বর জীবন-যাপনের মধ্যে কোনও সরকারি সাহায্য না নিয়ে,অধ্যাপনার অর্থ দিয়ে,বহু কষ্ট ও দৈন্যের মধ্যেও মন্দির-মসজিদ নিয়ে গবেষণা-অভিযান চালিয়ে গিয়েছেন। ডেভিড ম্যাককাচন ভারতীয় প্রত্নতাত্বিক সমীক্ষা দফতরকে অতিক্রম করেছেন। উভয় বাংলার মন্দিরের সঠিক তথ্য যা আজ পর্যন্তও পাওয়া যায়নি, সেই নতুন তথ্য-ভাণ্ডার উপহার দিয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়েছেন। তাঁর গবেষণামূলক প্রবন্ধে মন্দিরের স্থাপত্য বিবর্তন ও মন্দিরের অলংকরণ বিন্যাস এক আশ্চর্য নিপুণ অনুশীলনের ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। 

শুধু বাংলার মন্দির গবেষণা নয়,তিনি এদেশের অবহেলিত চিত্রকর-পটুয়া শিল্পীর জীবন ও কর্মকে নিয়ে গবেষণা চালিয়েছিলেন। দরিদ্র পটশিল্পীদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের উদ্যোগে নিয়েছিলেন। এ ছাড়া বাংলার গ্রাম গ্রামান্তরে ছড়িয়ে থাকা অজানিত প্রাচীন ভাস্কর্য ও মূর্তির বিপুল তথ্য সংগ্রহে ব্রতী হয়েছিলেন। তাঁর দুটি গ্রন্থòLate Mediaeval Temples of Bengal ç Patuas and Patua Art in Bengaló তাঁর মৃত্যুর ৫০ বছর পরও আকরগ্রন্থ হিসেবে সমাদৃত।

ডেভিড ম্যাককাচন দুই বাংলায় ১১ বছর ধরে প্রায় পাঁচ হাজার মন্দিরের সন্ধান পেয়েছিলেন। তিনি দেখিয়েছেন, বাংলার আঞ্চলিক মুসলিম স্থাপত্যের সঙ্গে বাংলার মন্দির স্থাপত্যের যোগাযোগ আছে। বাংলার আঞ্চলিক মুসলিম ধর্মীয় স্থাপত্যের অলঙ্করণের বিন্যাস ও বিষয়বস্তু আঞ্চলিক মন্দিরের দেহসজ্জায় সাদৃশ্য আছে। তাঁর প্রচুর তথ্য এবং যুক্তিনিষ্ঠ বিশ্লেষণ আর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনও অস্পষ্টতা নেই। তিনি মন্দির-টেরাকোটা সম্পর্কে লিখেছেন, নিশ্চিতভাবেই মুসলিমরাই পাকজ মৃত্তিকার (টেরাকোটা-র) অলঙ্কারকে স্থাপত্য ব্যবহারের রীতি হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে। মুসলিমরাই পঞ্চদশ শতাধীর মসজিদে ও সপ্তদশ শতকের মন্দিরে দৃষ্ট সুক্ষভাবে খোদিত ফলকের প্রচলন করে।’ 

রাজ্য পুরাতত্ত্ব বিভাগের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য হিসেবে ডেভিডের নিজের তোলা আলোকচিত্র দেখিয়ে,তথ্য দিয়ে পুরাকীর্তি রক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। তাঁর প্রায় সব প্রবন্ধের শেষেই থাকত ঐতিহ্যরক্ষার করুণ আবেদন। তিনিই প্রথম প্রমাণ করেন, ভারতের মন্দিরের দেবমূর্তির মুখ,বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। তিনি প্রতিবাদ জানিয়েছেন,ডেভিডের দেখা অনেক পুরাকীর্তিই আজ নিশ্চিত অথবা অবৈজ্ঞানিক সংস্কারেক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে। ডেভিড শুধু লিখে কিংবা আবেদন জানিয়ে ক্ষান্ত হয়ে যাননি। দূর-দূরান্তে গ্রামে যেখানে যান চলে, সেখানে তিনি কখনও সাইকেলে,এমনকী পায়ে হেঁটে পৌঁছে যেতেন,জঙ্গলে ঢাকা মন্দিরে। প্রয়োজনে জঙ্গল পরিষ্কার করা,গ্রামের মানুষকে পুরাতত্ত্বের গুরুত্ব বোঝানো,গাছ-গাছালি বিনাশের জন্য রাসায়নিক সঙ্গে থাকা,সবই তিনি মন ঢেলে করে গিয়েছেন। এমনকী পটশিল্পীদের পটচিত্র বিক্রির ব্যবস্থা করা,শহরে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার মধ্যে,অন্য এক ডেভিডের কথা মনে করিয়ে দেয়। আসলে পুরাকীর্তি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে,মানুষকে দূরে ঠেলে দিয়ে না,মানুষকে কাছে টেনে নিয়ে, মানবিক সম্পর্কের বাতাবরণ সৃষ্টি করতেন,মানবপ্রেমিক ডেভিড, মন্দির-মসজিদ প্রেমিক ডেভিড। 

অকাল প্রয়াণে তাঁর আরোধ্য কাজ শেষ না হলেও,যা তিনি শুরু করেছিলেন,তাঁর মূল্যায়ণ হওয়া জরুরি। তাঁর মৃত্যুর ৫০তম বছর ১২ জানুয়ারি ২০২১ (১৯৭২-২০২১),ডেভিডের মতো সম্প্রীতি প্রতীক,তাঁর জীবন ও সৃষ্টির চর্চা হওয়া উচিত। ডেভিডের মৃতু্যর পর ১৯৭২ খ্রিস্টাধের ২৩ জানুয়ারি,মেদিনীপুর মধ্যপল্লি শিক্ষা নিকেতনের নাম হয়েছিল, ডেভিড ম্যাককাচন স্মৃতি বিদ্যালয়। মেদিনীপুর শহরের দু’মাইল উত্তরে পটশিল্পীদের বাড়ুয়া গ্রামের নাম আজ ডেভিড গ্রাম নামে পরিচিত। 

ডেভিড ম্যাককাচনের নামের সঙ্গে বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের ১২টি চলচ্চিত্রের সংলাপের ইংরেজি অনুবাদ সংলিপ্ত হয়ে আছে। টেরাকোটার আকর্ষণে যে বিদেশি ভারতে আসলেন, আর ফিরে যাননি। তাঁর স্মৃতিতে পি জি হাসপাতালের কাছে খ্রিস্ট্রীয় সমাধিতে,১২ জানুয়ারি আর ১২ আগস্ট,স্মরণ করার ব্যবস্থা করেন,বিশ্বকোষ পরিষদ। আর অতিমারীতেও ‘একুশ শতক’ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হচ্ছে ‘ডেভিড ম্যাককাচন চর্চা নামে একটি বই। যে কলকাতা শহরে তিনি সাইকেল চালিয়ে,টুং টাং শধ করে,মন্দির-মসজিদের স্থাপত্য বিশ্লেষণ করতেন,সেই তিলোত্তমা কি তাঁর মৃত্যুর ৫০তম বর্ষে নীরব থাকবে? 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only