বৃহস্পতিবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০২১

ভারত পথিক ও মানবতাবাদী বিবেকানন্দ



বিশেষ প্রতিবেদনঃসনাতন ধর্মসাধক হলেও জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে স্বামী বিবেকানন্দের গ্রহণযোগ্যতা ছিল ঈর্ষণীয়। ধর্মীয় গোঁড়ামির কলুষতা থেকে তিনি ছিলেন মুক্ত যোগী। এখানেই তিনি বর্তমান সময়ের নামসর্বস্ব সাধকদের থেকে ভিন্ন। লিখছেন পাভেল আমান।

                            পাভেল আমান 



উনবিংশ শতাধীর ভারতের ইতিহাস এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ে আবর্তিত। এই যুগে ভারতের মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন অনেক মহাপ্রাণ, মহাপুরুষ যাঁদের নিরলস কর্ম ও ত্যাগে আমাদের দেশ সামাজিক প্রগতিশীলতার শিখরে পৌঁছে ছিল। সেই মহানুভব, মহৎ গুণান্বিত, ব্যক্তিত্বশালীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মানবতাবাদী,সমাজ সংস্কারক, আধ্যাত্বিক চেতনায় জারিত স্বামী বিবেকানন্দ। ১৮৬৩ সালের ১২ জানুয়ারি কলকাতার এক বাঙালি পরিবারে এই সংস্কারক মহাপুরুষের জন্ম। আমৃত্যু ভারতে প্রচার করেছিলেন মানবতার সহজপাঠ, যেখানে সমস্ত ধর্ম মিলেমিশে একাকার। 

স্বামী বিবেকানন্দ শুধু বাঙালির জীবনের এক আদর্শ মহামানবই নন,তিনি যুগাবতার। তাঁর দেখানো আদর্শের রাস্তা যুক্তিবোধের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় মানুষকে। আধ্যত্মকে এক অন্য পর্যায়ে উন্নতি করে স্বামীজি সকলের জীবনকে আরও বেশি করে আলোর দিকে ঠেলে দিয়েছেন। নেতিবাচক ভাবনার অন্ধকার দিকটির পর্দা সরিয়ে তিনি বাঙালির জীবনবোধকে আরও বেশি করে অনুপ্রাণিত করেছেন। উদ্বুদ্ধ হয়েছে যুবসমাজ,আর সেজন্যই আজ তাঁর জন্মদিন ১২ জানুয়ারি ‘যুব দিবস’ বলে খ্যাত। 

বিদেশি মনীষীর দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন ‘ঝঞ্ঝা সদৃশ সন্ন্যাসী’। সত্যিই তিনি ঝড় তুলেছিলেন ঘুমিয়ে থাকা সমাজের সর্বস্তরে। দেহ-বিবেকানন্দ নেই, কিন্তু ভাব-বিবেকানন্দ জনমানসে চিরভাস্বর। তাঁর বাণী শুধু ভারত নয়,সারা বিশ্ববাসীকে দারুনভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি আক্ষরিক অর্থেই কর্মবীর ও ধর্মবীর ছিলেন। ‘যে ধর্ম গরিবের দুঃখ দূর করে না, মানুষকে দেবতা করে না, তা কি আবার ধর্ম?’ ধর্ম সম্পর্কে তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি আজও আমাদের ধর্মের |উর্দ্ধে উঠতে সাহায্য করে।

স্বামীজি বলেছেন,শক্তি ও সাহসিকতাই ধর্ম। দুর্বলতা ও কাপুরুষতাই পাপ। অপরকে ভালোবাসাই ধর্ম,অপরকে ঘৃণা করাই পাপ। ফলে সুস্থ জীবনে বাঁচতে এই রাস্তাই একান্ত কাম্য। ধর্মীয় হানাহানিতে তিনি ব্যথিত হতেন। আক্ষেপ করে বলতেনঃ‘আমাদের দুর্ভাগ্য, একটি ধর্মের মানুষ অপর ধর্মকে সহ্য করতে পারেন না।’ ১৮৯৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর আমেরিকার শিকাগো শহরে বিশ্বধর্ম মহাসভায় তিনি ভ্রাতৃত্ববোধের কথা বলেন। যা মহান ভারতের চিরন্তন ঐতিহ্য।

স্বামীজির কাছে সহিষ্ণুতার পরিধি ব্যাপক। তিনি মনে করতেন,আমাদের শুধু সহিষ্ণু হলে চলবে না,অন্য মতকেও গ্রহণ করতে হবে। কারণ সব ধর্মের সার কথাটিই হল সত্য। যত মত,তত পথ। স্বামীজির আত্মোপলব্ধিতে,ভারত ছিল পুণ্যভূমি। সার্বিক অর্থেই মহান ভারত। অহংকার করতেন স্বামীজি,তাঁর জন্মভূমিকে আঁকড়ে। তিনি বলতেন,পৃথিবীর কোন দেশকে যদি পুণ্যভূমি বলতে হয়,সেটা হল ভারত। দুঃখের ও পরিতাপের বিষয়,মহামানবের সাগরতরী মহান ভারতভূমি বোধহয় হারিয়ে ফেলছে তার চিরন্তন ঐতিহ্য, বিভেদের মাঝে মিলন মহানরুপ।

ধর্মীয় ও বর্ণগত বিভেদ এখন মুখ্য সমস্যা রুপে দেখা দিচ্ছে। ঘৃণা ও হিংসা থেকেই জন্ম নিচ্ছে তীব্র বিদ্বেষ। ভাবতে অবাক লাগে,বর্তমান ভারতে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য,ধর্মীয় বিভাজন,সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ,উস্কানি সর্বোপরি জাতীয়তাবাদের মোড়কে ভারতীয় ঐতিহ্য,সংস্কৃতি, বৈচিত্রের ঐক্য, ধর্মনিরপেক্ষ ভাবধারাকে কুঠারাঘাত করতে চাইছে, বিবেকানন্দের হিন্দুত্ববাদকে হাতিয়ার করে। নিঃসংকোচে বলা যায় বিবেকানন্দের হিন্দুত্ব ছিল সম্পূর্ণ পরধর্ম সহিষ্ণুতা,মানবতা,উদারতা,সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি,সৌভ্রাতৃত্ব,প্রভৃতি চিরায়ত গুণাবলীতে পরিপূর্ণ। সারা জীবন তিনি আধ্যাত্মিকতায় ভর করে মানুষের মধ্যে প্রচার করেছেন মানবতাবাদ। আসুন সবাই মিলে স্বামী বিবেকানন্দর পরধর্ম সহিষ্ণুতা,মানবতাবাদী,উজ্জ্বল ভাবমূর্তিকে আবারও পুনরুজ্জীবিত ও চিরভাস্বর করে তুলি

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only