রবিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২১

জয় জয় মহামেডান, এল নতুন উৎসাহের জোয়ার




বাংলা তথা ভারতীয় ফুটবলে তিন প্রধানের অন্যতম মহামেডান। ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে এবার মহামেডান স্পোর্টিং আক্ষরিক অর্থেই শক্তিশালী এক দল। সেই দলের উত্থান-পতন নিয়ে বিশ্লেষণ করলেন জাহিরুল হাসান।

জাহিরুল হাসান


বিশেষ প্রতিবেদনঃ‘সব খেলার সেরা, বাঙালির তুমি ফুটবল’। মান্না দে’র কণ্ঠে ৫০ বছর আগের এই গান বাঙালির ফুটবল-প্রীতিতে এক চিরকালীন মোহর লাগিয়ে দিয়েছে, যা একটুও অতিশয়োক্তি নয়। কিন্তু, ফুটবল-প্রীতিটা বড় না ফুটবলকে সামনে রেখে ক্লাব-প্রীতি? কোনও সন্দেহ নেই, বাঙালি বিভক্ত হয়ে আছে মোটামুটি তিনটে দলে...মহামেডান স্পোর্টি,মোহনবাগান এবং ইস্টবেঙ্গল। মহামেডানের নাম প্রথমে লিখলাম কারণ হিসাব মতো এদের মধ্যে মহামেডানই সবচেয়ে পুরানো দল। জুবিলি ক্লাব,ক্রিসেন্ট,হামিদিয়া এগুলি তার আগের খোলস মাত্র। নাম বদলে ১৮৯১ সাল থেকে মহামেডান। বাঙালি নিজের ক্লাবকে নিশ্চয় ভালোবাসে। কিন্তু আসলে তা যে ফুটবলকে উপলক্ষ করেই এবং ফুটবল-প্রীতিই যে এর মূলে, তা বোঝা যায় শুধু বিশ্বকাপ নয়, ইউরোপের লিগ ফুটবলের দিকেও তার টান দেখে। অবশ্য, অন্তরে সবসময় নিজের ক্লাবই থাকে। 

অধিকাংশ বাঙালি পরিবারে ক্লাব-প্রীতি বয়ে চলে পুরুষানুক্রমে। নিজেকে দিয়েই সেটা বুঝি। আমার আব্বার একমাত্র নেশা ছিল ফুটবল খেলা দেখা। মহামেডানের খেলা থাকলে ময়দানে তাঁর যাওয়া চাই। আমার আম্মার যদি শরীর খারাপ হয়, তা হলেও আব্বা খেলা থাকলে অফিস থেকে বেরিয়ে ময়দানে যাবেনই। আমিও শিশু বয়স থেকে পথ চেয়ে থাকতাম আব্বার। আসা মাত্রই ছুটে যেতাম তাঁর কাছে ফল জানার জন্য। কখনও-কখনও আব্বা আমাকে রাগানোর জন্য মিছিমিছি বলতেন, মহামেডান হেরে গেছে। সেটা বলতেন যেদিন মহামেডান খুব ভালো খেলে অনেক গোলের ব্যবধানে জিতেছে। এ সেই সময় যখন ঢাকা থেকেও আসতেন খেলোয়াড়রা মহামেডানের হয়ে খেলতে।

তখন স্ট্রাইকার পজিশনের নাম ছিল সেন্টার ফরওয়ার্ড। ঢাকা আগত ওমর ছিলেন তেমনই এক সেন্টার ফরোয়ার্ড। সেটা পঞ্চাশের দশক। ১৯৫৭ সালে মহামেডান কলকাতা লিগ জেতে। তখন দুই ব্যাক, তিনজন হাফ এবং পাঁচজন ফরোয়ার্ড নিয়ে খেলা হত। ফরোয়ার্ডে রাইট আউট, রাইট ইন, সেন্টার ফরওয়ার্ড, লেফট ইন ও লেফট আউট। খানিকটা দাবা খেলার মতো। দুই নৌকো, দুই ঘোড়া আর মাঝে মন্ত্রী। তবে দাবার মন্ত্রীর চেয়ে সেন্টার ফরোয়ার্ড অনেক বেশি সচল। সেই মহামেডানের সোনার ফরোয়ার্ড লাইনের নামগুলি ছ’দশক পরেও আমার মুখস্থ আছে। সব আব্বার কাছ থেকে শুনে শুনেই... সৈয়দ আহমদ, রহমতুল্লাহ, ওমর, সালাউদ্দিন, ইয়ামানি।

এতদিন ধরে তো দেখছি, মহামেডান ক্লাব দারুণ চাঙ্গা হয়ে ওঠে কয়েক বছর অন্তর অন্তর। মহামেডানের সবচেয়ে গৌরবজনক সময় কেটেছে দেশভাগের আগে তিরিশের দশকে, যখন প্রথম ভারতীয় দল হিসেবে কলকাতা ফুটবল লিগ জেতে ১৯৩৪ সালে। শুধু ওই বছর নয়, ১৯৩৮ পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর লিগ জিতে ইতিহাস সৃষ্টি করে। কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিকরাও মেতে উঠেছিলেন মহামেডানের এই বিস্ময়কর সাফল্যে। কাজী নজরুল ইসলাম লেখেন,‘যে চরণ দিয়ে ফুটবল নিয়ে/ জাগাইলে বিস্ময়,/ সেই চরণের শক্তি জাগুক/ আবার ভারতময়।’ সেই সব গর্বের ইতিহাস বিধৃত আছে একটি বিশেষ অধ্যায়ে ‘সওগাত’ সম্পাদক মুহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের লেখা বৃহদায়তন গ্রন্থ ‘বাংলা সাহিত্যে সওগাত যুগ’-এ। ভারত জুড়ে এক জাতীয় জাগরণ সৃষ্টি করেছিল মহামেডানের ফুটবলযোদ্ধারা, বছরের পর বছর শ্বেতাঙ্গদের নাকে ঝামা ঘষে। 

দলের বড় সাফল্যের পিছনে মাঠে নেমে যাঁরা ঘাম ঝরান অবশ্যই তাঁদের কৃতিত্ব, কিন্তু নেপথ্যে থাকেন এক-একজন স্বপ্নচারী মানুষ। যেমন, তিরিশের দশকের গোড়া থেকে মহামেডান দলকে সাজিয়ে তুলতে তৎপর হয়েছিলেন কর্মকর্তা সি এ আজিজ। ভারতীয় ফুটবলে আধুনিক ভাবনা আনার জন্য এরিয়ান্স ক্লাবের দুখীরাম মজুমদারের পাশে আজিজের নামও আসে। তিরিশের দশকের ফুটবল-নক্ষত্র সামাদকে বাংলা বলা শিখিয়েছিলেন দুখীরাম এবং দাঙ্গার সময় তাঁকে লুকিয়ে রেখেছিলেন হিন্দুবাড়িতে, সন্তোষ ছদ্মনামে। ফুটবল তো শুধু খেলা নয়, একটা সংস্কৃতি ,এসব উপকথাও তার আকর্ষণীয় অঙ্গ।

দেশভাগের ঠিক পরের বছরই ওই ডামাডোলের বাজারেও মহামেডান কলকাতা লিগ জিতেছিল, সেটা নিয়ে আটবার। কিন্তু তারপর থেকে মহামেডানকে তৃতীয় প্রধানের তকমা নিয়ে টিকে থাকতে হয়েছে। যদিও এর পরও লিগ চ্যাম্পিয়নের খেতাব মুঠোয় এসেছে সাতান্ন, সাতষট্টি এবং একাশি সালে। নতুন নতুন কিছু উৎসাহী কর্মকর্তা এসেছেন এবং তাঁদের সাংগঠনিক প্রয়াসে দল জেগে উঠেছে। যেমন, এ বছর তরুণ অবৈতনিক সাধারণ সম্পাদক সেখ ওয়াসিম আক্রমের মধ্যে এক দৃঢ় সংকল্প লক্ষ করছি ‘মহামেডান আবার ফুটবল সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে’, এই জাতীয় স্বপ্নকে বাস্তব করে তুলতে। যারা বড় স্বপ্ন দেখে সাময়িক ব্যর্থতা তাদের কখনও বিরত করে না। পৃথিবীর সব শিশু এবং যাঁরা একসময় শিশু ছিলেন তাঁদের সকলেরই শিক্ষকের মুখে শোনা রবার্ট ব্রুস ও মাকড়সার কাহিনি সকলেরই মনে থাকতে পারে। ছ’বার পরাজয়ের পর হতোদ্যম হয়ে রাজা ব্রুস এক মাকড়সাকে দেখলেন। একইরকম ছ’বার বিফল হবার পর নতুন প্রচেষ্টায় গুহার মধ্যে জাল বুনতে সফল হতে দেখে নতুন উৎসাহে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এবং সেবার আর তাঁকে যুদ্ধ থেকে হেরে ফিরতে হয়নি।

হায়দর নস্করের পরে কয়েক দশকের ব্যবধানে বহু সময় পরে মহামেডানে একজন বাঙালি ক্লাব পরিচালক,সেখ ওয়াসিম আক্রমের উত্থান। যখন প্রথম মহামেডান নাম হয় ১৮৯১ সালে তখনও ক্লাবের সম্পাদক ছিলেন একজন বাঙালি, ‘মালদা আখবার’ পত্রিকার সম্পাদক আবদুল গনি। সম্প্রতি বাঙালি সদস্যরাই মিলে তৈরি করেছেন ব্ল্যাক প্যান্থার্স ফ্যান ক্লাব। বাংলায় লেখা ব্যানার। ফ্যানদের উৎসাহে মহামেডান ক্লাবের ইতিহাসে এই প্রথম দু’জন মহিলা ক্লাবের সদস্য হয়েছেন। গত বছর ইস্টবেঙ্গল তাদের মহিলা ফুটবল দল গঠন করেছে,তখন পর্যন্ত মোহনবাগান-মহামেডান করেনি। এখন শুনছি মহামেডানও সেই পথে এগোতে পারে। ফ্যান ক্লাবের ঘোষিত উদ্দেশ্যের মধ্যে আছে আলোচনাচক্র,সংগীত,নৃত্যকলা ও ললিতকলার প্রসার, পাঠাগার স্থাপন ইত্যাদি। বোঝা যাচ্ছে, একটা নতুন দিশা দেখাতে চাইছে এ সময়ের মহামেডান। সেখানে মাঠের জেতা-হারাই সব নয়। খেলাধুলোর যে মুখ্য উদ্দেশ্য জাতির চরিত্র গঠন,সে কাজে মহামেডান যদি কিছুটাও অনুঘটক হতে পারে তবে তা ট্রফি জেতার চেয়ে কম কীসের?

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় খেলার সঙ্গে জাতীয়তার সম্পর্ক। প্রত্যেক দেশেই চোখের মণি জাতীয় দল। হারুক-জিতুক জাতীয় দলের জন্যে চেঁচানো চাই। এই জাতীয়তা কোথাও কোথাও আঞ্চলিক আকারও নিয়েছে। স্পেনে যেমন বার্সেলোনা দল কাতালোনীয় জাতীয়তার প্রতীক। আবার,সম্প্রদায়গত জাতীয়তাও কখনও-কখনও উঠে আসতে দেখা যায় খেলার মাঠে। যেমন, স্কটল্যান্ডে গ্লাসগো স্থানীয় ক্যাথলিকদের দল এবং রেঞ্জার্স প্রটেস্ট্যান্টদের। সবাই জানে, বাংলায়ও মোহনবাগান ঘটির প্রাণ আর ইস্টবেঙ্গল বাঙালের। আর,মহামেডান ব্রিটিশ আমল থেকে মুসলমান পরিচালিত ও সমর্থিত। যেহেতু, ফুটবলের সুবাদে মুসলিম প্রাধান্য থাকলেও একে সাম্প্রদায়িকতা মনে করেনি কেউ, শুধু নিরীহ গোষ্ঠীতান্ত্রিকতার বেশি কিছু নয়। কিন্তু মহামেডান পরে বদলেছে, আজ তো চেহারা অনেকটাই পালটে ফেলেছে। আগে শুধু মুসলমানরাই দলে খেলত। ষাটের দশক থেকে সমর্থক সংখ্যায় মুসলিম প্রাধান্য থাকলেও খেলোয়াড় মিশ্র। 

কলকাতার ক্লাব ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দলবদল ঘটেছিল ১৯৮০ সালে যখন ইস্টবেঙ্গলের সেরা ফুটবলাররা ঝাঁক বেঁধে মহামেডানে এসে যোগ দিয়েছিলেন। কারা ছিলেন ওই তালিকায়? আজকের তরুণ মহামেডান সমর্থকরা জেনে আশ্চর্য হবে,সুরজিৎ সেনগুপ্ত,ভাস্কর গাঙ্গুলি,মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য,প্রশান্ত ব্যানার্জি,শ্যামল ঘোষ,চিন্ময় চ্যাটার্জি,যাঁরা ওইবছর মহামেডান দলে সই করে হইচই বাধিয়ে দিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও, মহামেডান লিগ চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি, তারকা দল নিয়েও চ্যাম্পিয়ন হবার মতো খেলেনি, সুরজিৎ সেনগুপ্তের চোট তার একটা কারণ। তা ছাড়া, সে বছর লিগ আদৌ শেষ করা যায়নি। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের খেলায় সমর্থকদের মধ্যে ভয়াবহ দাঙ্গা বেঁধেছিল। ১৬ জন প্রাণ হারান। এই পরিস্থিতিতে পরবর্তী মহামেডান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ এবং গোটা লিগ বাতিল হয়ে যায়। সেবছর আইএফএ শিল্ডও আয়োজিত হয়নি।

বর্তমানে মহামেডানের প্রধান বিনিয়োগকারী হরিয়ানার গুরগাঁওয়ের বাঙ্কারহিল কোম্পানি, যার ডিরেক্টর দীপককুমার সিংহ, আদিত্য রাজ প্রমুখ। যুগ্ম বিনিয়োগকারী টিভি নাইন বাংলা-র অ্যাসোসিয়েটেড ব্রডকাস্টিং কোম্পানি। শ্রীনিবাস রাও প্রমুখ ডিরেক্টরকে নিয়ে গঠিত হায়দরাবাদের এই সংস্থা। দলের অধিনায়ক প্রিয়ন্ত সিংহ। অবৈতনিক ফুটবল সচিব দীপেন্দু বিশ্বাস। এ বছর মহামেডান ক্লাবে খেল ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যৌথভাবে দীপাবলি উৎসব পালিত হয়েছে। বদলেছে অনেক কিছু। কিন্তু বদলায়নি মহামেডান ভক্তকুল। সাফল্য ও জয়ের ক্ষুধা নিয়ে জেগে থাকা শহর ও গ্রামগঞ্জের লাখো লাখো সমর্থক যাঁরা সর্বান্তঃকরণে চাইছেন, এবার যা আয়োজন তাতে দল যেন ২০২০-২১-এর আই লিগ জেতার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারে। সেটা সম্ভব হতে পারে যদি শিল্ডের ব্যর্থতা থেকে দল শিক্ষা নেয়। আমরা সমর্থকরা খেলা দেখতে ভালোবাসি কিন্তু খেলার সূ"তা অত বুঝি না। তবু কয়েক মাস আগেই তো আই লিগ দ্বিতীয় ডিভিশন খেলে দল চ্যাম্পিয়ন হল, তারপর চলল প্রি-সিজন, ধারাবাহিক খেলার মধ্যে থেকেও এখনও মনে হচ্ছে খেলোয়াড়দের মধ্যে পুরোপুরি ফিটনেস আসেনি, রক্ষণ ঠিক রেখে বিপক্ষের ঘাড়ের ওপর চেপে বসা ব্যাপারটাই যেন দেখতে পাওয়া যায়নি। আশা করি, কোচ এবং ফিজিও মূল আই লিগ শুরু হওয়ার আগে খামতিগুলো শুধরে নেবেন এবং বিদেশি খেলোয়াড়রাও তাঁদের সুনাম ও দর অনুযায়ী অবদান রাখবেন। এগিয়ে যাও মহামেডান।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only